আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামের সামনের সারিতে থাকা সিলেটের বিএনপির নেতৃবৃন্দ পুরস্কৃত হচ্ছেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেটের ৬টি আসনের মধ্যে ৫টিতে জয়লাভ করে বিএনপি। এদের মধ্যে ৪ জনই বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ছিলেন। একজন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। বিএনপি সরকার গঠনের পর সিলেট সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ ও সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের শীর্ষ চেয়ারে বসানো হয়েছে তিন নেতাকে। আন্দোলন-সংগ্রামের সামনের সারিতে থাকা নেতৃবৃন্দকে মূল্যায়নের বিষয়টি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন দলীয় নেতাকর্মীরা। তবে অতিরিক্ত দলীয়করণের কুফল নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় নেতারা।
মন্ত্রিসভা থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত একাধিক শীর্ষ নেতা দায়িত্ব পেয়েছেন। এতে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎসাহ তৈরি হয়েছে। তবে দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকা এবং প্রবাসে দলীয় কার্যক্রমে ভূমিকা রাখা অনেক নেতা এখনো পুরস্কৃত না হওয়ায়, তাদের মধ্যে মূল্যায়নের প্রত্যাশা বাড়ছে।
বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা খন্দকার আবদুল মুক্তাদির সিলেট-১ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। চেয়ারম্যানের আরেক উপদেষ্টা ও সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী সিলেট-৪ আসনে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন।
চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা, ইংল্যান্ডপ্রবাসী হুমায়ুন কবির প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রতিমন্ত্রী মর্যাদায় উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন। জাতীয় সংসদে সিলেটের প্রতিনিধিত্ব করছেন আরও তিনজন। তারা হলেন, সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা এম এ মালেক এবং নিখোঁজ বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতেও সিলেটের বিএনপি নেতারা দায়িত্বে রয়েছেন। জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী গত ২৫ ফেব্রুয়ারি সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেন। জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আবুল কাহের চৌধুরী শামীম সিলেট জেলা পরিষদের প্রশাসক এবং মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েছ লোদী বৃহস্পতিবার সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিউক) চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন।
দলীয় নেতাকর্মীরা বলছেন, সংসদ সদস্যরা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় মনোনয়ন পেয়েছেন। তবে মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, সিটি করপোরেশন প্রশাসক, জেলা পরিষদ প্রশাসক ও সিউক চেয়ারম্যান পদে যারা দায়িত্ব পেয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে সরকারিভাবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। নেতাকর্মীদের ভাষ্য, এটি মূলত বিগত দিনের আন্দোলন-সংগ্রামে তাদের অবদান ও ত্যাগের স্বীকৃতি। দলের দুঃসময়ে মাঠে থেকে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া এই নেতাদের পুরস্কৃত করা হয়েছে বলে তারা মনে করেন।
তবে দলীয় সূত্র জানায়, কঠিন সময়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা বেশ কয়েকজন নেতা এখনো মূল্যায়িত হননি। এদের মধ্যে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী এবং মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরীর নাম তৃণমূল পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে।
প্রবাসী নেতাদের একটি অংশও এখনো মূল্যায়নের অপেক্ষায় আছেন। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত বিএনপির বিভিন্ন ইউনিটের নেতারা বিগত বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দলের পক্ষে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন। ভবিষ্যতে বিভিন্ন কমিশন, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা বা কূটনৈতিক মিশনে তাদের মধ্য থেকে যোগ্য ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে বলে দলীয় মহলে আলোচনা চলছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রথম ধাপে জ্যেষ্ঠ ও শীর্ষ নেতাদের দায়িত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়ে একটি ইতিবাচক বার্তা দেওয়া হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে দীর্ঘ সংগ্রামে থাকা নেতাকর্মীদের অবদানও কম নয়। আগামী দিনে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক কাঠামোয় পর্যায়ক্রমে আরও নেতাকে দায়িত্ব দেওয়া হলে দলীয় কর্মীদের মধ্যে আরও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তারা মনে করেন।
সিলেট জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা হাবিবুর রহমান বলেন, সরকার দলীয়করণ শুরু করেছে। তারা যদি ফ্যাসিস্টের মতো আচরণ করে, জনগণও তাদের সঙ্গে এমন আচরণ করবে। এছাড়া সরকার বিগত ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্তদেরও মূল্যায়ন করেনি। সরকার ভালো কাজ করলে আমরা সহযোগিতা করব— এ নীতিতে আমরা আছি।
বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী বলেন, জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। বিএনপি সবসময় ত্যাগীদের মূল্যায়ন করে আসছে। সরকার গঠনের পর বিভিন্ন দায়িত্ব যোগ্যদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। এছাড়াও যারা আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রেখেছেন, দল প্রত্যেককে মূল্যায়ন করবে।
সিলেটের রাজনৈতিক মহলে এখন মূল প্রশ্ন একটাই— দ্বিতীয় ধাপে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংস্থায় নতুন নিয়োগের সময় ত্যাগী ও প্রবাসী নেতাদের কতটা মূল্যায়ন করা হয়।
/ইউএমএইচ