ফুটবল বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসে মাঠের জাদুকরদের পাশাপাশি বাইরের অনেক পারফর্মারও দর্শকদের মনে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। বহু সুরকার ও শিল্পী তাদের কণ্ঠে বিশ্বমঞ্চে আলো ছড়িয়েছেন। তবে এমন একজন আইকনিক শিল্পী আছেন, যার নাম উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিশ্বকাপের চিরায়ত রঙ, বৈচিত্র্য আর বাঁধভাঙা উল্লাস। তিনি আর কেউ নন কলম্বিয়ান পপ তারকা শাকিরা। ফুটবলপ্রেমীদের কাছে বিশ্বকাপ মানেই যেন শাকিরার সুর আর তালের জাদুকরী উন্মাদনা, যা ছাড়া এই মহাযজ্ঞের পূর্ণতা ভাবাই যায় না।
শাকিরার বিশ্বকাপ যাত্রার শুরু ২০০৬ সালে। জার্মানিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের সমাপনী অনুষ্ঠানে তিনি পরিবেশন করেন তার বিশ্বখ্যাত গান ‘হিপস ডোন্ট লাই’র (ব্যাম্বো ব্র্যান্ডে) সঙ্গে। যদিও এটি টুর্নামেন্টের অফিসিয়াল সংগীত ছিল না, তবু বিশ্বকাপের আবহে গানটির জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। অনেক ফুটবল সমর্থকের কাছে সেটিই ছিল ২০০৬ বিশ্বকাপের অনানুষ্ঠানিক সংগীত।
তবে শাকিরা এবং বিশ্বকাপের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে ২০১০ সালে। দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের অফিসিয়াল গান ‘ওকা ওকা’ (দিস টাইম ফর আফ্রিকা) প্রকাশের পর তা বিশ্বজুড়ে সাংস্কৃতিক বিস্ময়ে পরিণত হয়। দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যান্ড ফ্রেশলিগ্রাউন্ডের সঙ্গে গাওয়া গানটি শুধু ফুটবলপ্রেমীদের নয়, সংগীতপ্রেমীদেরও হৃদয় জয় করে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে সমাপনী মঞ্চ সবখানেই ছিল শাকিরার উপস্থিতি। পরবর্তীতে ‘ওয়াকা ওয়াকা’ বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে সফল ও জনপ্রিয় সংগীতগুলোর একটিতে পরিণত হয়।
আরও পড়ুন
২০১০ বিশ্বকাপ শাকিরার ব্যক্তিগত জীবনেও বড় পরিবর্তন এনে দেয়। ওই বিশ্বকাপের সময়ই স্পেনের ফুটবলার জেরার্ড পিকের সঙ্গে তার পরিচয় হয়, যা পরে দীর্ঘ সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি করে। ফুটবল আর শাকিরা যেন তখন থেকে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে যায়। চার বছর পর ব্রাজিল বিশ্বকাপেও আবার ফিরে আসেন শাকিরা। ২০১৪ সালে ‘লা লা (ব্রাজিল ২০১৪)’ গানটি বিশ্বকাপের অন্যতম জনপ্রিয় থিম সং হয়ে ওঠে। রিও ডি জেনিরোর মারাকানা স্টেডিয়ামে সমাপনী অনুষ্ঠানে গানটি পরিবেশন করে আবারও বিশ্বকাপ মঞ্চ কাঁপান তিনি।
এরপর দীর্ঘ সময় বিশ্বকাপের অফিসিয়াল সংগীতে তার অনুপস্থিতি থাকলেও ভক্তদের মনে শাকিরা ছিলেন বিশ্বকাপের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন অনলাইন কমিউনিটিতে ‘ওয়াকা ওয়াকা’কে এখনো সর্বকালের সেরা বিশ্বকাপ সংগীত হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অনেক ফুটবল সমর্থক মনে করেন, বিশ্বকাপের আবেগকে সবচেয়ে সফলভাবে ধারণ করতে পেরেছিল এই গানটিই।
২০২৬ সালে আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রত্যাবর্তন করেন শাকিরা। নাইজেরিয়ান সংগীতশিল্পী বার্না বয়-এর সঙ্গে ‘দাই দাই’ গানটি বিশ্বকাপ ২০২৬-এর অফিসিয়াল সংগীত হিসেবে প্রকাশিত হয়। মেক্সিকোর আজতেকা স্টেডিয়ামে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গানটি পরিবেশন করে নতুন ইতিহাস গড়েন। এটি ছিল বিশ্বকাপের সঙ্গে তার চতুর্থ বড় সংগীত-সংযোগ।
ফুটবলের ইতিহাসে অনেক কিংবদন্তি খেলোয়াড় আছেন, যাদের নাম শুনলেই বিশ্বকাপের কথা মনে পড়ে। সংগীতের জগতে সেই মর্যাদা অর্জন করেছেন শাকিরা। ২০০৬ সালের ‘হিপস ডোন্ট লাই’ থেকে ২০১০-এর ‘ওয়াকা ওয়াকা’, ২০১৪-এর ‘লা লা লা’ এবং ২০২৬-এর ‘দাই দাই’ প্রতিটি বিশ্বকাপেই তিনি রেখে গেছেন নিজের ছাপ। তাই বিশ্বকাপের গল্প লিখতে গেলে শাকিরার নামও অনিবার্যভাবেই উঠে আসে।
ফুটবল যেমন বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা, তেমনি সেই ফুটবল উৎসবের সবচেয়ে পরিচিত কণ্ঠগুলোর একটি হয়ে উঠেছেন শাকিরা। দুই দশক ধরে বিশ্বকাপের সুরে-ছন্দে তার উপস্থিতি প্রমাণ করে, তিনি শুধু একজন গায়িকা নন; বিশ্বকাপ সংস্কৃতিরই একটি অংশ।
এএডি/