জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, যে সরকার জনরায় মানে না সে সরকার জনগণের সরকার হতে পারে না। সময় ফুরিয়ে আসছে। দুঃশাসন দুর্নীতির বিরুদ্ধে আরেকটি বিপ্লব হবে বীর চট্টলা থেকে।
শনিবার (১৩ জুন) বিকালে চট্টগ্রাম নগরীর লালদীঘি মাঠে অনুষ্ঠিত ১১ দলীয় জোটের বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জামায়াত আমির বলেন, প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজারে এসে বলেন, বাজেটে মাদক এবং ধূমপান জাতীয় দ্রব্যে ট্যাক্স বসিয়েছে বলে বিরোধিতা করে বিক্ষোভ করেন। এটা মিথ্যা এবং ভুয়া। বিরোধী দলের কেউ এটা করেনি। আমার করুনা লাগে। প্রধানমন্ত্রীর এই পদটি রাষ্ট্রীয় পদ। তিনি রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী। তার মুখ দিয়ে অনবরত ভুলবাল কথা বের হতে থাকে বাংলাদেশ লজ্জিত হবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এদেরকে চিহ্নিত করুন। যারা আপনাদারকে ভুল বুঝাচ্ছে এদেরকে চিহ্নিত করুন। আপনার সম্মান মানে বাংলাদেশের সম্মান ধ্বংস করছে। এদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নিন। নইলে আপনি না গোটা জাতি ক্ষতিগ্রস্ত করবেন।
বাজেট নিয়ে তিনি বলেন. বাজেট নিয়ে বিরোধী দল প্রতিক্রিয়া জানাবে খুবই স্বাভাবিক। এটা গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। এতে রাগ করার কি আছে। অল্পতে ধৈর্য্য হারালে ১৮ কোটি মানুষের দায়িত্ব পালন করবেন কিভাবে। জনঘন যখন দেখবে ৭০ ভাগ মানুষের রায়কে আপনারা অবজ্ঞা করছেন। জনগণ বসে বসে আঙুল চুষবেনা। রায় দিয়েছে জনগণ মানতে হবে সরকারকে। যে সরকার জনরায় মানে না সেই সরকার জনগণের সরকার হতে পারে না।
শফিকুর রহমান বলেন, সংসদে বলে ৫১ ভাগ মানুষ তাদেরকে ভোট দিয়ে সরকার গঠনের সুযোগ দিয়েছে। ভাল কথা। কিন্তু ৭০ ভাগ মানুষ যে ভোট দিয়ে বলেছে গণভোটের গণরায় মানতে হবেৎ সেটা মানছেন না কেন। ৫১ ভাগ বুঝতে পারেন ৭০ ভাগ বুঝতে পারেন না।
তিনি বলেন, হিসাব মেলানোর জন্য ভাল মানুষ পাশে রাখুন। জাতিকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য যাদের অন্তরে দেশপ্রেম আছে মানবতা বোধ আছে চরিত্র যাদের উন্নত তাদেরকে বসান।
জামায়াত আমির বলেন, একজন কুখ্যাত ব্যাংক ডাকাত তার গাড়িতে চড়ে যারা রিসিপশন নেবে তাদের দ্বারা আপনার সরকার বাংলাদেশের জনগণকে কিছু দিতে পারবে না।
তিনি বলেন, আমরা চেয়েছিলাম জনগণের সব সমস্যার সমাধান সংসদে হোক। সরকার চাইনি। আমাদেরকে তারা ঠেলে দিয়েছে জনগণের কাতারে। যদি গণভোটের রায় মেনে নেওয়া হতো আজকের এই বিভাগীয় সমাবেশের প্রয়োজন হতোনা। এতগুলো মানুষকে ত্যাগ স্বীকার করে এখানে আসতে হতোনা। আপনারাই বাধ্য করেছেন। সংসদে এই দাবি উত্থাপন করেছিলাম। আমরা আলোচনা করেছিলাম। আপনারা ফেলে দিয়েছেন। জনগণকে অপমান করেছেন। সংসদে কথা বলতে স্পিকারের অনুমতির প্রয়োজন হয়। স্পিকারের রুলিংয়ের প্রয়োজন হয়। যেহেতু এখানে (সংসদে) আমরা সুবিচার পাইনি। তাই আমরা এখন জনগণের সংসদে চলে যাচ্ছি। জনগণের বিচার এখন জনগণের কাছে পেশ করবো। সেখানে স্পিকারের অনুমতির প্রয়োজন হবে না। জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে আগামীতে তারা কি ফায়সালা দেবে।
সীমান্ত পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সীমান্তে কি হচ্ছে আপনারা জানেন। আমরা নোটিশ দিয়েছি এই বিষয়ে আলোচনা করার জন্য। আমাদের নোটিশ নিয়ে টালবাহানা করা হচ্ছে। ভয় কীসের। কারে ভয় করেন। কারে খুশি করতে চান। কার হয়ে দেশ পরিচালনা করতে চান। যদি বাংলাদেশের জনগণের সরকার হয়ে থাকে তাহলে এই ধরনের ইস্যু আলোচনা করতে দিতে হবে। ১৮ কোটি মানুষ কারো হাতে বাংলাদেশ ইজারা দেবে না। জাতির সাথে গাদ্দারি করে কেউ পার পাবে না। আমরা গাদ্দারি করলে জাতি আমাদেরকে ক্ষমতা করবে না। জীবনের বিনিময়ে হলেও আমাদের দেওয়া কথা আমরা রক্ষা করবো।
বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, জনগণ আমা করেছিল ইন্টেরিম গভর্নমেন্টের পরে নির্বাচিত সরকার আসলে চাঁদাবাজি বন্ধ হবে। বাংলাদেশের কোন জায়গায় চাঁদাবাজি বন্ধ হয় নাই। হয়তোবা চিটাগাংয়ে বন্ধ হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি চাঁদাবাজকে সামাল দিন। আপনি কথা দিয়েছিলেন আপনি ক্ষমতায় আসলে দুর্নীতির টুটি চেপে ধরবেন। আমরা দেখতে পাচ্ছি দুর্নীতিকে জাতীয়করণ করা হয়েছে। দুর্নীতি চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কথা বললে কারও যদি মন খারাপ হয় আমাদের করার কিছুই নেই। আমরা বলে যাচ্ছি বলেই যাব। বলার মধ্যে ক্ষান্ত হবোনা জনগণকে সাথে গণ প্রতিরোধ গড়ে তুলব। আমাদের পরিষ্কার কথা। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে। যদি না করেন তাহলে যেভাবে ৯৬ সালে নিজেরাই শেষ পর্যন্ত কেয়ার টেকার সরকারের বিল নিজেরা এনে পাস করতে বাধ্য হয়েছিলেন এই রেফারেন্ডামও আপনারা বাস্তবায়ন করতে বাধ্য হবেন। ভালই ভালই মেনে নিন। জনগণকে রাজপথে ঠেলে দেবে না। আমরা শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক ধারায় থাকতে চাই। আমাদরতে তাকতে দিন। আমাদেরকে সুড়সুড়ি দেবেন না। হুমকি ধমকি দেবেন না। মাঝে মাঝে হুমকি দেওয়া হয়। জেলের ভয় দেখানো হয়। দেশ জনগণের জন্য ফাঁসি বরণ করতে প্রস্তুত।
জনগণের জন্য জীবন দিতে হয় প্রস্তুত। দেশ এবং জনগণের জন্য বার বার জেলে যেতে প্রস্তুত। কিন্তু জেলের তালা স্থায়ী নয় চাবিওয়ালাও স্থায়ী নয়। তালাও পরিবর্তন হয় চাবিও পরিবর্তন হয় এটা মাথায় রাখতে হবে।
তিনি আরও বলেন, একদল ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে গিয়ে বনে জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছে। খাল বিল নদী নালা দিয়ে পালিয়ে গিয়েছে। আপনারা কোনদিকে যাবেন। আমরা চাইনা আপনাদের এই পরিণতি হোক। আপমরা চাইনা একটার পর একটা গণবিরোধী সিদ্ধান্ত নিন। আমরা পরিষ্কার বলে দিচ্ছি আমরা দীর্ঘকাল বসে বসে
আপনাদের সেই সুযোগ দেবোনা। সময় ফুরিয়ে আসছে। এর মধ্যে পরিবর্তন হলে আপনাদের অভিনন্দন জানাব। যদি পরিবর্তন না হয় আপনাদেরকে পরিণতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
জামায়াত আমির কর্নেল অলি আহমদের বক্তব্য তুলে ধরে বলেন, দেশের জন্য দুঃশাসন দুর্নীতির বিরুদ্ধে যদি আরেকটি বিপ্লব করতে হয় সেটা হবে ইনশাল্লাহ বীর চট্টলা থেকে।
তিনি জনতার উদ্দেশে প্রশ্ন রেখে বলেন, আপনারা সূচনা করতে রাজি আছেন? দেশের জন্য আরেকবার বুক পেতে দিতে রাজি আছেন? আমরাও দেশের জন্য ঢাকা থেকে এসে রাজপথে একসাথে দাঁড়িয়ে যাব।
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম বলেন, বিগত নির্বাচনে চুরি ডাকাতি হয়েছে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, আপনি বিশ বছর থাকতে পারবেন। কিন্তু সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করেন। আপনি বলেছেন সংস্কার অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হবে। জনগণের রায় অনুযায়ী সংস্কার বাস্তবায়ন করা জরুরি।
তিনি সরকারের উদ্দেশে বলেন, যারা আমাদের টাকা লুট করেছে তাদের সাথে প্রেম পিরিতি করছেন। তাদের হাত পা গুড়া করে দেন। তাদের ধরে থানায় সোপর্দ করেন।
কর্নেল অলি আহমদ আরও বলেন, দেশের বিরুদ্ধে যারা ষড়যন্ত্র করছেন তাদের প্রতিহত করতে হবে। দেশের মানুষ স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারছে না। রাষ্ট্র পরিচালনায় সংস্কার জরুরি।
এনসিপির আহবায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, প্রস্তাবিত বাজেটে দেশের মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে সক্ষমত হবে না। সরকার দুর্নীতি ও অপচয়ের পথ বন্ধ করতে পারেনি। জনগণেে উন্নয়নে কত অর্থ বরাদ্দ হয়েছে স্পষ্ট নয়। আমরা চেয়েছিলাম বাজেটের প্রশংসা করতে। কিন্তু এই বাজেট মানুষের অর্থনৈতিক কোন পরিবর্তন হবেনা।
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা বলা হলেও বাস্তবে সেই নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয়েছে। এর মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে।
জননেতা মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদির কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, এই চট্টগ্রামে আল্লামা সাঈদীর ঐতিহাসিক বক্তব্য রয়েছে। পার্লামেন্ট থেকে সচিবালয় সব জায়গায় হুতোমপ্যাঁচা বসেছে। তারা দুর্নীতি অনিয়মে লিপ্ত হয়েছে।
শনিবার বিকাল ৩টায় নগরীর লালদীঘি মাঠে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাবেশের কার্যক্রম শুরু হয়। নগরীর এবং নগরীর বাইরে থেকে প্রচুর জনসমাগম হয় এই সমাবেশে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুল সদস্য মোতায়েন ছিল সমাবেশে। সন্ধ্যায় সোয়া ৬টায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সমাবেশ চলছিল।
সময়ের আলো/জেডআই