আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে ইসরায়েল ও ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রতি নিজেদের নীতিগত অবস্থান আরও দৃঢ় করেছে আর্জেন্টিনা। সম্প্রতি রাজধানী বুয়েনোস আইরেসের পালাসিও লিবের্তাদ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে জুডেও-ক্রিশ্চিয়ান মূল্যবোধের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন দেশটির ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই।
প্রভাবশালী ইহুদি ধর্মীয় গুরু রাব্বি মেনাহেম মেন্ডেল শ্নিয়ারসনের মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রায় ১ হাজার ৮০০ ইহুদি প্রতিনিধির সামনে প্রধান বক্তা হিসেবে ইসরায়েলের প্রতি নিজের সর্বাত্মক সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
ইহুদি ধর্মের চাবাদ আন্দোলনের কোনো বড় আনুষ্ঠানিক সমাবেশে অ-ইহুদি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মিলেইয়ের এমন শ্রদ্ধা নিবেদন এবারই প্রথম, যা ইসরায়েলি গণমাধ্যমে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করা হয়েছে। নিজেকে 'নৈরাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী' হিসেবে পরিচয় দেওয়া মিলেই তার ৪০ মিনিটের বক্তব্যে বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে নিজের অর্থনৈতিক দর্শনের ভিত্তি তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট করেন যে, জুডেও-ক্রিশ্চিয়ান আদর্শ ধারণ করলে মানুষের আধ্যাত্মিক ও জাগতিক জীবনের মাঝে একটি নিখুঁত সমন্বয় ঘটে।
ইউরোপীয় ইহুদিদের জন্য 'নতুন নিরাপদ আশ্রয়' আর্জেন্টিনা
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ক্রমবর্ধমান ইহুদি-বিদ্বেষী মনোভাব নিয়ে যখন উদ্বেগ বাড়ছে, ঠিক তখনই ইহুদিদের জন্য আর্জেন্টিনাকে একটি নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করেছে মিলেই প্রশাসন। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাবলো কুইর্নো ব্রিটেনসহ ইউরোপের অন্যান্য দেশের ইহুদিদের উদ্দেশে এক বার্তায় আর্জেন্টিনায় স্থানান্তরের আহ্বান জানান।
তিনি উল্লেখ করেন, লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম ইহুদি সম্প্রদায়ের আবাসস্থল আর্জেন্টিনা কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর একটি উদীয়মান রাষ্ট্রই নয়, বরং ইহুদি-বিদ্বেষের বিরুদ্ধে দেশটির অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। আর্জেন্টিনার এই অবস্থানকে সমর্থন করে দেশটিতে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত ইয়াল সেলা বলেন, "ইহুদিদের বসবাসের জন্য ইসরায়েল সবসময়ই শ্রেষ্ঠ ভূমি। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউরোপের চেয়ে আর্জেন্টিনা তাদের জন্য অনেক বেশি নিরাপদ ও চমৎকার জায়গা।"
ইসরায়েল সফর ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার
ইসরায়েল ও আর্জেন্টিনার এই নজিরবিহীন কূটনৈতিক ঘনিষ্ঠতার সূত্রপাত মূলত গত এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট মিলেইয়ের তেল আবিব সফরের মধ্য দিয়ে। সেই সফরে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে একাধিক কৌশলগত চুক্তি সই করেন মিলেই। ২০২০ সালের 'আব্রাহাম অ্যাকর্ডস'-এর আদলে করা এই চুক্তির অধীনে চলতি বছরের শেষ নাগাদ বুয়েনোস আইরেস ও তেল আবিবের মধ্যে সরাসরি বিমান যোগাযোগ চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আর্জেন্টিনার দূতাবাস তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে স্থানান্তরের চূড়ান্ত ঘোষণাও দেন মিলেই। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু আশা প্রকাশ করেন, এই চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি মডেল লাতিন আমেরিকাতেও ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।
তেহরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন
ক্ষমতায় আসার পর থেকেই আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রনীতিকে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের ছাঁচে ঢেলে সাজিয়েছেন হাভিয়ের মিলেই। এর অংশ হিসেবে ইরান এবং দেশটির সামরিক বাহিনী 'ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী' (আইআরজিসি)-র বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়েছেন তিনি। আর্জেন্টিনা সম্প্রতি আইআরজিসি-কে আনুষ্ঠানিকভাবে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।
বুয়েনোস আইরেসের দাবি— ১৯৯২ সালে ইসরায়েলি দূতাবাসে হামলা এবং ১৯৯৪ সালে ইহুদি কমিউনিটি সেন্টারে আত্মঘাতী বোমা হামলার নেপথ্যে ইরানি কর্মকর্তা ও আইআরজিসির প্রত্যক্ষ হাত ছিল। তেহরান অবশ্য শুরু থেকেই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
আইআরজিসি-কে নিষিদ্ধ করার পর ইরান পাল্টা অভিযোগে আর্জেন্টিনাকে 'অপরাধের অংশীদার' এবং 'ইতিহাসের ভুল পক্ষে অবস্থানকারী' দেশ হিসেবে আখ্যা দিলে দুই দেশের সম্পর্ক আরও তলানিতে ঠেকে। এর জবাবে বুয়েনস আয়ার্সে নিযুক্ত ইরানি কূটনৈতিক দূতকে বহিষ্কার করে আর্জেন্টিনা।
সময়ের আলো/জেডি