সমুদ্রের গর্জন, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস আর প্রকৃতির বৈরিতার সঙ্গে লড়াই করে টিকে আছে উপকূলীয় জনপদ ছনুয়া। সেই জনপদেরই মধ্যখানে দাঁড়িয়ে আছে উপকূলীয় ছনুয়া হোছাইনিয়া দাখিল মাদরাসা। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেখানে প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থী জ্ঞানের আলো খুঁজতে আসে, কিন্তু তাদের সেই পথ আজ অনিশ্চয়তা আর শঙ্কায় ঘেরা।
দেয়ালের বুকে গভীর ক্ষতের মতো ফাটল, কোথাও কোথাও খসে পড়ছে পলেস্তারা। জানালাবিহীন কক্ষগুলো যেন দীর্ঘ অবহেলার নীরব সাক্ষী। বৃষ্টি নামলেই ছাদের ফাঁক গলে ঝরে পড়ে পানি, আর শিক্ষার্থীদের বই-খাতা ভিজে যায় উদ্বেগের স্রোতে। ভবনটির অবস্থা এতটাই নাজুক যে, যেকোনো মুহূর্তে ঘটতে পারে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা। তবুও বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় প্রায় পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী প্রতিদিন সেই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই পাঠ গ্রহণ করছে।
১৯৮৩ সালে ছনুয়া মনুমিয়াজী পরিবারের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই মাদরাসা ইউনিয়নের একমাত্র এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে এলাকার শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে রাখা প্রতিষ্ঠানটি আজ অবকাঠামোগত সংকটে যেন ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে আছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিনের অবহেলা ও সংস্কারের অভাবে মাদরাসার ভবনটি প্রায় ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। শ্রেণিকক্ষে বসে শিক্ষার্থীরা পাঠ নেয় এক অদৃশ্য আতঙ্ককে সঙ্গী করে। তবুও শিক্ষা কার্যক্রম থেমে নেই, কারণ এই মাদরাসাই তাদের স্বপ্ন দেখার একমাত্র অবলম্বন।
এক সময় বিদ্যুৎবিহীন ছিল প্রতিষ্ঠানটি। তীব্র গরমে শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। সম্প্রতি এলাকার সমাজহিতৈষী লায়ন মো. আমিরুল হক এমরুল কায়েস নিজ উদ্যোগে বিদ্যুৎ সংযোগের ব্যবস্থা করেন এবং উপহার দেন আটটি উন্নতমানের সিলিং ফ্যান। তার এই মানবিক উদ্যোগে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।
তবে বিদ্যুতের আলো জ্বললেও কাটেনি অবকাঠামোগত অন্ধকার। জরাজীর্ণ ভবন, ওয়াশরুম সংকট, অ্যাকাডেমিক কক্ষের অভাব এবং শিক্ষক স্বল্পতা এখনও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ২০ জন শিক্ষকের স্থলে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ১০ জন। শূন্য রয়েছে আরও ১০টি পদ। আইসিটি শিক্ষকের অভাবে ডিজিটাল যুগের শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মোছাম্মৎ ছকিনা জানায়, বৃষ্টি হলেই শ্রেণিকক্ষের ছাদ দিয়ে পানি পড়ে। পর্যাপ্ত ওয়াশরুম ও অ্যাকাডেমিক ভবনের অভাবে শিক্ষার্থীদের নানা দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মোহাম্মদ পারভেজের কণ্ঠে ধরা পড়ে আরেক বাস্তবতা। তার ভাষায়, দেশ ডিজিটাল যুগে এগিয়ে গেলেও আমাদের মাদরাসায় এখনও একজন আইসিটি শিক্ষক নেই।
মাদরাসার সুপার মাওলানা আবদুর রশিদ জানান, প্রতিষ্ঠানে একটি প্রিন্টার কিংবা ল্যাপটপও নেই। অফিসের প্রয়োজনীয় কাজের জন্য বাইরে যেতে হয়। শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি বৃষ্টির সময় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ থাকে। ছাদ চুঁইয়ে পানি পড়লে সবাইকে নিচতলায় সরিয়ে নিতে হয়।
শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবেই নয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় এই মাদরাসা আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল মজিদের ভাষায়, ঘূর্ণিঝড়ের সতর্ক সংকেত জারি হলে অসংখ্য মানুষ গবাদিপশুসহ এখানে আশ্রয় নেয়। অথচ বছরের পর বছর ধরে ভবনটির প্রয়োজনীয় সংস্কার হয়নি।
এদিকে মাদরাসার প্রবেশ সড়কটিও দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। প্রতিদিন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের দুর্ভোগ পোহাতে হয় এই পথে চলাচল করতে গিয়ে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের একাধিকবার বিষয়টি জানানো হলেও দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি।
উপজেলা মাধ্যমিক অ্যাকাডেমিক সুপারভাইজার এয়ার মুহাম্মদ জানান, আমি মাদরাসাটি পরিদর্শন করেছি এবং উপজেলার ঝুঁকিপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকায় এর নাম অন্তর্ভুক্ত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছি।
অন্যদিকে বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুহুল আমিন বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমি অবগত নই। ওই মাদরাসার সুপারকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলুন। যদি সাময়িক কোনো বিষয় হয়ে থাকে, তাহলে সেটি আমি সমাধানের চেষ্টা করবো। আর যদি বড় কোনো বিষয় হয়ে থাকে, তাহলে সেটি লং প্রসেসিং।
সময়ের আলো/জোই