মাদারীপুরের শিবচর চকবাজার জামে মসজিদের সাবেক খতিব বিএস এল মুফতি মুস্তাফিজুর রহমান কাফীকে ঘিরে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা তৈরি হয়েছে স্থানীয়ভাবে। প্রায় সাত বছর দায়িত্ব পালনের পর সম্প্রতি একটি খুদে বার্তার (এসএমএস) মাধ্যমে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে তিনি চলে যান। এরপর তার পরিচয়, কর্মকাণ্ড এবং আত্মপ্রচারে ব্যবহৃত বিভিন্ন তথ্য নিয়ে কৌতূহল ও বিতর্ক দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, করোনাভাইরাস মহামারির সময় পত্রিকায় প্রকাশিত একটি নিয়োগ বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে শিবচরে আসেন তিনি। আরবি ও ইংরেজিতে দক্ষ এবং সাবলীল বক্তা হিসেবে অল্প সময়েই মুসল্লিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তবে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করলেও স্থানীয় আলেম সমাজ ও ইমাম সমিতির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল না বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তার ব্যবহৃত একটি ভিজিটিং কার্ডের কিউআর কোডে সংযুক্ত পরিচিতিতে নিজেকে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন স্কলার, গ্লোবেট্রোটার (বিশ্ব পরিব্রাজক) ও ইনভেস্টিগেটর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে আরও দাবি করা হয়েছে, তিনি সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর ও ফিনল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের ভিআইপি পাসপোর্ট ব্যবহার করেন এবং ইউরোপের একাধিক দেশের নাগরিকত্বের অধিকারী।
একই পরিচিতিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তার বাড়ি, গাড়ি, হেলিকপ্টার ও ব্যক্তিগত বিমান থাকার কথাও উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি কুরআন ও বিজ্ঞানের ওপর পিএইচডি ডিগ্রিধারী, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের লেকচারার এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার দাবিও করা হয়েছে।
এসব দাবির সত্যতা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে কোনো তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, এত আন্তর্জাতিক পরিচয় ও সম্পদের দাবিদার একজন ব্যক্তি কেন একটি মফস্বল শহরের মসজিদে তুলনামূলক স্বল্প বেতনে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন।
স্থানীয় কয়েকজন মুসল্লির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দায়িত্ব পালনের সময় তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগও ওঠে। এর মধ্যে রমজান মাসে নিয়মিত নামাজ পরিচালনা না করা, দীর্ঘ সময় ছুটিতে থাকা এবং দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে মুসল্লিদের একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়।
এদিকে গত রমজান মাসে একটি খুদে বার্তাকে কেন্দ্র করে মসজিদের খতিব ও মুয়াজ্জিনকে ঘিরে বিরোধ দেখা দেয়। পরিস্থিতির একপর্যায়ে দীর্ঘ ১৭ বছর কর্মরত থাকা মুয়াজ্জিনকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। পরে ঈদুল ফিতরের নামাজ পরিচালনার পর ছুটিতে যান খতিবও।
শিবচর ইমাম সমিতির সভাপতি মো. বজলুর রহমান আরেফী বলেন, সংশ্লিষ্ট খতিবের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে তারা অবগত ছিলেন। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় পাঁচজন আলেমের মাধ্যমে শরয়ি অনুসন্ধানের একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে ওই প্রস্তাব পাওয়ার পর ছুটিতে থাকা অবস্থায় তিনি খুদে বার্তার মাধ্যমে পদত্যাগের কথা জানান।
তিনি আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট খতিব স্থানীয় আলেম-ওলামাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন না এবং ইমাম সমিতির সদস্যও ছিলেন না। পাশাপাশি তিনি নিজেকে সুইজারল্যান্ডের পাসপোর্টধারী বলে দাবি করতেন।
বিষয়টি নিয়ে বক্তব্য জানতে বিএস এল মুফতি মুস্তাফিজুর রহমান কাফীর ব্যবহৃত দুটি মোবাইল নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেগুলো বন্ধ পাওয়া যায়। পরে তার কাছে লিখিতভাবে কয়েকটি প্রশ্ন পাঠানো হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। বর্তমানে তিনি কোথায় অবস্থান করছেন, সে সম্পর্কেও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে তার বক্তব্য এই প্রতিবেদনে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে চকবাজার জামে মসজিদ কমিটির সভাপতি মো. শাহজাহান খান বলেন, এ খতিব স্থানীয় আলেম-ওলামাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতেন না। শেষ দিকে তিনি তাবিজ-কবজ দেওয়ার কার্যক্রমে জড়িত হন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া সাত বছর দায়িত্ব পালন করলেও মসজিদ কমিটির কাছে তার কোনো ছবি বা জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি সংরক্ষিত নেই।
তিনি জানান, গত ৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে একটি খুদে বার্তার মাধ্যমে খতিব চাকরিতে আর ফিরবেন না বলে কমিটিকে অবহিত করেন।
এদিকে বিশিষ্ট আলেম ও গবেষক মুফতি মাহমুদুল হাসান গুনবি ধর্মীয় নেতৃত্বের ক্ষেত্রে পরিচয় যাচাই ও সচেতনতার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের পরিচয় ও যোগ্যতা সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
স্থানীয় সচেতন মহল ও আলেমদের দাবি, আলোচিত এই ব্যক্তির প্রকৃত পরিচয় এবং তার বিভিন্ন দাবির সত্যতা যাচাইয়ে প্রয়োজনীয় তদন্ত হওয়া উচিত।
সময়ের আলো/জোই