বেনজীরের যত অপরাধ

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয়

সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ চাকরি জীবনে ছিলেন আলোচিত ও সমালোচিত। আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে তিনি ছিলেন প্রভাবশালী। তার

2026-06-15T15:46:52+00:00
2026-06-15T15:51:06+00:00
 
  সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬,
১ আষাঢ় ১৪৩৩
সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
জাতীয়
বেনজীরের যত অপরাধ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬, ৩:৪৬ পিএম  আপডেট: ১৫.০৬.২০২৬ ৩:৫১ পিএম  (ভিজিট : ২৮)
বেনজীর আহমেদ। ছবি : সংগৃহীত
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ চাকরি জীবনে ছিলেন আলোচিত ও সমালোচিত। আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে তিনি ছিলেন প্রভাবশালী। তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ, দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ, জমি দখল, অর্থ পাচার, পাসপোর্ট জালিয়াতি ও ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনসহ অনেক অভিযোগ উঠেছে।

১৯৮৮ সালে পুলিশে যোগ দেওয়া বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইজিপি পদে ছিলেন। এর আগে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার এবং র‍্যাবের মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। বেনজীর আহমেদের দুর্নীতির অনুসন্ধানে গতি পায়। তার আরও দুর্নীতির খবর বেরিয়ে আসে। বেশ কয়েকটি মামলার পর আদালত থেকে আসে গ্রেফতারি পরোয়ানা। তাকে গ্রেফতারে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি হয়।

অন্তর্বর্তী সরকার পেরিয়ে বিএনপি সরকার আসার চার মাসের মাথায় পুলিশের সাবেক এই মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) গ্রেফতারের খবর এল। ইন্টারপোলের সহযোগিতায় দুবাই পুলিশের মাধ্যমে ১২ জুন সে দেশে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ : রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার একজন আসামি বেনজীর আহমেদ। এই ঘটনার সময় ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের দায়িত্বে ছিলেন তিনি।

চিফ প্রসিকিউটর মো.আমিনুল ইসলামের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ৫ ও ৬ মে মাসে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে ৫৮ জন হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া গেছে।

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকারসহ অনেকে এই মামলার আসামি।

আওয়ামী লীগ সরকার আমলে র‍্যাবের টিএফআই সেলে গুম করে রাখার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের আরেকটি মামলায়ও বেনজীর আহমেদ আসামি। এই মামলায় মোট আসামি ১৭ জন। এর মধ্যে ১২ জন সেনা কর্মকর্তা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এই মামলায় এখন সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে।

ভয় দেখিয়ে সংখ্যালঘুদের জমি কিনে নেওয়া : নিজের এলাকা গোপালগঞ্জের বিশাল এলাকাজুড়ে রিসোর্ট গড়ে তুলেছিলেন বেনজীর। নিজের ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরে কয়েক শ বিঘা জমি কেনেন তিনি। এসব জমির প্রায় সবই ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের। তারা বলছেন, জমি বিক্রি ছাড়া তাদের কোনো উপায় ছিল না। ভয় দেখিয়ে, জোর করে এবং নানা কৌশলে তাদের কাছ থেকে জমিগুলো কেনা হয়।


গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার বৈরাগীটোল গ্রামে ৬০০ বিঘার বেশি জমির ওপর তিনি গড়ে তোলেন সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্ক। পরে আদালত পার্কসহ বিভিন্ন স্থাপনা জব্দের নির্দেশ দেন। ২০২৪ সালের জুনেই সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্কের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল গোপালগঞ্জ জেলা প্রশাসন।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ডেমরা-ইছাপুরা সড়কের পাশে ২৪ কাঠা জায়গাজুড়ে একটি বাড়ি করেন বেনজীর আহমেদ। নিজের মেয়ের মালিকানাধীন বাড়িটির নাম দেওয়া হয় সাভানা ইকো রিসোর্ট প্রাইভেট লিমিটেড। এর আগে আনন্দ হাউজিং সোসাইটির নামে স্থানীয় প্রেমানন্দ সরকারের মালিকানাধীন একটি ৫৫ শতাংশের জলাশয় জোর করে ভরাট করা হয়। পরে ভরাট করা ওই জমি ১ কোটি ৮৩ লাখ টাকায় কিনে নেন বেনজীর আহমেদ।

ভুয়া পিএইচডি অর্জন : আইজিপি হয়ে বেনজীর আহমেদ ২০১৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি নেন। এর পর থেকে তিনি নামের আগে ‘ডক্টর’ শব্দটি ব্যবহার করা শুরু করেন। তবে ডক্টরেট ডিগ্রি নেওয়ার প্রোগ্রামে ভর্তির যোগ্যতাই তাঁর ছিল না। শর্ত শিথিল করে তাকে ভর্তির সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।

বেনজীর আহমেদ ডক্টরেট ডিগ্রি নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডক্টর অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ডিবিএ) প্রোগ্রাম থেকে। সেখানে ভর্তির জন্য স্নাতক ডিগ্রি থাকতে হয়। শিক্ষাজীবনের সব পাবলিক পরীক্ষায় কমপক্ষে ৫০ শতাংশ নম্বর পেতে হয়। বেনজীরের তা ছিল না। পরে বেনজীর আহমেদের ডক্টরেট ডিগ্রি স্থগিত করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

পাসপোর্ট কেলেঙ্কারি : সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় সেই তথ্য গোপন করে বেসরকারি চাকরিজীবী হিসেবে পাসপোর্ট নিয়েছিলেন বেনজীর আহমেদ। এই কাজটি তিনি করেছিলেন ২০১৬ সালে, তখন তিনি র‍্যাবের মহাপরিচালক।

বেসরকারি চাকরিজীবী পরিচয়ে পাসপোর্ট নবায়নের আবেদন তিনি করলে তখন আপত্তি জানিয়েছিল পাসপোর্ট অধিদপ্তর। র‌্যাব সদর দফতরে চিঠিও দেওয়া হয়েছিল। জবাবে র‌্যাব সদর দপ্তরের তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) আবদুল জলিল মণ্ডল অবিলম্বে বেনজীরের পাসপোর্ট প্রতিস্থাপনের অনুরোধ করে চিঠি দেন। এর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বেনজীরকে পাসপোর্ট দেওয়া হয়। ছবি তোলা ও আঙুলের ছাপ নেওয়া হয় তাঁর বাসায় গিয়ে।

এটা সরকারি চাকরিবিধি ও পাসপোর্ট আইনে অপরাধ হলেও বেনজীরের কিছুই হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা : ২০২১ সালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র‍্যাবের সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসা কর্মকর্তাদের মধ্যে বেনজীর আহমেদও ছিলেন, যদিও তখন র‍্যাবে দায়িত্ব পালন শেষে আইজিপি পদে ছিলেন তিনি। তিনি র‍্যাবের প্রধান ছিলেন ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত।

নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই ২০২২ সালের আগস্টে বেনজীর আহমেদ জাতিসংঘের পুলিশপ্রধান সম্মেলনে অংশ নিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে যান। তবে সম্মেলনের কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার বাইরে ওই সফরে যুক্তরাষ্ট্রের অন্য কোথাও তিনি যেতে পারেননি।

জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ : বেনজীর আহমেদ এবং তার স্ত্রী ও দুই মেয়ের বিরুদ্ধে পৃথক চারটি মামলা রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনে। এসব মামলায় তাদের বিরুদ্ধে ৭৪ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়েছে।

মামলার তথ্য অনুসারে, বেনজীর ৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং ২ কোটি ৬২ লাখ টাকা সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন। তার স্ত্রীর জীশান মীর্জার ৩১ কোটি ৬৯ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং ১৬ কোটি ১ লাখ টাকার তথ্য গোপন করেছেন। তাদের বড় মেয়ে ফারহীন রিশতা বিনতে বেনজীর ৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকার এবং মেজ মেয়ে তাহসীন রাইসা বিনতে বেনজীর ৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন।


এ ছাড়া বেনজীর আহমেদ ও তার স্ত্রী-সন্তানদের নামে ঢাকার গুলশানে ৪টি ফ্ল্যাট, ৩৩টি ব্যাংক হিসাব, ১৯টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ৩টি বিও হিসাব (শেয়ার ব্যবসা করার বেনিফিশিয়ারি ওনার্স অ্যাকাউন্ট) এবং ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রের সন্ধান পায় দুদক। দুদকের আবেদনে এসব সম্পদ জব্দ করার আদেশ দেন আদালত।

দুদকের মামলায়ই গত বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেন ঢাকার আদালত।

অর্থ পাচারের অভিযোগ : বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগও রয়েছে। দুদক ১১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা পাচারের অভিযোগে বেনজীর আহমেদ, তার স্ত্রী ও দুই কন্যাসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।

গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে দুদকের কর্মকর্তারা বলেন, ১১ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা ঋণের পর কোথাও বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া যায়নি। এই টাকা তুলে নেওয়ার পরপরই তিনি বিদেশ চলে যান।

দুর্নীতির খবর প্রকাশের পর দুদকের অনুসন্ধান শুরু হলে ২০২৪ সালের ৪ মে দেশ ছেড়েছিলেন বেনজীর।

সময়ের আলো/জেডআই


  বিষয়:   বেনজীর আহমেদ 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: