জমি বিক্রি ঠেকাতে দুই বছর আগে চট্টগ্রামের হালিশহরে ছেলে বেলাল হোসেনের হাতে খুন হন পিতা মীর মজিবুর রহমান খানকে (৬০)। দুই বছর পরে এসে এই ক্লুলেস হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্তে জানা যায় জমি বিক্রি ঠেকাতে মুজিবুরকে খুন করে তারই ছেলে বেলাল হোসেন। পিবিআই টিম ৩৫ বছর বয়সি বেলালকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীও দিয়েছে বেলাল।
সোমবার (১৫ জুন) দুপুরে পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।
পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার এস এম রফিকুল ইসলাম বলেন, খুন হওয়া মীর মজিবুর রহমান খান চট্টগ্রামের বাঁশখালী জেলার পূর্ব চাম্বল গ্রামের বাসিন্দা। তিনি পেশায় ছিলেন বাবুর্চি। তিনি মোট তিনটি বিয়ে করেন। প্রথম স্ত্রীর ঘরের দুই ছেলে বেলাল হোসেন ও আনোয়ার হোসেন। দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরে সালমা খানম নামের একটি মেয়ে আছে। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর মজিবুর রহমান দ্বিতীয় স্ত্রীর নানা বাড়ি ফটিকছড়িতে থাকতেন।
২০২২ সালে মজিবুর রহমানের দ্বিতীয় স্ত্রী মারা যান। এরপর তিনি বাঁশখালীতে থাকা নিজের কিছু জমি বিক্রি করে দেন। সেই টাকা দেন দ্বিতীয় ঘরের মেয়ে সালমাকে। এতে প্রথম ছেলে বেলাল ক্ষিপ্ত হয়। বেলাল মনে করেছিল বাবা তাকে পৈত্রিক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করছে। এর মধ্যে মজিবুর রহমান নিজের আরো সম্পত্তি বিক্রির উদ্যোগ নেন। কিন্তু ছেলে বেলাল হোসেন বাবাকে এ কাজ থেকে বিরত রাখার উদ্যোগ নেন। এক পর্যায়ে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করে।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে পুলিশ সুপার জানান, খুনের ঘটনার আগে থেকেই বেলাল চট্টগ্রাম নগরীতে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। নগরীর খুলশী থানা এলাকায় এক ভাড়া বাসায় থাকতেন পরিবার নিয়ে। বাঁশখালীতে গ্রামের বাড়িতে থাকতেন তার আরেক ভাই আনোয়ার হোসেন। বেলাল হোসেন পরিকল্পনা অনুযায়ী তার পূর্ব পরিচিত এক নারীকে তার বাবার সাথে টেলিফোনে প্রেমের অভিনয় করার পরামর্শ দেয়। বেলাল হোসেনের পরামর্শে ওই নারী মজিবুর রহমানের সাথে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে।
২০২৪ সালের ৬ জুন মজিবুর রহমান ফটিকছড়ির বাড়ি থেকে নগরীর আন্দরকিল্লা এলাকায় মেয়ে সালমা খানমের বাসায় বেড়াতে আসেন। মেয়ের বাসায় থাকাকালে ৭ জুন মজিবুর রহমানকে মোবাইলে ফোন দেন ওই নারী। পরে ওই নারীর অনুরোধে নগরীর বাকলিয়া থানার আনন্দ সাবান ফ্যাক্টরি এলাকায় তার বাসায় যায়। ওই বাসায় আগে থেকেই বেলাল হোসেনের স্ত্রীর বড় বোনের স্বামী আব্দুল জলিল উপস্থিত ছিলেন। মজিবুর রহমান ওই বাসায় গেলে সেই নারী ও আব্দুল জলিল শরবতের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে মজিবুরকে খাওয়ান। এতে তিনি অর্ধচেতন হয়ে পড়েন।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে পুলিশ সুপার আরও বলেন, সেদিন বিকালে আব্দুল জলিল ও বেলাল হোসেন মিলে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে মজিবুরকে নগরীর সিআরবি এলাকাতে নিয়ে যান। সিআরবিতে মজিবুরকে অটোরিকশায় জলিলের পাহারায় রেখে বেলাল নগরীর লালদীঘি পাড় থেকে একটি মাইক্রোবাস ভাড়ায় নিয়ে আসেন। তারপর মাইক্রোবাসটি নিজে চালিয়ে সন্ধ্যার দিকে আব্দুল জলিলসহ মজিবুরকে হালিশহর থানার আউটার রিং রোডে নিয়ে যায়। সেখানে গাড়ি থামিয়ে বেলাল হোসেন ও আব্দুল জলিল ভিকটিম মজিবুর রহমানের গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে।
মরদেহ রাস্তার পাশে ঝোপঝাড়ে ফেলে দিয়ে পালিয়ে যায়। হত্যার সময় মজিবুরের পরনে ছিল সাদা লুঙ্গি ও সাদা পাঞ্জাবি। ওই বছরের ৯ জুন নগরীর হালিশহর থানার আউটার রিং রোড এলাকায় গামছা পেঁচানো অবস্থায় পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করেছিল।
এর মধ্যে বাবার খোঁজ শুরু করে মেয়ে সালাম। কোনো খোঁজ না পেয়ে সালমা খানম ওই বছরের ৭ জুলাই কোতোয়ালী থানায় একটি জিডি করেন। পরে ওই বছরের ৬ নভেম্বর তিনি আদালতে অপহরণের মামলা করেন।
মরদেহ উদ্ধারের পর হালিশহর থানা পুলিশ অনেক চেষ্টা করেও মরদেহের পরিচয় শনাক্ত পারেনি। পরে আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে মরদেহ দাফন করেছিল। নিহতের পরিচয় উদঘাটন ও হত্যার কারণ বের করতে না পেরে থানা পুলিশ চূড়ান্ত প্রতিবেদনও দিয়ে দেয়। পরে পিবিআই এই ঘটনার তদন্তে নামে। দীর্ঘ তদন্তের পর ক্লুলেস হত্যা মামলার মোটিভ উদ্ধার করে। গেল শনিবার বিকেলে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী থানার মইজ্জ্যারটেক এলাকা থেকে ছেলে বেলাল হোসেনকে (৩৫) গ্রেফতার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মীরসরাই উপজেলার জোরারগঞ্জ থানার ঘোড়ামারা এলাকা থেকে আব্দুল জলিলকে গ্রেফতার করা হয়।
এসপি এস এম রফিকুল ইসলাম বলেন, বেলাল হোসেনের পরিকল্পনায় বাবা মজিবুর রহমানকে গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর জঙ্গলে নিয়ে লাশ ফেলে দেয়া হয়। পুলিশের কাছে বেলাল ও জলিল হত্যার পুরো বর্ণনা দিয়েছেন।
বেলাল হোসেনকে রোববার আদালতে হাজির করা হয়। বেলাল স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এ ঘটনায় বেলালের সহযোগী ওই নারীকে গ্রেফতারের পুলিশের অভিযান চলছে।
সময়ের আলো/আতা