যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি ও প্রাথমিক চুক্তিটি ইসরাইলের জন্য একটি বড় ধরনের ‘কৌশলগত ধাক্কা’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ইসরাইলি বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা ওয়াশিংটনে দেশটির দীর্ঘদিনের প্রভাব ও দাপট কমে যাওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। যদিও চুক্তির চূড়ান্ত রূপরেখা আগামী ৬০ দিনের মধ্যে নির্ধারিত হবে, তবে এর প্রাথমিক খসড়া ইতিমধ্যেই তেল আবিবের নীতিনির্ধারক ও বিশ্লেষকদের মাঝে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। এএফপি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তিতে ইসরাইলের অস্তিত্ব রক্ষার চেয়ে ইরানের স্বার্থকেই বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। ইসরাইলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের বিশ্লেষক সিমা শাইন বলেন, আমরা জানতাম চুক্তিটি এমন হবে, যেখানে ইরানি স্বার্থের প্রতিফলন ঘটবে বেশি।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের প্রধান কারণগুলোর একটি হলো পারমাণবিক ইস্যু। ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে সরাসরি নস্যাৎ করার যে লক্ষ্য ইসরাইল নির্ধারণ করেছিল, তা এই চুক্তিতে অমীমাংসিত রয়ে গেছে। এরপর রয়েছে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা। পারমাণবিক ইস্যুকে ভবিষ্যতের অনিশ্চিত সময়ের জন্য ফেলে রাখায় ভবিষ্যতে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের পক্ষে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হবে। আরেকটি বিষয় হলো ইরানের শক্তি বৃদ্ধি। যুদ্ধের তিন মাস পর তেহরান কেবল টিকেই থাকেনি, বরং আগের চেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে আবির্ভূত হয়েছে।
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য এই চুক্তিটি একটি বড় ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক ব্যর্থতা। দীর্ঘ সময় ধরে নিজেকে ‘মিস্টার ইরান’ হিসেবে পরিচিত করে তোলা নেতানিয়াহু এই সংঘাতের মাধ্যমে হামাস, হিজবুল্লাহ এবং তেহরানের ক্ষমতা ধ্বংসের যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা বাস্তবায়িত হয়নি। ইসরাইলি সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ড্যানি সিট্রিনোভিচের মতে, এটি ইসরাইল রাষ্ট্রের জন্য একটি রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিপর্যয়। যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এই চুক্তির কারণে নেতানিয়াহু এখন তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন।
অন্যদিকে এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সম্পর্কের এক নতুন সমীকরণ উন্মোচিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক মাইকেল হোরোভিৎজ বলছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইসরাইলের প্রভাব যে কতটা কমেছে, তা এই চুক্তির মাধ্যমেই স্পষ্ট। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরাইলের উদ্বেগগুলোকে পাত্তা না দিয়েই একতরফাভাবে ইরানের সঙ্গে এই চুক্তিতে এগিয়ে গেছেন।
চুক্তির আগে ট্রাম্প যেভাবে নেতানিয়াহুর সমালোচনা করেছেন এবং ইসরাইলকে না জানিয়েই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন, তা প্রমাণ করে যে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় ইসরাইলের নড়চড় করার ক্ষমতা এখন সীমিত। ট্রাম্প স্পষ্টই জানিয়েছেন, ইসরাইলকে এখন এই পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। তিনি দাবি করেছেন, এই চুক্তির কারণে ইসরাইল বেঁচে গেল, অন্যথায় ইরানের পারমাণবিক শক্তির কাছে তাদের টিকে থাকা কঠিন হতো।
ইসরাইলি সামরিক বিশেষজ্ঞ মাইকেল মিলশটেইনের মতে, এই চুক্তিটি ইসরাইলকে যুদ্ধের আগের চেয়ে আরও দুর্বল অবস্থানে ফেলে দিয়েছে। তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই সমঝোতার পর, গাজা ও লেবাননের ক্ষেত্রেও ইসরাইলকে সম্ভবত বাধ্য হয়েই একই ধরনের কঠোর ও প্রতিকূল শর্ত মেনে নিতে হবে।
ইসরাইলের বর্তমান অবস্থান এমন দাঁড়িয়েছে যে, সামরিকভাবে আগ্রাসী হওয়ার সুযোগ কমে গেছে এবং কূটনৈতিকভাবে ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতা বজায় রেখেও কোনো বিশেষ সুবিধা আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না। সব মিলিয়ে ইসরাইলের জন্য এই নতুন ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং।
আরবিএন