ভুট্টাখেতের গর্ত থেকে শিশুর মরদেহ উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ছবি : সংগৃহীত
লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলায় নিখোঁজের পরদিন শিশুর মরদেহ উদ্ধারকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও প্রশাসনের সঙ্গে বিক্ষুব্ধ জনতার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ঘটনায় পুলিশ সদস্য ও সাংবাদিকসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুপুরে উপজেলার ভেলাবাড়ি ইউনিয়নের ফলিমারী গ্রামে ঘটনা ঘটে। নিহত নন্দিনী রানীর (৭) ওই গ্রামের নলিনী কান্তের মেয়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হওয়ায় আদিতমারী থানার ওসিকে তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার করা হয়েছে।
সোমবার (১৫ জুন) বিকাল থেকে নিখোঁজ নন্দিনীর বস্তাবন্দী লাশের সন্ধান মেলে গ্রামের একটি ভুট্টাখেতের গর্ত থেকে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতে মরদেহ উদ্ধার করা হলে পুরো এলাকায় তীব্র অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদকসেবী বিধান চন্দ্র (২৩) ওই শিশুকে ভুট্টাক্ষেতে নিয়ে মুখ বেঁধে ধর্ষণ ও হত্যার পর লাশ গুম করতে মাটিতে পুঁতে রেখেছিল।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, সোমবার বিকেল থেকে হঠাৎ নিখোঁজ ছিল শিশু নন্দিনী। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান মেলেনি। মঙ্গলবার সকালে পরিবারের লোকজন ও স্থানীয়রা পুনরায় খুঁজতে বের হন। একপর্যায়ে বাড়ির পাশে একটি ভুট্টাক্ষেতে নতুন খোঁড়া নরম মাটি দেখে তাদের সন্দেহ হয়। সেখানে মাটি খুঁড়তেই নন্দিনীর বস্তাবন্দি লাশ বেরিয়ে আসে।
নিহত শিশু।
শিশুটির বাবা বলেন, গ্রামে কারও সঙ্গে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। খুব সাধারণ জীবনযাপন করি। সোমবার দুপুরেও মেয়ের সঙ্গে ভাত খেয়েছি। ছোট্ট মেয়েটিকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়েছে। এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।
শিশুটির মা বলেন, বাড়ির পাশেই অনেকগুলো ভুট্টাখেত। হয়ত মেয়েকে প্রলোভন দেখিয়ে আটকে রেখে পৈশাচিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। এরপর তাকে হত্যা করেছে।
লাশ উদ্ধারের পর জানা যায়, সোমবার সন্ধ্যায় অভিযুক্ত বিধান চন্দ্রকে ওই ভুট্টাক্ষেত থেকে কোদাল হাতে ফিরতে দেখেছিলেন এক প্রতিবেশী। এই তথ্যের ভিত্তিতে বিক্ষুব্ধ জনতা বিধানের বাড়িতে চড়াও হয়। গ্রেপ্তার এড়াতে বিধান নিজের ঘরের বাইরে তালা লাগিয়ে ভেতরে আত্মগোপন করেছিলেন। জনতা তালা ভেঙে ঘরে ঢুকে তাকে ধরে পিটুনি দেওয়ার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে উত্তেজিত জনতা প্রতিবেশী বিধান চন্দ্রের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়।
প্রশাসনের গাড়ি ভাঙচুর করে উত্তেজিত জনতা।
খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে বিধানকে নিজেদের হেফাজতে নিলে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে জনতা। তারা তাকে ছিনিয়ে নিতে গেলে পুলিশের সঙ্গে শুরু হয় সংঘর্ষ। খবর পেয়ে লালমনিরহাট পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান ও ক্রাইমসিন ইউনিট ঘটনাস্থলে গেলে তারাও অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে পর্যায়ক্রমে সদর থানা, কালীগঞ্জ থানা, ডিবি পুলিশ, ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক প্রধান এবং বিজিবি ১৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মেহেদী ইমামও কর্মকর্তাদের নিয়ে সেখানে যান। কিন্তু উত্তেজিত জনতা কাউকেই তোয়াক্কা না করে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সবাইকে প্রায় তিন ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখে এবং দফায় দফায় হামলা চালায়।
পরিস্থিতি এখন পুলিশের নিয়ন্ত্রণে।
পরে মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটার দিকে পুলিশ ও বিজিবি তিন রাউন্ড সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে দেয় এবং অবরুদ্ধ কর্মকর্তা ও আটক ব্যক্তিদের নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করার চেষ্টা করে। এ সময় শেষ দফায় প্রশাসনের বহর লক্ষ্য করে চারপাশ থেকে বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে জনতা। এতে এসপি আসাদুজ্জামান ও ওসি নাজমুল হকসহ অন্তত ৩০ জন আহত হন। ভেঙে চুরমার হয়ে যায় জেলা প্রশাসকের গাড়ি ও পুলিশের প্রিজন ভ্যানসহ সাতটি গাড়ি।
এ বিষয়ে লালমনিরহাট পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান বলেন, উত্তেজিত জনতার ইটের আঘাতে আমি নিজেও আহত হয়েছি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ৩ রাউন্ড সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়া হয়েছে। কয়েকজন পুলিশ আহত এবং আমাদের বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর হয়েছে। দায়িত্বে অবহেলার কারণে আদিতমারী থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, শিশু হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে ও অভিযুক্ত বিধান চন্দ্র এবং তার বাবা রণজিৎ কুমারকে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার ঘটনায় আরও একটি মামলা দায়ের করা হবে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক প্রধান বলেন, মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য লালমনিরহাট সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। আপাতত ওসিকে থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।