গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে ক্লাস চলাকালীন সময়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদান বন্ধ রেখে সমাবেশ, মানববন্ধন ও র্যালির আয়োজনের অভিযোগ উঠেছে শিবরাম আলহাজ্ব মো. হোসেন স্মৃতি স্কুল অ্যান্ড কলেজে। কলেজ মাঠে মঞ্চ নির্মাণ করে উচ্চস্বরে মাইকিংয়ের মধ্যেই চলে কর্মসূচি। এতে দিনভর পাঠদান কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের একাংশের অভিযোগ, শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করে এ কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রোববার (২ আগস্ট) সকাল থেকেই কলেজে যথারীতি ক্লাস চলছিল। প্রথম পিরিয়ড চলাকালেই মাঠে নির্মিত মঞ্চ থেকে উচ্চস্বরে মাইকিং করে সমাবেশে লোকজনকে আহ্বান জানানো হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই মাইকের শব্দে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ব্যাহত হতে থাকে। পরে সমাবেশ, মানববন্ধন ও র্যালি শুরু হলে কার্যত পুরো কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম থমকে যায়। বিকেল প্রায় ৩টা পর্যন্ত আর কোনো ক্লাস অনুষ্ঠিত হয়নি। এ সময় অনেক শিক্ষার্থীকে শ্রেণিকক্ষ থেকে বের হয়ে কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা যায়।
স্থানীয়দের ব্যানারে আয়োজিত ওই সমাবেশ, মানববন্ধন ও র্যালিতে বরখাস্তকৃত অধ্যক্ষ গোলাম আজম, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ফরিদা পারভীন এবং প্রদর্শক আবু তাহের আলমের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ, স্বেচ্ছাচারিতা ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রতিষ্ঠানে সুষ্ঠু শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানানো হয়।
একাদশ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর পিতা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘সমাবেশ ও মানববন্ধনের কারণে কোনো ক্লাস হয়নি। শুধু ওই দিনই নয়, অনেক দিন ধরেই বিদ্যালয়ে নিয়মিত ক্লাস হচ্ছে না। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। আমরা চাই বিদ্যালয়ে স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ ফিরে আসুক এবং নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করা হোক।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিদ্যালয়ের সাবেক এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘স্বার্থ ছাড়া কেউ কিছু করে না। বিদ্যালয়ে ৬-৭টি নিয়োগের বিষয় রয়েছে। মূলত সেটিকে কেন্দ্র করেই এই আন্দোলন হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার ক্ষতি করে কোনো কর্মসূচিই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শিক্ষক বলেন, ‘বিদ্যালয়ে এসে দেখি আগেই মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল। তারপরও আমরা প্রথম পিরিয়ডের ক্লাস নিয়েছিলাম। কিন্তু উচ্চস্বরে মাইক বাজানোর কারণে পরে আর ক্লাস নেওয়া সম্ভব হয়নি।’
এ বিষয়ে প্রদর্শক আবু তাহের আলম বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে একটি কুচক্রী মহল এ আন্দোলন করেছে।’
ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ফরিদা পারভীন বলেন, ‘২০০৩ সালে প্রভাষক (পৌরনীতি) পদে এ কলেজে যোগদান করি। পরে ২০২০ সালে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পাই। পরিপত্র অনুযায়ী ২০২৪ সালের ৩১ জানুয়ারি থেকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। কিন্তু গত ২৯ জুলাই প্রতিষ্ঠানের সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. গাওছেল আজমকে স্থানীয় কয়েকজন জোরপূর্বক আমার চেয়ারে বসিয়ে দেন। এরপর থেকেই আমার বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।’
অন্যদিকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দাবিদার সহকারী প্রধান শিক্ষক (স্কুল শাখা) মো. গাওছেল আজম বলেন, ‘আমি প্রতিষ্ঠানে ছিলাম। সমাবেশ শুরু হলে উপস্থিত লোকজন আমাকে মঞ্চে ডাকেন। পরে সবার বক্তব্য শেষে আমি বক্তব্য দিই।’
তবে ক্লাস চলাকালে শিক্ষার্থীদের নিয়ে কর্মসূচি আয়োজন কতটা যৌক্তিক, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোনো মন্তব্য না করে ফোন কেটে দেন।
এ বিষয়ে গাইবান্ধা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আতাউর রহমানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, ‘ক্লাস ফেলে শিক্ষার্থীদের দিয়ে এ ধরনের আন্দোলন করা কোনোভাবেই ঠিক হয়নি। বিষয়টি জানার পর উভয় পক্ষকে ডাকা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘জোরপূর্বক কেউ কাউকে দায়িত্ব দিতে পারেন না, আবার কেউ দায়িত্ব নিতেও পারেন না। এ বিষয়ে সরকারি পরিপত্র রয়েছে। পরিপত্রের বাইরে কোনো সিদ্ধান্তের বৈধতা নেই।’
সময়ের আলো/মহু