বিশ্বের অন্যতম সুখী শিশুদের তালিকায় ডাচ শিশুদের গণ্য করা হয়। তারা অস্বাভাবিকভাবে সুখী ও স্বাস্থ্যবান। যার পেছনে রয়েছে পায়ে হাঁটার এক দীর্ঘ সংস্কৃতি। এই শিশুরা মহানন্দে সেই হাঁটা উৎসবে যোগ দেয়। সেই হাঁটা উৎসবে যোগ দিয়েছিলেন হানা ডক্টর লোয়েব। তিনি এই সংস্কৃতি নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানে।
তিনি লেখেন, ডাচ শিশুদের যে ঝড়-বৃষ্টি আটকে রাখতে পারবে না, তা নিয়ে অবাক হওয়ার কিছু নেই। সেদিন সারা দিন ধরে বজ্রসহ বৃষ্টিপাত হচ্ছিল, সন্ধ্যার পূর্বাভাসও খুব একটা ভালো ছিল না।
তবু বিকাল ৫টার দিকে আমস্টারডামের ওয়েস্টারপার্কে শত শত শিশু জড়ো হতে শুরু করে যাদের অনেকেই এসেছে সাইকেল চালিয়ে। ওয়েস্টারপার্ক হলো রাজধানীর আবাসিক এলাকার বাসিন্দাদের জন্য খুব প্রিয় একটি উদ্যান। এখান থেকেই শুরু হবে শিশুদের পদযাত্রার এক অনুষ্ঠান। স্বেচ্ছাসেবীরা নিবন্ধনের কাজ সামলাচ্ছেন, আর শিশুরা বৃষ্টিতে ভেজার জন্য রেইনকোট পরে প্রস্তুত হয়ে ৫ বা ১০ কিলোমিটার হাঁটার জন্য জড়ো হচ্ছে।
এটি ডাচ ঐতিহ্য ‘অ্যাভন্ডভিয়েরডাগসে’-এর দ্বিতীয় রাত, যার আক্ষরিক অর্থ হলো ‘চার দিনের সান্ধ্য পদযাত্রা’। এটি পাড়ার স্বেচ্ছাসেবকদের একটি দলের উদ্যোগে আয়োজিত হয়। এটি কোনো দৌড় প্রতিযোগিতা নয়; তবে যদি শিশুরা টানা চার রাত হাঁটতে পারে, তবে তাদের পদক, ফুলের তোড়া এবং ভাগ্যে থাকলে অনেক মিষ্টি দেওয়া হয়। শুধু আমস্টারডাম নয়, পুরো নেদারল্যান্ডসের গ্রাম, শহর ও নগরে লাখ লাখ মানুষ এই অনুষ্ঠানে যোগ দেয়। প্রতি বছর গ্রীষ্মের শুরুতে শিশুরা তাদের স্কুলের বন্ধু ও মা-বাবার সঙ্গে পাড়া ঘুরে বেড়ায়, যা ‘উইক ভ্যান দে অ্যাভন্ডফোরডাগসে’ বা ‘চার দিনের সান্ধ্য পদযাত্রার সপ্তাহ’ হিসেবে পরিচিত।
কিছু জায়গায় এটি আগেই উদযাপিত হয়েছে, কেউ কেউ আবার পরের সপ্তাহে হাঁটবে। এমনকি ডাচদের প্রাক্তন উপনিবেশ সুরিনামেও এই ঐতিহ্যের একটি সংস্করণ প্রচলিত আছে। এ ছাড়া চার দিনের সাইক্লিং ও সাঁতারের ইভেন্টও রয়েছে। রয়্যাল ডাচ ওয়াকিং অ্যাসোসিয়েশনের মতে, সারা দেশে ৭০০টি জায়গায় প্রতি বছর পাঁচ লাখ মানুষ এতে অংশ নেয়, আর এর নেপথ্যে কাজ করেন হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবক।
স্বেচ্ছাসেবক জুডিথ ভ্যান আউডহেউসডেন বলেন, এই ইভেন্টটি এতটাই ডাচকেন্দ্রিক পৃথিবীর আর কোথাও এমনটা দেখা যায় না। আমরা যখন এক চেকপয়েন্ট থেকে অন্য চেকপয়েন্টে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছি, তখন তিনি এ কথা বলেন।
আমাদের দায়িত্ব শিশুদের কার্ডে স্ট্যাম্প দেওয়া, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে তারা ১০ কিলোমিটার হাঁটার এই অংশটুকু সম্পন্ন করেছে। একটি সম্পূর্ণ কার্ড মানেই শেষ দিনে পদক নিশ্চিত, আর অনেক শিশু এটি অর্জনের জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এই রাতে তারা পাড়ার পশ্চিম সীমানা ধরে হাঁটবে, ইরাসমাসপার্ক ও রেমব্রান্টপার্কের মতো সবুজ পার্কের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাবে। ফেরার পথে ওয়েস্টারপার্কে যাওয়ার সময় দেখা মিলবে ঐতিহাসিক ‘মোলেন ডি ওটার’ উইন্ডমিলের।
ভ্যান আউডহেউসডেন জানান, তিনি শৈশবে এই পদযাত্রায় অংশ নিয়েছেন, পরে তার নিজের সন্তানরাও যখন ছোট ছিল, তখন তাদের সঙ্গে হেঁটেছেন। স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করা তাকে নিজের ফেলে আসা দিনে ফিরে যাওয়ার সুখ দেয়।
রয়্যাল নেদারল্যান্ডস একাডেমি অব আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেসের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অধ্যাপক ইঙ্গার লিম্যানস ব্যাখ্যা করেন যে, অ্যাভন্ডভিয়েরডাগসের উৎপত্তি সামরিক আদর্শ থেকে। ১৯০৯ সালে নাইমেগেনে সামরিক প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে প্রথম এই পদযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে বিভিন্ন শহর সৈন্যদের জন্য নিজস্ব পদযাত্রার আয়োজন করতে শুরু করে। যুদ্ধের পর সাধারণ নাগরিকদেরও তাদের সঙ্গে হাঁটার আমন্ত্রণ জানানো হয়।
নাইমেগেনের এই চার দিনের পদযাত্রাটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, যেখানে হাজার হাজার সৈন্য ও নাগরিক সংহতির প্রতীক হিসেবে একসঙ্গে হাঁটত। মূলত বয়স্কদের জন্য হলেও এটি এখন বিশ্বের বৃহত্তম পদযাত্রা ইভেন্ট, যেখানে প্রতি বছর ৮০টিরও বেশি দেশের ৪৫ হাজার মানুষ একসঙ্গে ৩০, ৪০ ও ৫০ কিলোমিটার পথ হাঁটেন। রয়্যাল ডাচ ওয়াকিং অ্যাসোসিয়েশনের প্রকল্প ও কর্মসূচির টিম লিডার আরনো ভ্যান গেমার্টের মতে, অ্যাভন্ডভিয়েরডাগসে হলো সেই ইভেন্টেরই একটি ‘ছোট ভাই বা বোন’। এটি মূলত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের জন্য।
অধ্যাপক লিম্যানস, যিনি নিজেও বেলজিয়াম সীমান্তের কাছে লিন্ডে গ্রামে বেড়ে ওঠার সময় এই ঐতিহ্যে অংশ নিয়েছিলেন। তিনি বলেন, মজার ব্যাপার হলো, সামরিক উৎস থেকে শুরু হওয়া এই হাঁটা অনুষ্ঠানটি এখন ডাচদের জাতীয় পরিচয়ের একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ নেদারল্যান্ডস নিজেকে খুব একটা সামরিক জাতি হিসেবে তুলে ধরে না।
অধিকাংশ মানুষ এখন একে জাতীয় উৎসব হিসেবেই দেখে, অনেকটা ‘কিংস ডে’-র মতো, যখন রাজা বা রানীর জন্মদিন উপলক্ষে রাস্তাঘাটে উৎসব, ফ্লি মার্কেট এবং কমলা রঙের পোশাকের সমারোহ দেখা যায়। অ্যাভন্ডভিয়েরডাগসের নিজস্ব একটি ঐতিহ্যবাহী খাবারও আছে। সেটি হলো অর্ধেক কমলা, যার ওপর একটি সাদা উইলহেলমিনা মিন্ট রাখা থাকে এবং তা মসলিন কাপড় দিয়ে মোড়ানো থাকে। শিশুরা হাঁটার সময় এটি চুষতে থাকে। পথে অনেক শিশুকে এই খাবার মজা করে খেতে থাকে।
মূল পদযাত্রাগুলোর উদ্দেশ্য ব্যায়াম করা ছিল না। তবে অ্যাভন্ডভিয়েরডাগসে এখন শিশুদের বাইরের জগতে সময় কাটাতে এবং শারীরিক কসরতে উৎসাহিত করার একটি উপায় হয়ে উঠেছে।
লেইডেন ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টারের শিশু শারীরিক সক্রিয়তাবিষয়ক অধ্যাপক সানে ডি ভ্রিস বলেন, শিশুদের শারীরিক সক্রিয় থাকা এবং ছোট বয়স থেকেই তাদের মোটর স্কিল বা শারীরিক দক্ষতা বৃদ্ধি করা গুরুত্বপূর্ণ। বৃষ্টি বা রোদ যাই হোক, পুরো সপ্তাহ হাঁটা শেষ করার জন্য শিশুদের উৎসাহিত করা এবং শেষে পুরস্কৃত করা শারীরিক কার্যকলাপের সঙ্গে একটি ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করে। আর এই ‘স্থায়ী ইতিবাচক আবেগ শিশুদের জন্য খুব জরুরি’।
এটি শিশুদের মধ্যে সহনশীলতাও গড়ে তোলে। ডাচ শিশুদের বিশ্বের অন্যতম সুখী শিশু হিসেবে গণ্য করা হয়। এ বছর ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে ৪৪টি পশ্চিমা দেশের মধ্যে সার্বিক সুস্থতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের দিক থেকে তাদের এক নম্বরে রাখা হয়েছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে শক্তিশালী সামাজিক সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ডাচ শিশুদের তাদের সমবয়সিদের সঙ্গে খুব দৃঢ় সম্পর্ক রয়েছে। এ ছাড়াও অনেক ডাচ অভিভাবক পার্টটাইম কাজ করেন, ফলে তারা সন্তানদের সঙ্গে কাটানোর জন্য বেশি সময় পান। শিশুদের স্বাধীনতাও বেশি থাকে; অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে দেন এবং অনেকেই ছোটবেলা থেকেই একা সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যাতায়াত করে।
অ্যাভন্ডভিয়েরডাগসেতে সেই সামাজিক সম্পর্কগুলোই ফুটে ওঠে। এই হাঁটা কেবল মা-বাবার সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ নয়, বরং শ্রেণিকক্ষের বাইরে স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশারও একটি দারুণ মাধ্যম। ১০ বছর বয়সি রবিন অ্যাস্টিল তার মা ও বন্ধুর সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে জানায় ‘বন্ধুদের সঙ্গে এটি খুব মজার।’ ১৩ বছর বয়সি আনসেল হাওয়ার্ড বলে, আমার খুবই ভালো লাগে যে এটি প্রতি বছর হয় এবং এর মাধ্যমে ব্যায়ামও হয়। এটি এমন একটি কাজ যা মানুষ দীর্ঘদিন ধরে করে আসছে এবং আপনি আপনার বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে উপভোগ করতে পারেন।
অভিভাবকরাও অ্যাভন্ডভিয়েরডাগসে উপভোগ করেন। ৪৬ বছর বয়সি রেবেকা অ্যাস্টিল ছোটবেলায় এতে অংশ নিয়েছিলেন; এখন অভিভাবক হিসেবে এটি তার জন্য চারপাশ ঘুরে দেখার একটি সুযোগ। তিনি তার সন্তানদের সঙ্গে ১০ বার এই পদযাত্রায় অংশ নিয়েছেন।
তিনি বলেন, এর মাধ্যমে আপনি আপনার এলাকাটিকে আরও ভালো করে চিনতে পারেন, এমন সব রাস্তা দিয়ে হাঁটতে পারেন যা দিয়ে সচরাচর হাঁটা হয় না। আয়োজকরাও নতুন নতুন জায়গা দেখানোর জন্য প্রতি বছর রুট পরিবর্তন করেন। আয়োজক ফিলিপ বুয়েটার্স, যিনি নিজেও একসময় অভিভাবক হিসেবে সন্তানদের সঙ্গে হাঁটতেন তিনি বলেন, ‘এটিই রুট-মাস্টারের কৌশল।’
অ্যাস্টিল আরও বলেন যে এটি সামাজিক যোগাযোগের একটি বড় সুযোগ। অন্য অনেক অভিভাবকও একই রকম মনে করেন। ৪৪ বছর বয়সি জোস্ট ডি কানিং যখন তার পাঁচ বছর বয়সি মেয়ে নোয়ার সঙ্গে ৫ কিলোমিটার হাঁটা শুরু করছিলেন তখন বলছিলেন, স্কুলে তো অন্য অভিভাবকদের সঙ্গে কয়েক মিনিটের জন্য দেখা হয়। কিন্তু এই আয়োজন পুরো স্কুলের কমিউনিটিকে একসূত্রে গেঁথে ফেলে।
অ্যাভন্ডভিয়েরডাগসে এতটাই ইতিবাচক একটি আয়োজন যে, এর কোনো নেতিবাচক দিক খুঁজে পাওয়া কঠিন। কেউ কেউ অবশ্য প্রশ্ন তোলেন যে এটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বা ভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের মানুষের জন্য কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক।
বিশেষ করে আমস্টারডামে এই আয়োজনে যারা অংশ নেয়, তারা শহরের বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর সঠিক প্রতিনিধিত্ব করে না; বরং এটি এলাকার উচ্চবিত্ত অভিভাবকদের কাছেই বেশি জনপ্রিয়। অন্য একটি সমস্যা হলো, যদিও স্বেচ্ছাসেবীদের মাধ্যমে আয়োজন করাই এর সৌন্দর্যের অংশ, তবু এটি অনেক বড় দায়িত্ব। বুয়েটার্স, যিনি গতবার স্বেচ্ছাসেবকদের অবসর গ্রহণের পর আয়োজক কমিটির দায়িত্ব পান তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বেচ্ছাসেবকের অভাবে অনেক জায়গায় ইভেন্ট বন্ধ হয়ে গেছে। মানুষ মাঝেমধ্যে সাহায্য করতে রাজি থাকে, কিন্তু টানা চার দিন সময় দেওয়া কঠিন।
অ্যাভন্ডভিয়েরডাগসে মূলত একটি যৌথ প্রচেষ্টা। স্থানীয়রা সময় দেন, ব্যবসায়ীরা খাবার ও ফুল অনুদান দেন, রয়্যাল ডাচ ওয়াকিং অ্যাসোসিয়েশন স্থানীয় কমিটিগুলোকে সহায়তা করে ও কাক্সিক্ষত পদক সরবরাহ করে। কারণ তারা জানে শিশুদের জন্য এবং তাদের এলাকার জন্য এই ইভেন্ট কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
রয়্যাল ডাচ ওয়াকিং অ্যাসোসিয়েশনের ভ্যান গেমার্ট বলেন, এটি কয়েক দশক ধরে টিকে আছে কারণ এটি খুব সহজ, স্বাস্থ্যকর এবং ডিজিটাল পর্দামুক্ত (স্ক্রিন-ফ্রি) উপায়ে কমিউনিটিকে একত্রিত করে। এর জন্য ডাচ ভাষায় একটি নির্দিষ্ট শব্দ আছে ‘গেজেলিগহেইড’। ইংরেজি ভাষায় এর কোনো নিখুঁত অনুবাদ নেই। হয়তো ‘আরামদায়ক সাহচর্য’ বা ‘একসঙ্গে থাকার আনন্দ’। আবহাওয়া যেমনই হোক না কেন এটি বাইরে সক্রিয় থাকার ডাচ স্পিরিট এবং একটি সুসংগঠিত সম্প্রদায়ের প্রচেষ্টাকে ফুটিয়ে তোলে।
যদিও অ্যাভন্ডভিয়েরডাগসে একান্তই ডাচ একটি বিষয়, তার মানে এই নয় যে এটি কেবল তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। বুয়েটার্স বলেন, এটি কোনো সরকারি নির্দেশ নয় যে শিশুদের খেলাধুলা করতে হবে; এর ফর্মুলা যে কেউ নকল করতে পারে। অন্য এক স্বেচ্ছাসেবক আইশা লাঘা একমত পোষণ করে বলেন, আমার মনে হয়, যেখানেই কমিউনিটি আছে বা আপনি একটি কমিউনিটি গড়ে তুলতে চান, সেখানেই এটি করা সম্ভব।
/এসএকে