যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি : কার জয় কার পরাজয়

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

মতামত

বিশ্ব রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে পারস্য উপসাগরের জলরাশি বরাবরই উত্তপ্ত। সেখানে যখন ওয়াশিংটন আর তেহরানের মধ্যে কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তখন চায়ের

2026-06-17T05:59:07+00:00
2026-06-17T05:59:07+00:00
 
  বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬,
৩ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
মতামত
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি : কার জয় কার পরাজয়
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রকাশ: বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬, ৫:৫৯ এএম   (ভিজিট : ৬)
গ্রাফিক : সময়ের আলো
বিশ্ব রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে পারস্য উপসাগরের জলরাশি বরাবরই উত্তপ্ত। সেখানে যখন ওয়াশিংটন আর তেহরানের মধ্যে কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তখন চায়ের কাপে ঝড় ওঠা স্বাভাবিক। বহু বছর ধরে চলা নিষেধাজ্ঞা, কূটনীতির দড়ি টানাটানি আর পারমাণবিক কর্মসূচির জটিল ধাঁধাকে পেছনে ফেলে এই চুক্তি যেন এক মহাকাব্যিক নাটকের ক্লাইম্যাক্স। দৃশ্যপটে তাকালে মনে হয়, এই রেষারেষির খেলায় শেষ পর্যন্ত ইরানের জয় হয়েছে। ইতিহাসের চাকা ঘুরেছে আর তেহরান তার দীর্ঘদিনের লক্ষ্য অর্জনে সফলতার হাসি হাসছে।

এই চুক্তির অধীনে বহু বছর ধরে আটকে থাকা ইরানের কোটি কোটি ডলারের অর্থ পুনরুদ্ধার হবে এই বিজয়ের অন্যতম বড় ভিত্তি। ওয়াশিংটনের ব্যাংকে ফ্রিজ হয়ে থাকা নিজস্ব সম্পদ তেহরান যখন নিজের ঘরে ফেরত আনবে তখন অর্থনীতির চাকা নতুন গতি পাবে। এই বিপুল অর্থ পুনরুদ্ধার ইরানের অভ্যন্তরীণ বাজারকে চাঙ্গা করবে। মুদ্রাস্ফীতির বাজারে এই ঘটনা এক পশলা বৃষ্টির মতো কাজ করবে, যা তাদের স্বস্তি এনে দেবে।

এর পাশাপাশি সবচেয়ে বড় স্বস্তির জায়গা হলো অবরোধ প্রত্যাহার এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়া। বছরের পর বছর ধরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিকে শ্বাসরোধ করতে চেয়েছিল। কিন্তু পারস্যের মানুষ দমে যায়নি, বরং এই চুক্তির মাধ্যমে তারা সেই জাঁতাকল থেকে নিজেদের মুক্ত করার পথে। বিশ্ববাজারে ইরানের বাণিজ্যিক দ্বার এখন অনেকটা উন্মুক্ত। নিষেধাজ্ঞা শিথিলের এই সুফল সরাসরি গিয়ে পড়বে দেশটির সাধারণ উৎপাদন ও সেবা খাতে।

তেল রফতানির ক্ষেত্রে ইরানের পুরোনো গৌরব ফিরে আসায় ভূরাজনীতিতে এক বিরাট লাভ হয়েছে। পারস্য উপসাগরের বুক চিরে কালো সোনার জাহাজগুলো এখন কোনো বাধা ছাড়াই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে চলবে। তেলের বাজার পুনর্দখল করার অর্থ হলো দেশের কোষাগার শক্তিশালী হওয়া। 

ওয়াশিংটন যেখানে ইরানের তেল বিক্রি শূন্যে নামাতে চেয়েছিল, সেখানে আজ ইরানের তেলের ট্যাঙ্কারগুলো সমুদ্রের বুকে বুক ফুলিয়ে চলছে। কূটনীতির এই দাবা খেলায় তেহরান নিজের শর্ত মানাতে বাধ্য করেছে প্রতিপক্ষকে। কোনো রকম আত্মসমর্পণ ছাড়াই, নিজেদের পরমাণু কর্মসূচিকে একটি সম্মানজনক অবস্থানে রেখে চুক্তি করা কম কথা নয়। ইরান প্রমাণ করেছে যে, চাপের মুখে পড়ে তারা কোনো আপস করেনি। বরং নিজস্ব অধিকারের জায়গায় অটল থেকে পশ্চিমা বিশ্বকে নিজেদের অধিকাংশ শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করেছে, যা তাদের অবস্থানকে বৈশ্বিক রাজনীতিতে আরও দৃঢ় করেছে।

সামরিক সাফল্য ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে এই চুক্তি ইরানের জন্য এক ঢাল হিসেবে কাজ করছে। কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব তখন রক্ষা পায় যখন সে বহির্শত্রুর হুমকিকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে পারে। ইরান এই চুক্তির মাধ্যমে তার সামরিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও আঞ্চলিক শক্তিকে অক্ষুণ্ন রেখেছে। পশ্চিমা বিশ্বের সামরিক আগ্রাসনের যে হুমকি প্রতিদিন বাতাসে ভাসত, তা এখন অনেকটাই স্তিমিত।

হোরাস ও হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ইরানের কৌশলগত অবস্থান আরও মজবুত হয়েছে। এই প্রণালি বিশ্ববাণিজ্যের এক লাইফলাইন, যার চাবিকাঠি তেহরানের হাতে। চুক্তির পর এই অঞ্চলে ইরানের প্রতিরোধ শক্তিশালী হবে, যা তাদের ভূরাজনৈতিক দরকষাকষির ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। এই জলপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকার কারণে বিশ্বশক্তিগুলো ইরানকে সমীহ করতে বাধ্য হবে।

আঞ্চলিক প্রভাবে ইরান এখন মধ্যপ্রাচ্যের এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি। সিরিয়া, ইয়েমেন কিংবা লেবাননÑ সবখানেই তেহরানের রাজনৈতিক ও কৌশলগত অক্ষটি আরও সুসংহত হয়েছে। এই চুক্তির ফলে আন্তর্জাতিক মহল মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে যে, ইরানকে বাদ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে কোনো স্থায়ী শান্তি বা সমীকরণ সম্ভব নয়। এটি ইরানের আঞ্চলিক শ্রেষ্ঠত্বের এক অলিখিত সনদ।

এই চুক্তি কেবল দুই দেশের বিষয় নয়, বরং পুরো বিশ্বের এক বড় বিজয়। কারণ, এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে একটি সম্ভাব্য যুদ্ধের অবসান ঘটেছে। ওয়াশিংটন আর তেহরানের মধ্যে যুদ্ধ লাগলে পুরো পৃথিবীর অর্থনীতি ধসে পড়ত। যুদ্ধের সেই কালো মেঘ কেটে গিয়ে শান্তির সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। এই শান্তি কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের জন্য নয়, বরং বিশ্ববাসীর জন্য স্বস্তির।

ঐতিহাসিক ও গবেষণাধর্মী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এই চুক্তি মার্কিন একপেশে নীতির এক বড় পরাজয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুগের পর যুগ ধরে একক আধিপত্য বজায় রাখতে চেয়েছে। কিন্তু ইরান তা রুখে দিয়েছে। তেহরান বিশ্বকে দেখিয়েছে যে, পরাশক্তিদের নিষেধাজ্ঞা সবসময় কাজ করে না। স্বনির্ভরতা এবং জাতীয় ঐক্য থাকলে যেকোনো নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলা করা সম্ভব।

পারমাণবিক কর্মসূচির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের অধিকার আদায় করা ইরানের জন্য একটি বিরাট লক্ষ্য অর্জন। ইরান কখনোই পরমাণু অস্ত্র বানানোর কথা বলেনি, বরং চিকিৎসার ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের অধিকারের দাবি জানিয়েছিল। এই চুক্তির মাধ্যমে ইরান তার সেই বৈজ্ঞানিক গবেষণার অধিকার বজায় রাখতে পেরেছে। এটি ইরানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রযাত্রার এক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

মনীষীরা বলেন, ‘কূটনীতি হলো যুদ্ধের অন্য রূপ, যেখানে অস্ত্রের বদলে শব্দ ব্যবহৃত হয়।’ ইরান সেই শব্দের যুদ্ধে জিতেছে। তারা বিশ্ববাসীকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে, তারা শান্তিপ্রিয় কিন্তু আত্মমর্যাদাবোধে বলীয়ান। 
ভূরাজনীতিতে এই লাভের অঙ্ক কষলে দেখা যায়, চীন ও রাশিয়ার মতো পরাশক্তিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা যখন শিথিল হবে, তখন পূর্বের দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের বাণিজ্য আরও নতুন মাত্রা পাবে। এই চুক্তির ফলে বিশ্ব রাজনীতিতে মার্কিন একক আধিপত্যের পতন এবং বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার উত্থান ত্বরান্বিত হয়েছে।

সমালোচকরা হয়তো বলতে পারেন, এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। কিন্তু রাজনীতির মাঠে চিরস্থায়ী বলে কিছু নেই। ইরান বর্তমান সময়ের সেরা সমীকরণটি নিজের পক্ষে টানতে পেরেছে। তারা অর্থনৈতিক মুক্তি এবং সামরিক নিরাপত্তার এক অপূর্ব ভারসাম্য তৈরি করেছে এই চুক্তির মাধ্যমে, যা যেকোনো উন্নয়নশীল দেশের জন্য একটি বড় শিক্ষণীয় উদাহরণ।

মার্কিন প্রশাসন তাদের পূর্বের কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইরানকে কাবু করার মার্কিন নীতি পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ওয়াশিংটন বুঝতে পেরেছে যে, শক্তির দাপট দেখিয়ে পারস্যের ঐতিহ্যকে দমন করা সম্ভব নয়। তাই তারা আলোচনার টেবিলে বসতে এবং ইরানের অধিকাংশ শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে।

কূটনৈতিক স্বীকৃতির এই নতুন অধ্যায়ে বিশ্ববাসী ইরানের এই বিজয়কে কেবল একটি দেশের বিজয় হিসেবে দেখছে না। এটি আসলে বহুপক্ষীয় বিশ্বব্যবস্থার এক বিরাট জয়, যেখানে মার্কিন একাধিপত্যের অবসান ঘটছে। সারা বিশ্বের শোষিত, বঞ্চিত ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মানুষ ইরানের এই সফল প্রতিরোধকে নিজেদের বিজয় বলে মনে করছেন। 

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এই চুক্তি বিশ্ব ইতিহাসের পাতায় এক নতুন অধ্যায়। এটি কেবল এক টুকরো কাগজে স্বাক্ষর নয়, বরং এক পরাশক্তির দম্ভের বিরুদ্ধে একটি প্রাচীন সভ্যতার আত্মমর্যাদার জয়। পারস্যের কবি হাফিজের ভাষায় বলা যায়, ধৈর্যের তিক্ত ফল শেষ পর্যন্ত মধুর রূপ ধারণ করেছে। ইরানের এই জয় বিশ্বশান্তির পথকে সুগম করুক এবং পৃথিবীর বুকে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করুক- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি : কার জয় কার পরাজয়


বিশ্ব রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে পারস্য উপসাগরের জলরাশি বরাবরই উত্তপ্ত। সেখানে যখন ওয়াশিংটন আর তেহরানের মধ্যে কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তখন চায়ের কাপে ঝড় ওঠা স্বাভাবিক। বহু বছর ধরে চলা নিষেধাজ্ঞা, কূটনীতির দড়ি টানাটানি আর পারমাণবিক কর্মসূচির জটিল ধাঁধাকে পেছনে ফেলে এই চুক্তি যেন এক মহাকাব্যিক নাটকের ক্লাইম্যাক্স। দৃশ্যপটে তাকালে মনে হয়, এই রেষারেষির খেলায় শেষ পর্যন্ত ইরানের জয় হয়েছে। ইতিহাসের চাকা ঘুরেছে আর তেহরান তার দীর্ঘদিনের লক্ষ্য অর্জনে সফলতার হাসি হাসছে।

এই চুক্তির অধীনে বহু বছর ধরে আটকে থাকা ইরানের কোটি কোটি ডলারের অর্থ পুনরুদ্ধার হবে এই বিজয়ের অন্যতম বড় ভিত্তি। ওয়াশিংটনের ব্যাংকে ফ্রিজ হয়ে থাকা নিজস্ব সম্পদ তেহরান যখন নিজের ঘরে ফেরত আনবে তখন অর্থনীতির চাকা নতুন গতি পাবে। এই বিপুল অর্থ পুনরুদ্ধার ইরানের অভ্যন্তরীণ বাজারকে চাঙ্গা করবে। মুদ্রাস্ফীতির বাজারে এই ঘটনা এক পশলা বৃষ্টির মতো কাজ করবে, যা তাদের স্বস্তি এনে দেবে।

এর পাশাপাশি সবচেয়ে বড় স্বস্তির জায়গা হলো অবরোধ প্রত্যাহার এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়া। বছরের পর বছর ধরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিকে শ্বাসরোধ করতে চেয়েছিল। কিন্তু পারস্যের মানুষ দমে যায়নি, বরং এই চুক্তির মাধ্যমে তারা সেই জাঁতাকল থেকে নিজেদের মুক্ত করার পথে। বিশ্ববাজারে ইরানের বাণিজ্যিক দ্বার এখন অনেকটা উন্মুক্ত। নিষেধাজ্ঞা শিথিলের এই সুফল সরাসরি গিয়ে পড়বে দেশটির সাধারণ উৎপাদন ও সেবা খাতে।

তেল রফতানির ক্ষেত্রে ইরানের পুরোনো গৌরব ফিরে আসায় ভূরাজনীতিতে এক বিরাট লাভ হয়েছে। পারস্য উপসাগরের বুক চিরে কালো সোনার জাহাজগুলো এখন কোনো বাধা ছাড়াই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে চলবে। তেলের বাজার পুনর্দখল করার অর্থ হলো দেশের কোষাগার শক্তিশালী হওয়া। 

ওয়াশিংটন যেখানে ইরানের তেল বিক্রি শূন্যে নামাতে চেয়েছিল, সেখানে আজ ইরানের তেলের ট্যাঙ্কারগুলো সমুদ্রের বুকে বুক ফুলিয়ে চলছে। কূটনীতির এই দাবা খেলায় তেহরান নিজের শর্ত মানাতে বাধ্য করেছে প্রতিপক্ষকে। কোনো রকম আত্মসমর্পণ ছাড়াই, নিজেদের পরমাণু কর্মসূচিকে একটি সম্মানজনক অবস্থানে রেখে চুক্তি করা কম কথা নয়। ইরান প্রমাণ করেছে যে, চাপের মুখে পড়ে তারা কোনো আপস করেনি। বরং নিজস্ব অধিকারের জায়গায় অটল থেকে পশ্চিমা বিশ্বকে নিজেদের অধিকাংশ শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করেছে, যা তাদের অবস্থানকে বৈশ্বিক রাজনীতিতে আরও দৃঢ় করেছে।

সামরিক সাফল্য ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে এই চুক্তি ইরানের জন্য এক ঢাল হিসেবে কাজ করছে। কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব তখন রক্ষা পায় যখন সে বহির্শত্রুর হুমকিকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে পারে। ইরান এই চুক্তির মাধ্যমে তার সামরিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও আঞ্চলিক শক্তিকে অক্ষুণ্ন রেখেছে। পশ্চিমা বিশ্বের সামরিক আগ্রাসনের যে হুমকি প্রতিদিন বাতাসে ভাসত, তা এখন অনেকটাই স্তিমিত।

হোরাস ও হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ইরানের কৌশলগত অবস্থান আরও মজবুত হয়েছে। এই প্রণালি বিশ্ববাণিজ্যের এক লাইফলাইন, যার চাবিকাঠি তেহরানের হাতে। চুক্তির পর এই অঞ্চলে ইরানের প্রতিরোধ শক্তিশালী হবে, যা তাদের ভূরাজনৈতিক দরকষাকষির ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। এই জলপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকার কারণে বিশ্বশক্তিগুলো ইরানকে সমীহ করতে বাধ্য হবে।

আঞ্চলিক প্রভাবে ইরান এখন মধ্যপ্রাচ্যের এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি। সিরিয়া, ইয়েমেন কিংবা লেবাননÑ সবখানেই তেহরানের রাজনৈতিক ও কৌশলগত অক্ষটি আরও সুসংহত হয়েছে। এই চুক্তির ফলে আন্তর্জাতিক মহল মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে যে, ইরানকে বাদ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে কোনো স্থায়ী শান্তি বা সমীকরণ সম্ভব নয়। এটি ইরানের আঞ্চলিক শ্রেষ্ঠত্বের এক অলিখিত সনদ।

এই চুক্তি কেবল দুই দেশের বিষয় নয়, বরং পুরো বিশ্বের এক বড় বিজয়। কারণ, এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে একটি সম্ভাব্য যুদ্ধের অবসান ঘটেছে। ওয়াশিংটন আর তেহরানের মধ্যে যুদ্ধ লাগলে পুরো পৃথিবীর অর্থনীতি ধসে পড়ত। যুদ্ধের সেই কালো মেঘ কেটে গিয়ে শান্তির সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। এই শান্তি কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের জন্য নয়, বরং বিশ্ববাসীর জন্য স্বস্তির।

ঐতিহাসিক ও গবেষণাধর্মী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এই চুক্তি মার্কিন একপেশে নীতির এক বড় পরাজয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুগের পর যুগ ধরে একক আধিপত্য বজায় রাখতে চেয়েছে। কিন্তু ইরান তা রুখে দিয়েছে। তেহরান বিশ্বকে দেখিয়েছে যে, পরাশক্তিদের নিষেধাজ্ঞা সবসময় কাজ করে না। স্বনির্ভরতা এবং জাতীয় ঐক্য থাকলে যেকোনো নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলা করা সম্ভব।

পারমাণবিক কর্মসূচির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের অধিকার আদায় করা ইরানের জন্য একটি বিরাট লক্ষ্য অর্জন। ইরান কখনোই পরমাণু অস্ত্র বানানোর কথা বলেনি, বরং চিকিৎসার ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের অধিকারের দাবি জানিয়েছিল। এই চুক্তির মাধ্যমে ইরান তার সেই বৈজ্ঞানিক গবেষণার অধিকার বজায় রাখতে পেরেছে। এটি ইরানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রযাত্রার এক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

মনীষীরা বলেন, ‘কূটনীতি হলো যুদ্ধের অন্য রূপ, যেখানে অস্ত্রের বদলে শব্দ ব্যবহৃত হয়।’ ইরান সেই শব্দের যুদ্ধে জিতেছে। তারা বিশ্ববাসীকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে, তারা শান্তিপ্রিয় কিন্তু আত্মমর্যাদাবোধে বলীয়ান। 
ভূরাজনীতিতে এই লাভের অঙ্ক কষলে দেখা যায়, চীন ও রাশিয়ার মতো পরাশক্তিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা যখন শিথিল হবে, তখন পূর্বের দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের বাণিজ্য আরও নতুন মাত্রা পাবে। এই চুক্তির ফলে বিশ্ব রাজনীতিতে মার্কিন একক আধিপত্যের পতন এবং বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার উত্থান ত্বরান্বিত হয়েছে।

সমালোচকরা হয়তো বলতে পারেন, এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। কিন্তু রাজনীতির মাঠে চিরস্থায়ী বলে কিছু নেই। ইরান বর্তমান সময়ের সেরা সমীকরণটি নিজের পক্ষে টানতে পেরেছে। তারা অর্থনৈতিক মুক্তি এবং সামরিক নিরাপত্তার এক অপূর্ব ভারসাম্য তৈরি করেছে এই চুক্তির মাধ্যমে, যা যেকোনো উন্নয়নশীল দেশের জন্য একটি বড় শিক্ষণীয় উদাহরণ।

মার্কিন প্রশাসন তাদের পূর্বের কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইরানকে কাবু করার মার্কিন নীতি পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ওয়াশিংটন বুঝতে পেরেছে যে, শক্তির দাপট দেখিয়ে পারস্যের ঐতিহ্যকে দমন করা সম্ভব নয়। তাই তারা আলোচনার টেবিলে বসতে এবং ইরানের অধিকাংশ শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে।

কূটনৈতিক স্বীকৃতির এই নতুন অধ্যায়ে বিশ্ববাসী ইরানের এই বিজয়কে কেবল একটি দেশের বিজয় হিসেবে দেখছে না। এটি আসলে বহুপক্ষীয় বিশ্বব্যবস্থার এক বিরাট জয়, যেখানে মার্কিন একাধিপত্যের অবসান ঘটছে। সারা বিশ্বের শোষিত, বঞ্চিত ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মানুষ ইরানের এই সফল প্রতিরোধকে নিজেদের বিজয় বলে মনে করছেন। 

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এই চুক্তি বিশ্ব ইতিহাসের পাতায় এক নতুন অধ্যায়। এটি কেবল এক টুকরো কাগজে স্বাক্ষর নয়, বরং এক পরাশক্তির দম্ভের বিরুদ্ধে একটি প্রাচীন সভ্যতার আত্মমর্যাদার জয়। পারস্যের কবি হাফিজের ভাষায় বলা যায়, ধৈর্যের তিক্ত ফল শেষ পর্যন্ত মধুর রূপ ধারণ করেছে। ইরানের এই জয় বিশ্বশান্তির পথকে সুগম করুক এবং পৃথিবীর বুকে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করুক- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক : প্রাবন্ধিক
মতামত লেখকের নিজস্ব

/এসএকে
 


  বিষয়:   যুক্তরাষ্ট্র  ইরান  চুক্তি  জয়  পরাজয় 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: