বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাসে শ্রমের ধরন কখনো স্থির ছিল না। প্রযুক্তি, উৎপাদনব্যবস্থা এবং যোগাযোগব্যবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শ্রমবাজারও বারবার রূপান্তরিত হয়েছে। শিল্প বিপ্লব যেমন কৃষিনির্ভর সমাজকে কারখানাভিত্তিক স্থায়ী চাকরির কাঠামোয় নিয়ে এসেছিল, তেমনি ডিজিটাল বিপ্লব আজ শ্রমকে নিয়ে যাচ্ছে এক নতুন বাস্তবতায়, যাকে বলা হয় গিগ ইকোনমি। একসময় কর্মসংস্থান বলতে যেখানে স্থায়ী চাকরি, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা এবং মাস শেষে নিশ্চিত বেতনকে বোঝানো হতো, সেখানে আজ ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে কাজভিত্তিক, চুক্তিভিত্তিক ও প্ল্যাটফর্মনির্ভর কর্মসংস্থান। এই নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো যেমন সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে, তেমনি সৃষ্টি করেছে বহু প্রশ্ন ও উদ্বেগেরও।
গিগ ইকোনমি মূলত এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে কর্মী কোনো প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী কর্মচারী না হয়ে নির্দিষ্ট কাজ বা সেবার বিনিময়ে পারিশ্রমিক লাভ করেন। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের গ্রাহকের জন্য কাজ করতে পারেন।
ফলে শ্রমবাজারের ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা অনেকাংশেই দূর হয়েছে। ফ্রিল্যান্সিং, রাইড শেয়ারিং, খাদ্য সরবরাহ, অনলাইন টিউটরিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, গ্রাফিক ডিজাইন, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট কিংবা কনটেন্ট ক্রিয়েশন সব ক্ষেত্রেই গিগ ইকোনমির বিস্তার ঘটছে।
আরও পড়ুন
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গিগ ইকোনমির গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও সবার জন্য পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব হচ্ছে না। এমন বাস্তবতায় গিগ ইকোনমি অনেকের জন্য বিকল্প আয়ের পথ খুলে দিয়েছে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের তরুণদের অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের অবস্থানকে শক্তিশালী করছে। অনেকে ঘরে বসেই বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছেন, যা জাতীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক অবদান রাখছে।
গিগ ইকোনমির অন্যতম বড় সুবিধা হলো এর নমনীয়তা। এখানে কর্মী নিজের সুবিধামতো সময় নির্ধারণ করতে পারেন এবং একাধিক উৎস থেকে আয় করার সুযোগ পান। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি আয় করতে পারছেন, নারীরা ঘরে বসে পেশাগত কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, এমনকি অনেক অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিও তাদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নতুন আয়ের ক্ষেত্র তৈরি করছেন। ফলে এটি শ্রমবাজারকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলছে।
তবে এই উজ্জ্বল সম্ভাবনার আড়ালে কিছু কঠিন বাস্তবতাও রয়েছে। গিগ ইকোনমির সবচেয়ে বড় সংকট হলো চাকরির নিরাপত্তার অভাব। স্থায়ী চাকরির ক্ষেত্রে কর্মীরা যে ধরনের সুরক্ষা ও নিশ্চয়তা পান, গিগ কর্মীরা সাধারণত তা থেকে বঞ্চিত থাকেন। কাজ থাকলে আয় আছে, কাজ না থাকলে আয় নেই এই অনিশ্চয়তা তাদের জীবনকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। অসুস্থতা, দুর্ঘটনা কিংবা অর্থনৈতিক মন্দার সময়ে তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েন।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো সামাজিক নিরাপত্তার সীমাবদ্ধতা। অধিকাংশ গিগ কর্মীর জন্য স্বাস্থ্যবীমা, পেনশন, ভবিষ্যৎ সঞ্চয়, মাতৃত্বকালীন সুবিধা কিংবা কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদে তাদের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
একদিকে তারা অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছেন, অন্যদিকে তাদের অধিকারের বিষয়টি এখনও অনেকাংশে উপেক্ষিত।
গিগ ইকোনমির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অ্যালগরিদমভিত্তিক শ্রম নিয়ন্ত্রণ। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো সাধারণত প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার মাধ্যমে কর্মীদের কাজ, মূল্যায়ন এবং পারিশ্রমিক নিয়ন্ত্রণ করে। একটি নেতিবাচক রেটিং কিংবা গ্রাহকের অভিযোগ অনেক সময় কর্মীর আয়ের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে অনেক কর্মী অদৃশ্য প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণের অধীনে কাজ করতে বাধ্য হন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশও গিগ ইকোনমির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। বর্তমানে অনেক কাজ স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে কিছু পেশার চাহিদা কমে যেতে পারে, আবার নতুন ধরনের দক্ষতার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে না পারলে অনেক গিগকর্মী কর্মসংস্থানের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবেন।
এ ছাড়া গিগ ইকোনমির দ্রুত বিস্তার সমাজে এক ধরনের নতুন বৈষম্যও সৃষ্টি করতে পারে। যাদের ডিজিটাল দক্ষতা, ভাষাজ্ঞান এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা রয়েছে, তারা সহজেই এই অর্থনীতির সুবিধা গ্রহণ করতে পারছেন। অন্যদিকে দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধার অভাবে অনেকেই এই প্রবাহের বাইরে থেকে যাচ্ছেন। ফলে ডিজিটাল বিভাজন আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই বাস্তবতায় প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী ও সময়োপযোগী নীতিমালা। গিগকর্মীদের শ্রমিক হিসেবে আইনি স্বীকৃতি প্রদান, ন্যূনতম সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ, স্বাস্থ্যবীমা ও কল্যাণ তহবিল গঠন, দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল শ্রমবাজারকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা এখন সময়ের দাবি।
একই সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে তরুণরা ভবিষ্যতের প্রযুক্তিনির্ভর শ্রমবাজারের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারে।
গিগ ইকোনমি নিঃসন্দেহে একবিংশ শতাব্দীর অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। এটি কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করছে, অর্থনীতিকে গতিশীল করছে এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের পথ উন্মুক্ত করছে।
কিন্তু এই সম্ভাবনাকে টেকসই ও মানবিক রূপ দিতে হলে শ্রমিকের অধিকার, সামাজিক সুরক্ষা এবং ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করার বিষয়টিকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় গিগ ইকোনমি কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্তের পাশাপাশি অনিশ্চয়তা ও বৈষম্যের নতুন অধ্যায় হিসেবেও ইতিহাসে স্থান পেতে পারে।
লেখক
এএডি/