ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী ও উত্তরার এস্থেটিক ক্লিনিকগুলোর অপেক্ষা কক্ষগুলো সন্ধ্যা নামলেই পূর্ণ হতে শুরু করে। এখন আর শুধু চলচ্চিত্র ও নাটকের তারকা বা উচ্চবিত্তরাই আসেন না; বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, করপোরেট পেশাজীবী, উদ্যোক্তা এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষরা এই সেবার একটি বড় অংশে পরিণত হয়েছেন। কেউ আসেন বিয়ের আগে, কেউ চাকরির সাক্ষাৎকারের প্রস্তুতি হিসেবে, আবার কেউ কেবল চেহারায় সামান্য পরিবর্তনের আশায়। এই দৃশ্যটি আজকের নগর বাংলাদেশের একটি নতুন বাস্তবতাকে তুলে ধরে- যেখানে সৌন্দর্য ক্রমশ ব্যক্তিগত পছন্দের গণ্ডি পেরিয়ে অর্থনীতি, সামাজিক প্রত্যাশা এবং চিকিৎসা প্রযুক্তির সংযোগস্থলে এসে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশে সৌন্দর্যচর্চা এখন আর শুধু প্রসাধনী বা ফ্যাশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি দ্রুত একটি চিকিৎসাভিত্তিক শিল্পে পরিণত হচ্ছে। সম্প্রতি ঢাকাজুড়ে এস্থেটিক ক্লিনিক, স্কিন কেয়ার সেন্টার এবং কসমেটিক মেডিকেল প্রতিষ্ঠানের যে দ্রুত বিস্তার ঘটেছে, তা একটি পরিবর্তনশীল সামাজিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। বোটক্স, ডার্মাল ফিলার, লেজার স্কিন রিজুভেনেশন এবং থ্রেড লিফট- যেগুলো একসময় কেবল উচ্চবিত্তের বিলাসী জীবনযাত্রার প্রতীক ছিল, তা ধীরে ধীরে মধ্যবিত্তের সাধারণ ভোগ্যসেবায় রূপ নিচ্ছে।
এই পরিবর্তনকে শুধু ভোক্তার রুচির পরিবর্তন হিসেবে দেখা ভুল হবে। এটি এমন এক সামাজিক প্রেক্ষাপটকে প্রতিফলিত করে, যেখানে চাকরির সাক্ষাৎকার থেকে শুরু করে করপোরেট কর্মক্ষেত্র, মূলধারার গণমাধ্যম থেকে সামাজিক মাধ্যমÑ সবখানেই বাহ্যিক উপস্থাপন ক্রমশ অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রতিযোগিতার অংশে পরিণত হয়েছে। ফলে অনেক তরুণ বাংলাদেশির কাছে সৌন্দর্য এখন নান্দনিকতার পাশাপাশি আত্মবিশ্বাস, পেশাগত সম্ভাবনা এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের অন্যতম হাতিয়ার।
এটি একটি বৈশ্বিক প্রবণতারই অংশ। ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অব এস্থেটিক প্লাস্টিক সার্জারির (আইএসএপিএস) তথ্য অনুযায়ী বিশ্বজুড়ে প্লাস্টিক সার্জনদের মাধ্যমে প্রতি বছর প্রায় ৩৮ মিলিয়ন সার্জিক্যাল ও নন-সার্জিক্যাল নান্দনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে, যার মধ্যে ১৭.৪ মিলিয়নের বেশি সার্জিক্যাল এবং ২০.৫ মিলিয়নের বেশি নন-সার্জিক্যাল চিকিৎসা। চার বছরে এই সেবার মোট পরিমাণ প্রায় ৪২.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বজুড়ে মোট প্রক্রিয়ার প্রায় ৮৫.৬ শতাংশই সম্পন্ন হয়েছে নারীদের ওপর, আর বোটুলিনাম টক্সিন ও হায়ালুরোনিক অ্যাসিড ফিলার সবচেয়ে প্রচলিত নন-সার্জিক্যাল চিকিৎসা হিসেবে প্রাধান্য ধরে রেখেছে।
বাংলাদেশও এই বিশ্বায়নের বাইরে নয়। গবেষণামূলক তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী সৌন্দর্যবর্ধক চিকিৎসা বাজারের মূল্য ৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে বহুগুণ বৃদ্ধির পথে। পাশাপাশি কে-ড্রামার প্রভাব থেকে শুরু করে দক্ষিণ কোরীয় সৌন্দর্য সংস্কৃতি তরুণদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। ঢাকার ক্লিনিকগুলো এখন লোকমুখে প্রচারের চেয়ে ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকের মাধ্যমে তরুণ মধ্যবিত্ত শ্রেণির গ্রাহকদের বেশি আকৃষ্ট করছে। আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যমতে, আগামী এক দশকের মধ্যে দেশের স্কিন কেয়ার ও কসমেটিক চিকিৎসা পণ্য বাজার বিলিয়ন ডলারের খাতে পরিণত হওয়ার পূর্ণ পূর্বাভাস রয়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং, অনলাইন পরামর্শ এবং ডিজিটাল ইনফ্লুয়েন্সার সংস্কৃতি এই পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করেছে। যে সমাজে প্রথম দর্শনের একটি অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি হয়েছে, সেখানে অনেকেই এখন বাহ্যিক সৌন্দর্যকে আত্মতুষ্টির বদলে ব্যক্তিগত যোগ্যতার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করছেন
এই রূপান্তরের একটি গভীর সমাজতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়ের বুর্দিয়ো তার ‘ডিস্টিংশন’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, কেবল অর্থনৈতিক পুঁজিই নয়, বরং সাংস্কৃতিক ও প্রতীকী পুঁজিও সমাজে মানুষের অবস্থান নির্ধারণ করে। সমসাময়িক শহুরে সংস্কৃতিতে শরীর ও বাহ্যিক উপস্থাপন সেই সাংস্কৃতিক পুঁজির অংশ হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে মিশেল ফুকো তার ‘দ্য হিস্ট্রি অব সেক্সুয়ালিটি’ এবং ‘ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পানিশ’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, ক্ষমতা কেবল রাষ্ট্রের মাধ্যমে নয়, বরং মানুষের শরীর, অভ্যাস এবং আত্ম-শৃঙ্খলার মধ্য দিয়েও চর্চিত হয়। ডিজিটাল সংস্কৃতির যুগে এই বিশ্লেষণ আরও প্রাসঙ্গিক, কারণ সামাজিক মাধ্যম ব্যক্তির শরীর ও চেহারাকে এক অবিরাম মূল্যায়নের সম্মুখীন করে তোলে।
কিন্তু এই ধারার সঙ্গে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসেÑ সৌন্দর্য যদি একটি বাজারে পরিণত হয়, তবে সেই বাজারের রোগীর নিরাপত্তা কে নিশ্চিত করবে? বোটক্স, ফিলার বা লেজার ট্রিটমেন্ট সাধারণ প্রসাধনী পরিষেবা নয়; এগুলো চিকিৎসা পদ্ধতি, যার জন্য প্রয়োজন বিশেষজ্ঞ জ্ঞান, অনুমোদিত উপকরণ এবং কঠোর পেশাগত মানদণ্ড। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘গ্লোবাল পেশেন্ট সেফটি রিপোর্ট’-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রতি ১০ জন রোগীর মধ্যে একজন চিকিৎসা চলাকালীন ক্ষতির শিকার হন। সেই ক্ষতির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সৃষ্টি করে স্থায়ী অক্ষমতা বা মৃত্যু, আর অনিরাপদ চিকিৎসার কারণে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রাণ হারান। কোনো চিকিৎসা পদ্ধতি জীবন রক্ষাকারী হোক বা কেবল সৌন্দর্যবর্ধক, প্রতিরোধযোগ্য ক্ষতি কমানোর নীতি সর্বত্র সমানভাবে প্রযোজ্য।
বাংলাদেশে সৌন্দর্যবর্ধক চিকিৎসার জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়লেও নিয়ন্ত্রক কাঠামো সমান গতিতে বিকশিত হয়নি। বিশেষায়িত চিকিৎসকদের মতে, বোটক্স, ফিলার এবং গ্লুটাথায়নের মতো ইনজেক্টেবল কসমেটিক পদ্ধতিগুলো আইনগতভাবে নিবন্ধিত চিকিৎসকদের দ্বারা সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও এস্থেটিক পদ্ধতির জন্য সুনির্দিষ্ট পৃথক সরকারি নিবন্ধন ব্যবস্থা নেই। এর ফলে কোন চিকিৎসা কে প্রয়োগ করতে পারবে, কী ধরনের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন, কোন পণ্য অনুমোদিত, ইনফর্মড কনসেন্ট বা অবহিত সম্মতি কীভাবে নথিভুক্ত হবে এবং জটিলতা দেখা দিলে কীভাবে তদারকি করা হবে- সেসব বিষয়ে এক ধরনের দায়িত্বহীনতার শূন্যতা থেকে যায়।
এই শূন্যতা কেবল প্রশাসনিক জটিলতা নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক উদ্বেগের বিষয়। ভুল রোগী নির্বাচন, অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, নিম্নমানের পণ্য বা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ত্রুটি গুরুতর ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। আন্তর্জাতিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে চোখের আশপাশের রক্তনালিতে অসাবধানতাবশত ফিলার প্রয়োগের ফলে টিস্যুর পচন, সংক্রমণ, দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতচিহ্ন এবং বিরল ক্ষেত্রে স্থায়ী দৃষ্টিশক্তি হারানোর মতো জটিলতা নথিভুক্ত রয়েছে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে শিক্ষণীয় হতে পারে। যুক্তরাজ্যে নন-সার্জিক্যাল কসমেটিক পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে তিন-স্তরীয় লাইসেন্সিং মডেল নির্ধারণ করা হয়েছে এবং কসমেটিক ইনজেকশনের দূরবর্তী বা অনলাইন প্রেসক্রিপশন নিষিদ্ধ করে মুখোমুখি পরামর্শ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম সৌন্দর্য চিকিৎসাকেন্দ্র দক্ষিণ কোরিয়া চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সিং ও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের মান নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে সিঙ্গাপুর সুনির্দিষ্টভাবে এভিডেন্সভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করেছে, যেখানে চিকিৎসকদের জন্য বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত এবং পরীক্ষামূলক চিকিৎসার সুস্পষ্ট তালিকা নির্দেশ করে দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ এখনও এমন একটি সমন্বিত এবং সুনির্দিষ্ট নীতিমালা গড়ে তুলতে পারেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপনগুলোতে প্রায়শই সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা গোপন রেখে তাৎক্ষণিক পরিবর্তন, স্থায়ী সৌন্দর্য বা ব্যথাহীন সমাধানের মতো বিপণন ভাষা ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি ইনফ্লুয়েন্সারদের প্রচার অনেক সময় নিরপেক্ষ চিকিৎসাগত তথ্যের বিকল্প হিসেবে কাজ করে। অথচ সৌন্দর্য চিকিৎসায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ হওয়া উচিত বস্তুনিষ্ঠ তথ্য, চিকিৎসাগত প্রমাণ এবং প্রকৃত অবহিত সম্মতির ওপর ভিত্তি করে।
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি), স্বাস্থ্য অধিদফতর এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সামনে এখন এক জরুরি নীতিগত দায়িত্ব এসে দাঁড়িয়েছে। এস্থেটিক চিকিৎসাকে স্বাস্থ্যসেবার এক স্বতন্ত্র ক্ষেত্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন- কে কোন পদ্ধতি সম্পাদন করতে পারবে তার সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড, চিকিৎসকদের জন্য ন্যূনতম প্রশিক্ষণের বাধ্যবাধকতা, ব্যবহৃত পণ্য ও যন্ত্রপাতির মান যাচাই এবং জটিলতা দেখা দিলে প্রতিকূল ঘটনা রিপোর্টিংয়ের জন্য একটি কার্যকর জাতীয় ব্যবস্থা।
একটি নিরাপদ সৌন্দর্য শিল্প গড়ে তুলতে সরকারি বিভাগ ও পেশাদার সমিতিগুলোর যৌথ উদ্যোগে একটি জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। এরপর ক্লিনিকগুলোর জন্য একটি বাধ্যতামূলক অ্যাক্রেডিটেশন বা স্বীকৃতি ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন, যা নিয়মিত পরিদর্শনের মাধ্যমে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, জরুরি অবস্থার প্রস্তুতি এবং সরঞ্জামের গুণগত মান নিশ্চিত করবে। পাশাপাশি একটি জাতীয় অ্যাডভার্স ইভেন্ট বা প্রতিকূল ঘটনা সংক্রান্ত ডেটাবেস তৈরি করতে হবে, যাতে জটিলতা থেকে শিক্ষা নেওয়া যায়। বিজ্ঞাপন ও ডিজিটাল বিপণনের ক্ষেত্রেও কঠোর নৈতিক নির্দেশিকা থাকা প্রয়োজন, যাতে ‘১০ মিনিটে রূপান্তর’ বা ‘ঝুঁকিমুক্ত’-এর মতো বিভ্রান্তিকর দাবি বন্ধ করা যায় এবং ইনফ্লুয়েন্সারদের বাণিজ্যিক চুক্তি প্রকাশের বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করা হয়। সর্বোপরি একজন চিকিৎসকের যোগ্যতা, ব্যবহৃত পণ্যের অনুমোদন এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে জানার অধিকার নিশ্চিত করতে জনসচেতনতায় ধারাবাহিক বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সৌন্দর্যবর্ধক চিকিৎসার প্রসার আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সৌন্দর্য সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও প্রযুক্তির আলোকেই নির্ধারিত হয়। তবে একটি সমাজ কেবল কত মানুষকে সুন্দর হওয়ার সুযোগ দেয় তা দিয়ে বিবেচিত হয় না, বরং সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে গিয়ে সে মানুষের স্বাস্থ্য, মর্যাদা ও অধিকার কতটা রক্ষা করতে পারল, তার ওপরই তার পরিপক্বতা নির্ভর করে। বাংলাদেশের সামনে এখনও সুযোগ রয়েছে এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো তৈরি করার, যা একদিকে এই বিকাশমান শিল্পটিকে বাধাগ্রস্ত করবে না, আবার অন্যদিকে বহু মিলিয়ন ডলারের এই বাজারে রোগীর নিরাপত্তাকেও গৌণ হতে দেবে না।
গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/আআ