নাঈমা তাসনিমের স্মৃতিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থান। গ্রাফিক : সময়ের আলো
৫ আগস্ট, ২০২৪। ৯টার দিকে আনিকা জাহিন বুশরা উত্তরা থেকে বসুন্ধরা এগিয়ে আসছে। আমরা তখন উদ্ধারকাজ করি যে যার এলাকায়, এলাকার বাইরে। আহতদের হাসপাতাল নিয়ে যাই, রক্ত ম্যানেজ করি। পকেটে গজ, তুলা, হেক্সিসল, ব্যান্ডেজ নিয়ে ঘুরি। রোকেয়া সরণির বসুন্ধরা গেট দিয়ে শতাধিক পুলিশ দৌড়ে আসছে। আমি যমুনার পকেট গেটের ঠিক উল্টোদিকে একটি সেলুনের ওয়াশরুমের মধ্যে লুকিয়ে পড়লাম। মুহুর্মুহু ব্রাশফায়ার করছে পুলিশ ও আর্মি।
শহরের দেয়ালে জুলাই গ্রাফিতি। ছবি : সময়ের আলো
ওয়াশরুমে আমার সঙ্গে পুরোটা সময় জুড়ে ফোনে আমার বন্ধু দীনা, সাথি ও আমার বোন। যারা বসুন্ধরা নিবাসী, তারা মনে করতে পারবেন। জিপির গেইট আর বসুন্ধরা মেইনরোডের মাঝখানে ঘটে যাওয়া, ৫ আগস্টের সেই ভয়াবহ যুদ্ধ। একটার পর একটা ছেলে গুলিবিদ্ধ হচ্ছে আর হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ, সেদিন ওরা একটি বাচ্চাকেও চিকিৎসাবিহীন রাখেনি।
এদিকে, সীমান্তের এপার-ওপারের মতোন অবস্থা আমার ও আনিকার। জিপি এবং বসুন্ধরা গেটের মাঝখানে একটা নো ম্যান্স ল্যান্ড ক্রিয়েট হয়েছে, পুলিশও সেটা এই মুহূর্তে ক্রস করছে না, জনগণও করছে না।
প্রায় ৪০ মিনিট বাথরুমে আটকা পড়ে আছি। ফিসফিস করে ফোনে কথা বলছি আনিকার সঙ্গে। আনিকা সাহস দিচ্ছে, এরমধ্যেই চিৎকার করে উঠল ও। কুড়িলের সাইডে ছিল আনিকা। ওর ঠিক পাশেই একটি ছেলে গুলিতে লুটিয়ে পড়েছে রাস্তায়। গুলির শেল এবং নিহতের ঘিলু এসে ওর পায়ের কাছে পড়েছে। শেলটা ও কুড়িয়ে হাতে ধরে আছে। ফোনটা রেখে দিলো কথাটা বলে।
খুব সাবধানে ওয়াশরুমের দরজা খুললাম। ক্যামেরা অন করে দেয়াল থেকে স্লাইড করে বের করতেই, সামনে দিয়ে একটি গুলি চলে গেল। ১১টা অবধি তুমুল সম্মুখ যুদ্ধ চলমান। ক্রমেই জনতার পাল্লা ভারী হতে লাগল। শতাধিক বন্দুক নিশ্চুপ হয়ে এলো ধীরে। আমি ও আনিকা পরস্পরকে জীবিত ফেরত পেয়ে মৃদু হাসলাম। ততক্ষণে জেনে গেছি, হাসিনা পালিয়েছে। একনজর এভারকেয়ারে গেলাম দুজনে। ওখান থেকে একটি অটো রিকশা ভাড়া করে আমরা সারাহ দিনাকে আনতে গেলাম ধানমণ্ডি। রাস্তার সব পুলিশকে থুতু দিতে দিতে এগোচ্ছে আনিকা।
৫ আগস্টে গণভবনমুখী মানুষের ঢল। ছবি : সময়ের আলো
ধানমন্ডি থেকে দীনাকে তুললাম। রাস্তায় আনন্দ উল্লাসে ভেসে যাওয়া মানুষ। দীনা বললো, ও আর রাস্তায় থাকতে চায় না। অগত্যা সেন্ট্রাল রোড গেলাম দীনার মায়ের বাসায় ওকে ড্রপ করতে। ওখানে দীনা পরিষ্কার কাপড় দিলো আমাকে। গোসল করলাম। আন্টি চিচিঙ্গার ঝোল ও ডিম ভাজি করে ভাত দিলেন। সেই চিচিঙ্গার তরকারি দিয়ে ভাত মুখে তুলতে পেরেছিলাম প্রায় দিন ১৫ পরে। ১৮ জুলাই জাহেদ সোবহান এবং আমি একটা বীভৎসভাবে গুলিবিদ্ধ ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে হাসপাতালে দৌড়েছি। সেই থেকে রক্তের বোটকা গন্ধ পেতাম সারাদিন। খেতে পারছিলাম না কিছুতেই।
বাসায় কথা বললাম ফোনে, সব মানুষ রাস্তায়। ওখান থেকে বের হলাম ঘণ্টা তিনেক পরে। একা একা হেঁটে যাচ্ছি শাহবাগ। হাজার হাজার মানুষ, নিশ্বাস নেওয়ার জায়গা নেই। মিষ্টির দোকানগুলোতে মানুষ গিজগিজ করছে। শাহবাগ থেকে মিন্টো রোডের দিকে যেতে যেতে হঠাৎ বুক ভেঙে কান্না এলো। রাস্তায় বসে পড়লাম। বমি হয়ে গেল যা খেয়েছিলাম। সেখান থেকে ফোন দিলাম প্রিয় একজনকে। দ্রুত উনি এলেন। খানিক বাদে পরিস্থিতির আঁচে একটি অটোরিকশায় তুলে দিলেন আমাকে। চারিদিকে কেমন একটা অপরিচিত ঘ্রাণ, অশনি সংকেত।
আর কারও সঙ্গে দেখা করিনি, সোজা বাসায় চলে এলাম। এসে দেখি, হাসপাতাল থেকে আমার বোনও চলে এসেছে। রান্না করছে। জুলাই ১৭ থেকে আগস্ট ৫ অবধি, আমার বোন সাংসারিক এবং আর্থিক সমস্ত কিছু একা সামলেছে, কোনো কম্পলেই ছাড়া। ভোর হলেই হাসপাতালে দৌড়েছে, তখন এভারকেয়ারে চাকরি করতো ও। পুরোটা সময় হাসপাতালে ওভার ডিউটি করেছে ওদের সব স্টাফরা। প্রায় ১৫ দিন পর গা ছেড়ে দিয়ে ঘুমাচ্ছি।
সরকার পতনের পর সংসদ ভবনে উচ্ছ্বসিত জনতা। ছবি : সময়ের আলো
২০২৩-এর অক্টোবর ৭ এ হামাস ইজরায়েলে অপারেশন চালিয়ে, ফিলিস্তিনের উপর জাহান্নাম ডেকে আনে। এরপর থেকে জুলাই ৩৬ অবধি, আমার বয়স বেড়েছে ১০ বছর। এর আগ অবধি পৃথিবীর কোনো জরা আমাকে স্পর্শ করতে পারতো না। আমার হিলিং পাওয়ার সেটাকে বাউন্সার মেরে গ্যালারির বাইরে পাঠিয়ে দিতো। এখন আর দেয় না, এবসর্ভ করে। স্বাভাবিক হওয়া দীর্ঘ সময়ের ব্যপার, আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমার পরিবার এবং বন্ধুদের কাছে কৃতজ্ঞ, আমাকে প্রতিটা মুহূর্ত সেইফ ফিল করানোর জন্য। সময়ে সময়ে কিছু খেও, একটু ঘুমিয়ে নাও বলতেন মোহসিনা আক্তার আপু। আমি কৃতজ্ঞ আমাকে স্নেহের, আশীর্বাদের চোখে দেখা সেই মানুষগুলোর কাছে। তাদের কারণে আমি ট্রমা কাটিয়ে উঠেছি।
কিন্ত যারা স্বর্গগত হয়েছে, তাদের পরিবারের যন্ত্রণা শুধুমাত্র রাষ্ট্রযন্ত্র সংস্কারের মাধ্যমেই সম্ভব হয়ত। সংবর্ধনার নামে কিংবা স্রেফ সম্মানী দিয়ে তাদের সঙ্গে যে প্রহসন করেছে ইউসুফ সরকার, সেটা দেখার মতোন ছিল।
আহত হয়ে যারা মুখ, চোখ কিংবা হাত-পা হারিয়েছে, তাদের উন্নত চিকিৎসা কই? মানসিক ও আর্থিক পুনর্বাসনের মাধ্যমে প্রতিদান দিতে পারতো দায়িত্ব নেওয়া মহান দায়িত্ববানরা। বড় বড় ভাষণ, সিলেক্টিভ সমন্বয়কদের নিয়ে নৈশভোজ কিংবা রাষ্ট্রীয় খরচে ব্যক্তিগত পুরস্কার আনার মতোন ঘটনা গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়, প্রিয় বিপ্লবী নেতারা!
বীভৎসভাবে সন্তান হারানোর যন্ত্রণা নিয়ে জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছে এ আন্দোলনে। পুরাতন রাজনৈতিক দল বা নেতাদের কিছু বলব না আজ, ওরা অন্তত এত বড় প্রতারণা করে নাই। ওরা যে চোর-বাটপার আমরা জানতাম। দেশদ্রোহী, দুর্নীতিবাজ আমলা, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সমঝোতা করে পরিবর্তনের আশায় শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়া, বিপ্লবী নেতারা ঠকিয়েছে এই দেশের জনতাকে।
জুলাই আসলে কোথাও যায় নাই, জুলাই অন্তরে জ্বলছে। দুঃখিত, আনন্দ আসছে না, মরা ছেলে-মেয়েদের চেহারা ভাসছে চোখে।