বাংলাদেশে কওমি মাদরাসা শুধু একটি ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থা নয়; লাখ লাখ শিশুর শৈশব, শিক্ষা, আবাসন ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের সঙ্গে এটি প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত। বিশেষ করে হিফজ, নুরানি ও কিতাব বিভাগে পড়া বিপুলসংখ্যক শিশু দীর্ঘ সময় আবাসিক পরিবেশে থাকে।
তাদের অনেকেই পরিবার থেকে দূরে, একই বয়সের এবং বিভিন্ন বয়সের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একই আবাসিক পরিসরে বসবাস করে। ফলে এই ব্যবস্থায় শিক্ষা ও ধর্মীয় অনুশাসনের পাশাপাশি শিশু সুরক্ষা, জবাবদিহি, নজরদারি এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির একটি কার্যকর কাঠামো থাকা অপরিহার্য।
বাংলাদেশে কওমি মাদরাসা শুধু একটি ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থা নয়; লাখ লাখ শিশুর শৈশব, শিক্ষা, আবাসন ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের সঙ্গে এটি প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত। বিশেষ করে হিফজ, নুরানি ও কিতাব বিভাগে পড়া বিপুলসংখ্যক শিশু দীর্ঘ সময় আবাসিক পরিবেশে থাকে। তাদের অনেকেই পরিবার থেকে দূরে, একই বয়সের এবং বিভিন্ন বয়সের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একই আবাসিক পরিসরে বসবাস করে। ফলে এই ব্যবস্থায় শিক্ষা ও ধর্মীয় অনুশাসনের পাশাপাশি শিশু সুরক্ষা, জবাবদিহি, নজরদারি এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির একটি কার্যকর কাঠামো থাকা অপরিহার্য।
কওমি মাদরাসায় যৌন নির্যাতনের ঘটনা নতুন কোনো বিষয় নয়। ২০২১ সালে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, মাত্র ১৫ মাসে বিভিন্ন মাদরাসায় ৬২ জন ছেলেশিশু ধর্ষণের শিকার হওয়ার তথ্য সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে এবং তিন শিশুর মৃত্যুর কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল।
তবে সাম্প্রতিক তথ্য আরও উদ্বেগজনক। জাস্টিস মেকারস বাংলাদেশ ইন ফ্রান্সের ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসের সংবাদভিত্তিক পর্যবেক্ষণে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার ১৪৭টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৮৪টি ঘটনা অর্থাৎ ৫৭.১৪ শতাংশ মাদরাসায় ঘটেছে বলে সংগঠনটি জানিয়েছে। একই পর্যবেক্ষণে ৪৬টি ঘটনায় মাদরাসার শিক্ষককে অভিযুক্ত ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মাদরাসার শিক্ষার্থী, ইমাম ও প্রতিবেশীও কিছু ঘটনায় অভিযুক্ত ছিলেন।
সংগঠনটি একই সঙ্গে স্পষ্ট করেছে যে এটি সংবাদভিত্তিক পর্যবেক্ষণ, পূর্ণাঙ্গ জাতীয় পরিসংখ্যান নয় এবং কোনো ধর্মীয় বা পেশাগত গোষ্ঠীকে সামগ্রিকভাবে দায়ী করার উদ্দেশ্যে এই তথ্য তৈরি করা হয়নি।
২০২৬ সালের আরেকটি সংবাদ বিশ্লেষণে চলতি বছরে মাদরাসার শিক্ষার্থীদের জড়িত বা ভুক্তভোগী এমন অন্তত ৩৭টি ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৯ জন ছিল ছেলে এবং ৮ জন মেয়ে। ছেলেদের ক্ষেত্রে ২৫টি অভিযোগে শিক্ষক অভিযুক্ত ছিলেন এবং অধিকাংশ ভুক্তভোগীর বয়স ছিল ৭ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে।
এই সংখ্যাগুলোকে ‘কওমি মাদরাসায় সংঘটিত মোট যৌন নির্যাতনের সংখ্যা’ হিসেবে দেখা যাবে না। কারণ বাংলাদেশে এমন কোনো কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ নেই যেখানে প্রতিটি কওমি মাদরাসা, শিক্ষার্থী, আবাসিক ব্যবস্থা, নির্যাতনের অভিযোগ, তদন্ত ও মামলার তথ্য নিয়মিতভাবে সংরক্ষিত হয়। ফলে সংবাদে প্রকাশিত সংখ্যা প্রকৃত ঘটনার চেয়ে কম হওয়ার আশঙ্কাই স্বাভাবিক।
২০১৩ সালের শিশু আইনসহ বিদ্যমান আইনি কাঠামো শিশুদের সুরক্ষার ভিত্তি তৈরি করেছে। উপরন্তু ২০০৯ সালে হাইকোর্ট যৌন হয়রানি প্রতিরোধে যে নির্দেশনা দিয়েছিলেন, তা সরকারি-বেসরকারি সব কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য। নির্দেশনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানির অভিযোগ তদন্তের জন্য অভিযোগ কমিটি গঠনের কথাও বলা হয়েছে। অতএব ‘কওমি মাদরাসার জন্য কোনো আইন নেই’ বলা যেমন সঠিক নয়, তেমনি বিদ্যমান আইনি সুরক্ষা বাস্তবে যথেষ্ট কার্যকর হচ্ছে বলাও কঠিন।
কওমি মাদরাসার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো আবাসিক শিক্ষা। হিফজ বিভাগের অনেক শিশু দীর্ঘ সময় মাদরাসায় অবস্থান করে। একই কক্ষে বা একই ফ্লোরে বিভিন্ন বয়সের শিক্ষার্থীদের বসবাস, ঘুমানো ও দৈনন্দিন জীবনযাপন অনেক প্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক ব্যবস্থা। এ ধরনের পরিবেশে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে বয়সভিত্তিক আবাসিক ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক, নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত আবাসিক শিক্ষক, পর্যাপ্ত আলো, নিরাপদ স্যানিটেশন, অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোর নিয়মিত নজরদারি থাকা দরকার।
শুধু সিসি ক্যামেরা বসালেই সমস্যার সমাধান হবে না। বরং শোয়ার ঘর, বাথরুম বা ব্যক্তিগত পরিসরে ক্যামেরা বসানো শিশুদের গোপনীয়তা লঙ্ঘন করতে পারে। ক্যামেরা প্রয়োজন হলে তা করিডোর, প্রবেশপথ, সিঁড়ি, গেট ও অন্যান্য উপযুক্ত সাধারণ স্থানে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত। একই সঙ্গে ফুটেজ সংরক্ষণ ও ব্যবহারের জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকতে হবে।
যৌন নির্যাতনের পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের সংস্কৃতিও শিশুদের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে। বাংলাদেশে শিশুদের ওপর সহিংস শাসন যে ব্যাপক, তার একটি ধারণা পাওয়া যায় ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৯ সালের তথ্য থেকে। ১ থেকে ১৪ বছর বয়সি শিশুদের ৮৮.৮ শতাংশ গত এক মাসে কোনো না কোনো ধরনের সহিংস শাসনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছিল; ৬৪.৬ শতাংশ শারীরিক শাস্তি এবং ৩০.২ শতাংশ গুরুতর শারীরিক শাস্তির শিকার হয়েছিল।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, বাংলাদেশকে নিয়ে ইউনিসেফের একটি আঞ্চলিক গবেষণায় ১০ থেকে ১২ বছর বয়সি শিক্ষার্থীদের একটি নমুনায় মাদরাসায় শারীরিক শাস্তির অভিজ্ঞতা ৯৪ শতাংশ পর্যন্ত পাওয়া গিয়েছিল। এটি সমগ্র কওমি মাদরাসার বর্তমান পরিস্থিতির পরিসংখ্যান নয়; তবে মাদরাসা শিক্ষায় শারীরিক শাস্তি নিয়ে একটি গুরুতর গবেষণাগত সতর্কবার্তা।
সরকার ২০১১ সালেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ করে নির্দেশনা জারি করেছিল। সেই নির্দেশনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংজ্ঞার মধ্যে মাদরাসাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। শিক্ষার্থীকে আঘাত করা, বেত বা হাত-পা দিয়ে মারা, চিমটি কাটা, কামড় দেওয়া ইত্যাদি শারীরিক শাস্তির উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই ‘শিক্ষক শাসন করছেন’ বলে শিশুকে মারধর, বেত্রাঘাত বা নির্যাতনকে ধর্মীয় শিক্ষা বা শৃঙ্খলার অংশ হিসেবে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ নেই।
শিশু যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা অপরাধ গোপন রাখার সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি। একটি শিশু যখন শিক্ষক বা সিনিয়র কোনো শিক্ষার্থীর মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার হয়, তখন সে অনেক সময় ভয়ে কাউকে কিছু বলে না। অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি শিক্ষক হন, তা হলে তার হাতে থাকে কর্তৃত্ব, ধর্মীয় মর্যাদা, শিক্ষাগত নিয়ন্ত্রণ এবং অনেক ক্ষেত্রে আবাসিক ব্যবস্থার ওপর প্রভাব। অন্যদিকে ছোট শিশুদের অনেকেই বুঝতেই পারে না যে তার সঙ্গে যা ঘটছে তা অপরাধ।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবার ও প্রতিষ্ঠানের ‘সম্মান’ রক্ষার মানসিকতা। অনেক পরিবার অভিযোগ করলে সন্তানকে মাদরাসা থেকে বের করে নেওয়া, সামাজিক অপমান বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কথা বলার ভয় পেতে পারে। ফলে ভুক্তভোগী শিশুর নিরাপত্তার বদলে অনেক সময় প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষাই অগ্রাধিকার পেয়ে যায়।
শিশু নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত, আবাসিক নিরাপত্তা নিরীক্ষা, শিক্ষক নিয়োগে যাচাই, অভিযোগকারীর সুরক্ষা, অভিযুক্তকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে সরানো, বাধ্যতামূলক রিপোর্টিং এবং প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বা নিবন্ধন ব্যবস্থা একটি বৃহত্তর রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্কের বিষয়।
প্রথম কাজ হওয়া উচিত জাতীয় কওমি মাদরাসা ডাটাবেজ তৈরি করা। কোন মাদরাসা কোথায়, সেখানে কতজন শিক্ষার্থী, কতজন আবাসিক, কতজন শিক্ষক, আবাসিক ভবনের ধারণক্ষমতা কত, কোন বোর্ডের সঙ্গে যুক্ত, প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি কারা এবং শিশু সুরক্ষার দায়িত্বে কে আছেন, এসব তথ্য নিবন্ধিত থাকা দরকার।
প্রতিটি মাদরাসায় একজন শিশু সুরক্ষা ফোকাল পারসন থাকা উচিত। তিনি মাদরাসা কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি একটি স্বাধীন সরকারি বা স্বীকৃত শিশু সুরক্ষা নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন। শিক্ষক বা সিনিয়র শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে ‘মাদরাসার অভ্যন্তরীণ সালিশে’ বিষয়টি মীমাংসা করার সুযোগ বন্ধ করতে হবে। অপরাধের প্রকৃতি অনুযায়ী পুলিশ, শিশু সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ ও আদালতের আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
বাংলাদেশে শিশুদের জন্য ইতিমধ্যে চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮ রয়েছে। সমাজসেবা অধিদফতরের অধীনে পরিচালিত এই সেবায় দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে শিশু নির্যাতন, সহিংসতা ও শোষণের ঘটনায় শিশু নিজে অথবা তার হয়ে অন্য কেউ বিনামূল্যে যোগাযোগ করতে পারে। সেবাটি ২৪ ঘণ্টা চালু
থাকার কথা সরকারি তথ্যেই উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু একটি সাত-আট বছরের আবাসিক শিশু ১০৯৮ নম্বর জানবে কীভাবে? সে ফোন করার সুযোগ পাবে কীভাবে? অভিযোগ করার পর তাকে কোথায় নেওয়া হবে? অভিযোগকারী শিশুকে অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছ থেকে কীভাবে নিরাপদে সরানো হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর প্রতিটি আবাসিক প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা পরিকল্পনায় থাকা উচিত।
কওমি মাদরাসা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দুটি চরম অবস্থান এড়িয়ে চলা জরুরি। একদিকে সব কওমি মাদরাসাকে সন্দেহের চোখে দেখা যেমন অন্যায়, অন্যদিকে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদার কারণে সেখানকার শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না, এমন ধারণাও বিপজ্জনক।
ধর্মীয় শিক্ষা শিশুদের নৈতিকতা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ শেখানোর কথা। সেই শিক্ষার পরিবেশেই যদি কোনো শিশু যৌন বা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয় এবং ভয়ে মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়, তা হলে সমস্যাটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়; এটি আমাদের সামগ্রিক শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতা।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, বেলচোঁ কারিমাবাদ ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসা, হাজীগঞ্জ, চাঁদপুর
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে