মাত্র পাঁচ বছর পর বাংলাদেশের অর্থনীতি ৬৭৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। এ সময়ে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকারে মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের মতো দেশের অর্থনীতিকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে বাংলাদেশ। কানাডার সংবাদমাধ্যম ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্টের ‘দ্য ১৫০ ট্রিলিয়ন ডলার গ্লোবাল ইকোনমি ইন ২০৩০’ শীর্ষক প্রতিবেদনে আইএমএফের এই পূর্বাভাস তুলে ধরা হয়েছে।
এতে ২০৩০ সালে মালয়েশিয়ার জিডিপি ৬৭২ দশমিক ৫ বিলিয়ন, ভিয়েতনামের ৬৬৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন, থাইল্যান্ডের ৬৪৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন এবং ডেনমার্কের ৫৮৯ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
এই পূর্বাভাস থেকে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি কোন পর্যায়ে পৌঁছাবে তার একটি ধারণা পাওয়া যায়। জনগণের ভোটে নির্বাচিত নতুন সরকার সাত মাস আগে দায়িত্ব নিয়েছে। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া অর্থনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা সংকট নিয়েই সরকারকে যাত্রা শুরু করতে হয়েছে। এসব সংকটের প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনেও। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তায় অনেকের সঞ্চয় শেষ হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতের ব্যয় মেটানোর সক্ষমতাও কমেছে।
ব্যবসায়ীদের হাতেও পর্যাপ্ত অর্থের জোগান ছিল না। অনেক শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়েছে। এতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান দুটিই চাপের মুখে পড়েছে। শিল্প-কারখানা বন্ধ হওয়ায় অনেকে চাকরি হারিয়েছেন। দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির কারণে বেড়েছে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত। জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দামের ওপর এর প্রভাব পড়েছে। আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিও এই চাপ থেকে মুক্ত নয়।
এমন বহুমুখী সংকটের মধ্যে সরকারের সাত মাসের বেশি সময় পার হয়েছে। ছয়-সাত মাস অবশ্যই অর্থনীতির বড় পরিবর্তন ঘটানোর জন্য দীর্ঘ সময় নয়। তবে এই সময়ে সামষ্টিক অর্থনীতির কয়েকটি সূচকে ইতিবাচক পরিবর্তনের কথা বলা হচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে। বৈদেশিক লেনদেনে স্থিতিশীলতা ফিরেছে। টাকার বিনিময়মূল্যও তুলনামূলক স্থিতিশীল হয়েছে। অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতার কিছু লক্ষণ এ থেকে পাওয়া যায়।
বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতিতেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে বাংলাদেশকে একটি ম্যানুফ্যাকচারিং হাব হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। বিনিয়োগ বাড়লে উৎপাদন বাড়বে। এর সঙ্গে কর্মসংস্থান ও রাজস্ব আহরণও বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে। এ ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল কর কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে নীতির ধারাবাহিকতা আস্থা তৈরি করে।
দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। বিনিয়োগের পরিবেশ শুধু করছাড় বা তহবিলের ওপর নির্ভর করে না। নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, সহজ ব্যবসা পরিবেশ, ব্যাংক ঋণের প্রাপ্যতা, দক্ষ জনশক্তি এবং নীতির স্থিতিশীলতাও এর সঙ্গে জড়িত। তাই নতুন অর্থনৈতিক মডেলের সুফল পেতে হলে এসব বিষয়কে সমন্বিতভাবে দেখতে হবে।
অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর পথে বড় বাধাগুলোর একটি হলো জ্বালানি সংকট। গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। আগামী শীতে জ্বালানি পরিস্থিতিতে স্বস্তি আসবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। হরমুজ প্রণালি ঘিরে জ্বালানি সরবরাহে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় বিকল্প উৎস খোঁজা হচ্ছে। কাতারের পাশাপাশি অন্যান্য উৎস থেকেও জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। কোন উৎস থেকে, কোন মুদ্রায় এবং কীভাবে অর্থায়নের মাধ্যমে জ্বালানি কেনা হবে, সেসব সিদ্ধান্তে দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। দেশে গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘদিনের ঘাটতি রয়েছে। সম্ভাব্য কয়লা সম্পদের ব্যবহার নিয়েও কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি ছিল। এখন সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন করে ব্লক দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলতি বছরের নভেম্বর নাগাদ এ বিষয়ে দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়ায় যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে জ্বালানি আমদানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে এমন চুক্তি প্রয়োজন, যাতে দেশের ওপর অপ্রয়োজনীয় আর্থিক চাপ না পড়ে।
অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে রাজস্ব আহরণ ও ঋণ ব্যবস্থাপনাতেও নজর দিতে হবে। অভ্যন্তরীণ করের হার বাড়ানোর বদলে করের আওতা বাড়ানো এবং কর প্রশাসনের দক্ষতা উন্নত করার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। ঋণ নেওয়া কোনো নেতিবাচক বিষয় নয়। তবে ঋণের অর্থ কোথায় বিনিয়োগ হচ্ছে, তার প্রত্যাশিত ফল কী, সুদের হার কত এবং কত সময়ের জন্য ঋণ নেওয়া হচ্ছে— এসব বিষয় বিবেচনা করা জরুরি। উৎপাদনশীল খাতে নেওয়া ঋণ অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি সুফল আনতে পারে। অপরিকল্পিত ঋণ আবার ভবিষ্যতের ওপর বাড়তি বোঝা তৈরি করতে পারে।
অর্থনীতির আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো কর্মসংস্থান। বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ দরকার। রাজস্ব আহরণ ও ব্যাংক খাতের সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি নতুন ও ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য ঘোষিত তহবিল ও করছাড়ের সুফল প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছাতে হবে। এর জন্য বিতরণব্যবস্থা সহজ ও স্বচ্ছ করা প্রয়োজন।
বন্ধ শিল্প-কারখানা পুনরুজ্জীবনের ক্ষেত্রেও বাস্তবভিত্তিক নীতি দরকার। সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করতে সুনির্দিষ্ট মূল্যায়ন কাঠামো থাকা উচিত। জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির চাপ থেকে নতুন ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সাময়িক সুরক্ষায় লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার কথাও বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এসব উদ্যোগের পাশাপাশি বাজারে প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
তরুণদের কর্মসংস্থানের সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থারও সরাসরি যোগসূত্র তৈরি করা জরুরি। শিক্ষা ও শিল্পের কার্যকর সংযোগ, ইন্টার্নশিপের সুযোগ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্য-বিশ্লেষণ ও আর্থিক সাক্ষরতাকে শিক্ষার মূলধারায় যুক্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। বাল্যবিয়ে, কিশোরী মাতৃত্ব ও মজুরিবৈষম্যের মতো বাধা দূর করা না গেলে জনমিতিক লভ্যাংশের বড় একটি অংশ কাজে লাগানো সম্ভব হবে না। শিশুদের পুষ্টি ও স্বাস্থ্যে বিনিয়োগও ভবিষ্যৎ কর্মশক্তির সক্ষমতা তৈরির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
পররাষ্ট্রনীতিও অর্থনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার নীতি বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তায় সুযোগ তৈরি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে জ্বালানি, ওষুধ, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির মতো খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গেও বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর পথে রয়েছে— এমন কিছু ইতিবাচক সংকেত যেমন আছে, তেমনি বড় ঝুঁকিও রয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা, ব্যাংক খাতের সংস্কার, বিনিয়োগ বাড়ানো, শিল্পে কর্মসংস্থান ধরে রাখা এবং রাজস্ব আয় বাড়ানো সহজ কাজ নয়। এর সঙ্গে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের মতো বড় আর্থিক সিদ্ধান্তও রয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রত্যাশা পূরণের পাশাপাশি এর আর্থিক প্রভাবও বিবেচনায় রাখতে হবে।
আগামী কয়েক মাস তাই অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগের পরিবেশ সহজ করা, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, রাজস্ব ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং কর্মসংস্থানমুখী উৎপাদন বাড়াতে পারলে অর্থনীতি আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারে। শুধু জিডিপির আকার বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। প্রবৃদ্ধির সুফল মানুষের আয়, কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রায় কতটা পৌঁছাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
আইএমএফের পূর্বাভাস বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনার চিত্র তুলে ধরেছে। সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার পাশাপাশি উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ভিত্তি শক্ত করতে হবে। অর্থনীতিতে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হলে তার মূল্য দিতে হয় জনগণ, উদ্যোক্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে। তাই এখন প্রয়োজন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, দ্রুত বাস্তবায়ন এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা।
লেখক : সাবেক ব্যাংকার
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও