একসঙ্গে বাড়ছে ডেঙ্গু ও হামের সংক্রমণ। এতে করে বড় চাপে পড়েছে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা। হাসপাতালগুলোতে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। অনেক চিকিৎসাকেন্দ্র নির্ধারিত শয্যার বাইরে রোগী রাখতে বাধ্য হচ্ছে। কোথাও কোথাও মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। রাজধানীর বড় হাসপাতালগুলোকে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। আগামীতে সংক্রমণ বাড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের দেওয়া তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে, গত ১৬ সেপ্টেম্বর দেশের হাসপাতালগুলোতে হাম ও ডেঙ্গু মিলিয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন ১০ হাজার ১২১ জন। এর মধ্যে হামের রোগী বা হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি ছিলেন ৫ হাজার ৯৫৯ জন এবং ডেঙ্গু রোগী ছিলেন ৪ হাজার ১৬৬ জন। সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৫ দিনেই হাম ও ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন যথাক্রমে ১৫ হাজার ৯৭৫ ও ২১ হাজার ৭০ জন। এ সময়ে ডেঙ্গুতে ১৭৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। শুধু সেপ্টেম্বরেই মারা গেছেন ৭৯ জন।
হামের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। গত ১৫ মার্চ থেকে হামের সংক্রমণ ও উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন হাসপাতালে হাম সন্দেহে ভর্তি হয়েছেন এক লাখ ৫৭ হাজারের বেশি মানুষ। একই সময়ে দুটি রোগের চাপ সামলাতে হচ্ছে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থাকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ। যে কারণে এই রোগে আক্রান্তদের আলাদা রাখা জরুরি। এর প্রভাবে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য বরাদ্দ জায়গা আরও সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৯১টি শয্যা ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্ধারিত থাকলেও সেখানে গত বুধবার এক দিনে ২৪৭ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। একইভাবে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নির্ধারিত ৫০০ শয্যার বিপরীতে রোগী ভর্তি ছিলেন ১ হাজার ৩১৪ জন। রোগীর বাড়তি চাপ সামলাতে গিয়ে এক রোগের জন্য নির্ধারিত ওয়ার্ড অন্য রোগীদের দিতে হচ্ছে। এতে অন্যান্য রোগের চিকিৎসাও চাপের মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন সংকট কেবল এই দুটি হাসপাতালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের অনেক হাসপাতালকেই এই সমস্যা মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
সরকার ইতিমধ্যে হাসপাতালে শয্যাসংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। জনবলও বাড়ানো হবে। মুগদা হাসপাতালে বাড়তি শয্যা যুক্ত করা হলেও এখনও সেখানে চাহিদার তুলনায় জনবল অপ্রতুল। রোগীর সংখ্যা আরও বাড়লে অস্থায়ী বা ফিল্ড হাসপাতাল করার কথাও জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। এসব উদ্যোগ জরুরি।
তবে সেপ্টেম্বরের শেষ ও অক্টোবরের শুরুতে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কাজেই রোগীর চাপ আরও বাড়ার আগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়েও পর্যাপ্ত শয্যা, চিকিৎসক, নার্স ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখতে হবে, যাতে সব রোগীকে ঢাকামুখী হতে না হয়।
রোগ নিয়ন্ত্রণে কেবল হাসপাতালের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। শুধু হাসপাতালের শয্যা বাড়িয়ে এই সংকট সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকার ইতিমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বললেও তা অনেকাংশে দৃশ্যমান হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে। নিয়মিত মশা নিধন কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি। হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি দূর করতে হবে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে হামে আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে ডেঙ্গু ও হাম। এখন পরিস্থিতির গতিপ্রকৃতি বুঝে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। হাসপাতালের জরুরি সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে অন্যান্য রোগীর চিকিৎসা যাতে ব্যাহত না হয়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। জনস্বাস্থ্য সংকট বড় হওয়ার আগে প্রস্তুতি সম্পন্ন করাই হবে সবচেয়ে দায়িত্বশীল পদক্ষেপ।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে