পৃথিবীর ইতিহাসে রাজনৈতিক নেতাদের মৃত্যুদণ্ডের বহু ঘটনা গভীর আলোড়ন তৈরি করেছে। ইতিহাসের নির্মোহ বিচারালয় কিংবা বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিভিন্ন আইনের ধারায় অপরাধ প্রমাণে ফাঁসির আদেশ এসেছে। ক্ষমতার শীর্ষবিন্দু থেকে ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার এই আখ্যান রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে। ন্যায়বিচার কিংবা রাজনৈতিক প্রতিশোধের এই দ্বন্দ্ব যুগে যুগে বিশ্বজুড়ে মানুষকে আলোড়িত করে চলেছে।
পৃথিবীর ইতিহাসের আলোড়ন সৃষ্টিকারী মধ্যপ্রাচ্যের ইরাকে ২০০৬ সালের ৫ নভেম্বর মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের কারণে ফাঁসির রায় আসে। ইরাকি দণ্ডবিধির নির্দিষ্ট ধারায় কুর্দি গণহত্যার দায়ে বিচার করা হয়। ক্ষমতার মসনদ থেকে ফাঁসির মঞ্চের এই যাত্রা বিশ্বকে স্তব্ধ করেছিল। পরবর্তীতে ৩০ ডিসেম্বর এই চূড়ান্ত সাজা কার্যকর করে ইতিহাস বদলানো হয়।
পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত বিতর্কিত সামরিক আদালতের বিশেষ এজলাসে জুলফিকার আলী ভুট্টোর ফাঁসির রায় দেওয়া হয়। ১৯৭৯ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি খুনের ষড়যন্ত্রের দায়ে উচ্চ আদালত এটি বহাল রাখে। পাকিস্তানি দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় এই দণ্ডটি চূড়ান্তভাবে কার্যকর হয়েছিল। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হিসেবে পিপিপির সমর্থকরা এই বিচারকে সবসময় বর্ণনা করেছে। ৪ এপ্রিল রাওয়ালপিণ্ডির কারাগারে ফাঁসির রায়টি কার্যকর করা হয়েছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপে ইতালির এক বিশেষ আদালতে ফ্যাসিবাদী একনায়ক বেনিতো মুসোলিনিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে এক নতুন নজির তৈরি করা হয়েছিল। ১৯৪৫ সালের ২৮ এপ্রিল রাষ্ট্রদ্রোহ ও যুদ্ধাপরাধের দায়ে এই আদেশ আসে। ইতালির বিশেষ সামরিক আইনের কঠোর ধারায় বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছিল। পলায়নপর অবস্থায় আটক করে তাৎক্ষণিকভাবে ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছিল।
জার্মানির ঐতিহাসিক নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনাল নাৎসি নেতা হারমান গোয়েরিংসহ শীর্ষ ১২ জনকে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। ১৯৪৬ সালের ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক আদালত মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের রায় দেয়। আন্তর্জাতিক সামরিক সনদের নির্দিষ্ট ধারায় বিশ্ববিখ্যাত এই ঐতিহাসিক বিচার হয়েছিল। নাৎসি বাহিনীর ভয়াবহ নৃশংসতা ও ইহুদি নিধনের অপরাধে এই বিচার সফল হয়েছিল।
জাপানের রাজধানী টোকিওর আন্তর্জাতিক দূরপ্রাচ্য সামরিক ট্রাইব্যুনাল যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী হিদেকি তোজোসহ শীর্ষ ৭ নেতাকে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। ১৯৪৮ সালের ১২ নভেম্বর আগ্রাসী যুদ্ধ পরিচালনার দায়ে এই রায় আসে। টোকিও সনদের যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের ধারায় এই দণ্ড হয়েছিল। ২২ ডিসেম্বর ফাঁসির মঞ্চে এই শীর্ষ নেতাদের জীবনের চূড়ান্ত অবসান ঘটেছিল।
তুরস্কের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সামরিক জান্তার গঠিত বিশেষ ট্রাইব্যুনাল আদনান মেন্দেরেসকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছিল। ১৯৬১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সংবিধান লঙ্ঘন ও রাষ্ট্রদ্রোহের দায়ে এই রায় হয়। তুর্কি দণ্ডবিধির ১৪৬ ধারায় আদালতের মাধ্যমে অপরাধ প্রমাণ করা হয়েছিল। একটি গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধানকে ফাঁসি দেওয়া বিশ্ব রাজনীতিকে স্তম্ভিত করেছিল। ১৭ সেপ্টেম্বর ইমরালি দ্বীপে এই শীর্ষ নেতার ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রধান তাত্ত্বিক নেতা সাইয়্যেদ কুতুবকে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল হতে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। ১৯৬৬ সালের ২১ আগস্ট রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যার ষড়যন্ত্রের দায়ে এই রায় হয়। মিসরের সামরিক আইনের রাষ্ট্রদ্রোহিতার ধারায় এই দণ্ডাদেশ কার্যকর করা হয়েছিল। ২৯ আগস্ট কায়রোর কেন্দ্রীয় কারাগারে অত্যন্ত গোপনীয়তায় ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছিল।
লিবিয়ার মরুভূমির সিংহ হিসেবে পরিচিত স্বাধীনতাকামী নেতাকে ঔপনিবেশিক আদালত সাজা দিয়েছিল। ইতালির বিশেষ সামরিক ট্রাইব্যুনাল ওমর মুখতারকে ফাঁসির আদেশ প্রদান করে। ১৯৩১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের দায়ে বিচার হয়। ইতালির ঔপনিবেশিক সামরিক আইনের রাষ্ট্রদ্রোহের ধারায় এই ফাঁসির রায় হয়েছিল। ১৬ সেপ্টেম্বর সুলুক নামক স্থানে হাজারো মানুষের সামনে ফাঁসি দেওয়া হয়।
দক্ষিণ কোরিয়ার এক সামরিক স্বৈরাচারী প্রধান চুন দু-হোয়ানকে সিউলের বিশেষ ফৌজদারি আদালত ফাঁসির আদেশ দিয়েছিল। ১৯৯৬ সালের ২৬ আগস্ট সামরিক অভ্যুত্থান ও কুয়াংজু গণহত্যার দায়ে বিচার হয়। কোরিয়ান সামরিক আইনের দেশদ্রোহ ও দুর্নীতির ধারায় আদালত এই রায় দেয়। তবে এই রায়টি দেশটির গণতন্ত্রায়নের ইতিহাসে এক বিশাল মাইলফলক ছিল।
ফ্রান্সের জাতীয় কনভেনশন রাজা ষোড়শ লুইকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল। ১৭৯৩ সালের ১৭ জানুয়ারি রাজতন্ত্রের পতন ঘটিয়ে দেশদ্রোহের দায়ে বিচার হয়। ফরাসি বিপ্লবী আইনের নির্দিষ্ট ধারায় এই চরম দণ্ডাদেশ ঘোষণা করা হয়েছিল। ২১ জানুয়ারি প্যারিসের বিপ্লব চত্বরে গিলোটিনে এই ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছিল।
চিলির একনায়ক অগাস্টো পিনোচেটের সহযোগীদের সামরিক আদালত মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। ১৯৭২ সালের ২৯ নভেম্বর প্রগতিশীল সেনাপ্রধান জেনারেল রেনে শিনাইডারকে হত্যার দায়ে এই রায় হয়। সিআইএর মদদপুষ্ট এই হত্যাকাণ্ড চিলির সমাজকে পুরোপুরি বিভক্ত করে ফেলেছিল। এই ফাঁসির আদেশটি চিলির ইতিহাসে এক রক্তাক্ত অধ্যায়ের সূচনা করেছিল।
গ্রিসের অ্যাথেন্সের বিশেষ আদালত স্বৈরশাসক জর্জ পাপাডোপলোসকে ফাঁসির আদেশ প্রদান করেছিল। ১৯৭৫ সালের ২৩ আগস্ট রাষ্ট্রদ্রোহ ও সামরিক অভ্যুত্থান পরিচালনার দায়ে বিচার হয়। পরে অবশ্য মানবিক কারণে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে এই সাজা পরিবর্তন করা হয়েছিল। আদালতের এই ঐতিহাসিক ফাঁসির আদেশটি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বার্তা ছিল।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০২৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর এক ঐতিহাসিক ও অভূতপূর্ব রায় ঘোষিত হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ ওবায়দুল কাদেরসহ ৭ শীর্ষনেতাকে ফাঁসির আদেশ দেন। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের কারণে এই রায় আসে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের নির্দিষ্ট ধারায় আসামিদের অপরাধ প্রমাণিত হয়। সাজাপ্রাপ্ত অন্য নেতারা হলেন আরাফাত, নাছিম, পরশ, নিখিল, সাদ্দাম ও ইনান। এই ফাঁসির আদেশটি আসামিদের অনুপস্থিতিতেই ঘোষিত হয়েছে।
বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে শেখ হাসিনার ফাঁসির আদেশটি ছিল সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ গত বছরের ১৭ নভেম্বর এই ফাঁসির রায় দেয়। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ৩ ও ৪ ধারায় এই সাজা হয়। একই আদেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়।
বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লাকে ফাঁসির আদেশ দেয়। ২০১৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগ চূড়ান্তভাবে এই সাজা বহাল রাখে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ২০ ধারায় যুদ্ধাপরাধের দণ্ড দেওয়া হয়েছিল। মিরপুরের কসাইখ্যাত এই নেতার ফাঁসির দাবিতে শাহবাগ আন্দোলন হয়েছিল। ওই বছরই ১২ ডিসেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসির আদেশ কার্যকর হয়।
বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীকে ফাঁসির আদেশ দেন। ২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ও গণহত্যার দায়ে বিচার হয়। ট্রাইব্যুনাল আইনের নির্দিষ্ট ধারায় বুদ্ধিজীবী হত্যার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে দোষী হয়। ২০১৬ সালের ১১ মে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে এই ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছিল।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে ফাঁসির আদেশ প্রদান করেন। ২০১৩ সালের ১ অক্টোবর চট্টগ্রামের রাউজান এলাকায় গণহত্যার দায়ে বিচার হয়। ট্রাইব্যুনাল আইনের নির্দিষ্ট ধারায় মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের সাজা হয়েছিল। ২০১৫ সালের ২১ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তার ফাঁসি কার্যকর হয়।
বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে ফাঁসি দেন। ২০১৩ সালের ১৭ জুলাই বুদ্ধিজীবী হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে সাজা হয়। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সঙ্গে একই রাতে তার ফাঁসির আদেশ কার্যকর হয়। ২১ নভেম্বর ২০১৫ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তার ইহকালের সমাপ্তি ঘটে।
বিচারের বাণী কাঁদে একা নিভৃত কোণে, ক্ষমতার দম্ভ ওড়ে রাজনীতির এই রণে। ইতিহাস লেখে নাম রক্তের কালিতে চিরদিন, অন্যায় মুছে যায়, আসে তো ন্যায়ের দিন। আদালতের ঘরে বসে মানুষের ভাগ্য গড়ে, পাপের প্রাসাদ শেষে ধুলাতে লুটিয়ে পড়ে। আইনের চোখে সব সমতার গান গায়, ন্যায়বিচার জেগে রয় মহাকালের এই আঙিনায়।
পরিশেষে বলা যায়, পৃথিবীর বুকে রাজনৈতিক নেতাদের ফাঁসির রায়ের ইতিহাস অত্যন্ত জটিল। এটি মূলত ক্ষমতা, আইন এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের এক নির্মম দলিল। প্রতিটি ফাঁসির রায় সমাজ ও রাষ্ট্রে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে গেছে। আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বজায় রাখা সব যুগের এক বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। এই ঐতিহাসিক রায়গুলো এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে টিকে থাকবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও