আজ অভূতপূর্ব ইতিহাসের সাক্ষী হলাম। নিশ্চয় আজকের দিনটি আমাদের দেশের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন। আমরা কেউই ভাবতেও পারিনি, আজ এমন কিছু ঘটবে। বরাবরের মতোই বড় উৎকণ্ঠায় কাটল নির্ঘুম রাত। মধ্যরাতের পর বিছানায় গিয়ে ঘণ্টাখানেক চোখ বন্ধ করে রাখলাম, কিন্তু কিছুতেই ঘুম এল না। শেষ রাতে হঠাৎ চোখ খুলে গেল। কারণ, আজ ঢাকায় গণঅভ্যুত্থানের জন্য ঘোষিত দিন। সারা বাংলাদেশ থেকে গণমানুষকে ঢাকা অভিমুখে রওনা হওয়ার ডাক দেওয়া হয়েছে। আন্দোলনের সমন্বয়করা এর নাম দিয়েছেন ‘লংমার্চ টু ঢাকা’। অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন শেখ হাসিনা সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রয়োগের সিদ্ধান্তে অনঢ়— প্রয়োজনে তিনি দেশের সব মানুষকে হত্যা করবেন, তবুও আন্দোলনের গলা টিপে ধরবেন। বিগত ১৬ বছর ধরে দেশে একনায়কতন্ত্র ও ত্রাসের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
পুলিশ, ছাত্রলীগ, র্যাব ও বিজিবি নির্বিচারে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার বুকে গুলি চালাচ্ছে। একটুও দ্বিধা করছে না; ঠান্ডা মাথায় গুলিবিদ্ধ শিশু-কিশোরকে আবার গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করছে। আহত মানুষ কোনো আড়ালে গিয়ে লুকালেও তাকে সেখানে গিয়ে মাথায় কয়েক রাউন্ড গুলি করে নিশ্চিত মৃত্যু ঘটানো হচ্ছে। এই মৃত্যুভয়কে উপেক্ষা করেই মানুষ আজ ঢাকা অভিমুখে রওনা হয়েছে। ঢাকার মানুষও রাজপথে নেমে আসার চেষ্টা করছে। কিন্তু মানুষ শেষ পর্যন্ত দাঁড়াতে পারবে তো? এমন হাজারো ভাবনায় ও অস্থিরতায় ছটফট করতে লাগলাম। কখনো বিছানায়, কখনো রিডিংরুমে, কখনো জায়নামাজে, কখনো বা বই নিয়ে বসে পড়ছি; আবার কখনো বুকশেলফের সামনে শুধু দাঁড়িয়ে থাকছি। কী করব? একটু পরপর কম্পিউটারের স্ক্রিনে চোখ রাখছি, ফেসবুক-ইউটিউবে ঘুরে বেড়াচ্ছি।
ফজরের আজানের সময় গা ঝাড়া দিয়ে বিছানা থেকে উঠে পড়লাম। রুমের লাইট জ্বালিয়ে কম্পিউটার খুলে ফেসবুকে ঢুকে দেখলাম, গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ঢাকা মেডিকেল থেকে তিনটি লাশ নিয়ে রাজপথে মিছিল করেছে। দীর্ঘ প্লেটের মতো তিনটি লোহার খাটিয়া। প্রতিটি খাটিয়ার সামনে ও পেছনে একজন করে শিক্ষার্থী এবং মাঝখানে শোয়ানো মৃত শিক্ষার্থী— সবার গায়েই জাতীয় পতাকা জড়ানো। হেঁটে চলা শিক্ষার্থীদের কপালেও পতাকা বাঁধা। ছবিটা দেখে মনে হলো, যেন পুরো বাংলাদেশ এক লাশের মিছিলে অংশ নিতে চলেছে। মুহূর্তেই মনে হলো, এভাবে আর চলতে পারে না; যুদ্ধে যাওয়ার এখনই শ্রেষ্ঠ সময়। স্ক্রল করতেই আরেকটা ছবি দেখলাম—রাত জেগে উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের মানুষেরা অভূতপূর্ব এক সমাবেশ করেছেন।
মধ্যরাতের অন্ধকারে চারপাশে সুরম্য অট্টালিকা, আর মাঝখানে বিশাল সবুজ মাঠে মোমবাতি হাতে সমবেত হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। এই ছবিট্ রাতের অন্ধকার ভেদ করে জাগরণের তাৎপর্য ফুটিয়ে তুলছে, পাশাপাশি আমাদের জাতীয় পতাকার অবয়বও প্রকাশ করেছে; একইসঙ্গে আছে উত্তরার আধুনিক স্থাপত্যের নান্দনিক আবহ, যাতে বহির্বিশ্বেও সুন্দর বার্তার জানান দেওয়া যায়। এরপরেই আরেকটা ছবিতে দেখলাম, অনেক নারীর ভিড়ে এক হিজাবি নারী তার যুবক ছেলের মাথায় পতাকা বেঁধে দিচ্ছেন। এটা একই সঙ্গে ধর্ম, জাতীয়তা, আত্মত্যাগ ও বিপ্লবের প্রতীক। এই তিনটি ছবি একত্র করে ফেসবুকে একটি পোস্ট দিলাম। সঙ্গে যুক্ত করলাম জাতীয় কবির রণসংগীতের কয়েকটি লাইন—‘উষার দুয়ারে হানিয়া আঘাত, আমরা আনিবো রাঙা প্রভাত; আমরা টুটাবো তিমির রাত, বাঁধার বিন্ধ্যাচল-চল চল চল।’
ফজরের নামাজের পর থেকে আবারও ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটার এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে ঘুরতে লাগলাম। বিপরীতমুখী নানা তথ্য চোখে পড়ছে; একেক এলাকায় একেক খবর। বারিডারা মাদ্রাসায় সেনাবাহিনী গুলি চালিয়েছে এবং মাদ্রাসাটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। মোহাম্মদপুরে অল্প কিছু মানুষ রাস্তায় নামলেও কোথাও দাঁড়াতে পারছে না, অনেকে জরুরি সহায়তার আকুতি জানিয়ে পোস্ট করেছেন। অথচ যাত্রাবাড়ী ও উত্তরার দিক থেকে লাখো মানুষ শাহবাগ অভিমুখে ছুটে চলেছে, শাহবাগেও নাকি জনসমুদ্র তৈরি হয়েছে। আবার অন্যদিকে পুলিশ, ছাত্রলীগ ও আর্মি বিভিন্ন জায়গায় গুলি চালাচ্ছে, পুরো রাস্তায় মানুষের কোনো ছায়া নেই।
গণভবনেও নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে; চারপাশ কাঁটাতারের বেড়া ও ইলেকট্রনিক শক-লাইনে মুড়ে দেওয়া হয়েছে। খুবই খারাপ লাগছে; এই দৈত্য ও দানবীয় শক্তির সামনে আর কত মানুষ প্রাণ হারাবে? বুক ফেটে কান্না আসছে, চোখ ভিজে যাচ্ছে। কী করব, কিছুই বুঝতে পারছি না। সকাল নয়টার দিকে আমার স্ত্রী নাস্তা বানিয়ে আনল। নাস্তা শেষে আনল কড়া লিকারের ঘন দুধের চা। চা খেতে খেতে অনেকক্ষণ এসব বিষয় নিয়ে কথা বললাম। নাস্তা সেরে আবারও খবরের খোঁজে কম্পিউটারের সামনে বসলাম। এখন দেখে মনে হচ্ছে, পরিস্থিতি অনেকটা আন্দোলনকারীদের অনুকূলে; অনেক জায়গায় পুলিশ নিষ্ক্রিয় হতে শুরু করেছে।
এরই মধ্যে আমার মা ফোন দিলেন। এই যুদ্ধপরিস্থিতির মধ্যেও আমি নিয়মিত অফিস করছি; তাই আম্মু বললেন অফিসে যাওয়ার দরকার নেই। খুব কড়া ভাষায় অফিসে যেতে নিষেধ করলেন। আরও জানালেন, সাদাতের বন্ধু ইকরামুল হক সাজিদ গতকাল সন্ধ্যায় মিরপুর-১০ গোলচত্বরে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। গুলি মাথার পেছন দিয়ে ঢুকে মগজের নিচ দিয়ে ফুঁড়ে দুই চোখের মাঝখান দিয়ে বের হয়ে গেছে। এখন সিএমএইসের আইসিইউতে সেন্সলেস অবস্থায় আছে এবং ইতিমধ্যে ১৬ ব্যাগ রক্ত দিতে হয়েছে। ছেলেটা সাদাতের খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু; আমাদের বাসায় নিয়মিত আসে, দেখা হয়, কথা হয়। আমাকে রাস্তায় দেখলেই একপাশে সরে গিয়ে সালাম দেয়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ পড়ছে; তার আগে সাদাতের সঙ্গে বিএএফ শাহীন কলেজে পড়াশোনা করেছে। নিয়মিত নামাজ পড়ে। এত কাছের একজন মানুষ এভাবে গুলিবিদ্ধ হয়েছে শুনে মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। আর এই উত্তুঙ্গ পরিস্থিতির মধ্যেই আব্বু-আম্মু শেওড়াপাড়ায় তিন দিনের মাস্তুরাত জামাতে গিয়েছিলেন এবং আজ ফজরের পর রিকশায় করে বাসায় ফিরেছেন।
আম্মুর সঙ্গে কথা শেষ করে ফোন রেখে আবারও কম্পিউটার স্ক্রিনে চোখ রাখলাম। ঘড়িতে তখন সকাল সাড়ে এগারোটা। হঠাৎ দেখি ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে গেছে! মোবাইল ইন্টারনেট তো আগেই বন্ধ ছিল, এবার ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটও পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হলো। অজানা আশঙ্কায় বুক কেঁপে উঠল—তাহলে কি আরও কোনো নিষ্ঠুর গণহত্যা সংঘটিত হতে যাচ্ছে? শেখ হাসিনা তো নিশ্চিত সেটাই করবে। বিগত কয়েক দিনে তার নাম হয়ে গেছে ‘খুনি হাসিনা’, ঠান্ডা মাথার এক খুনি। বিশাল এক খুনপিয়াসি ছাত্রলীগ বাহিনী পেয়েছে সে, যারা মাত্র এক প্যাকেট বিরিয়ানির লোভে মানুষ হত্যা করে বেড়াচ্ছে।
বেলা ১টা ২০ মিনিটের দিকে জোহরের নামাজের জন্য যখন কম্পিউটার বন্ধ করতে যাচ্ছি, তখন দেখলাম ইন্টারনেট ফিরে এসেছে। তটস্থ হয়ে ফেসবুকে ঢুকলাম এবং দেখলাম একটি খবর ভেসে বেড়াচ্ছে— দুপুর দুইটায় সেনাপ্রধান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন, সে পর্যন্ত সবাইকে ধৈর্য ধরতে বলা হয়েছে। বুঝতে বাকি রইল না যে বড় কিছু ঘটেছে বা ঘটতে যাচ্ছে। মনের ভেতর একটা চোরাগোপ্তা আলো ঝিলিক দিয়ে গেল, কিন্তু পরিষ্কার বক্তব্য না আসা পর্যন্ত স্থির হতে পারছি না। কেউ কেউ বলছেন, সেনাপ্রধানের বক্তব্য শোনার জন্যই ইন্টারনেট ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। যাইহোক, মনের ভেতর তখন চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে।
যত সময় গড়াচ্ছে, চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসছে। ঠিক তখন স্ক্রীনে একটা খবর ভেসে উঠল—দুই ঘণ্টা ইন্টারনেট ব্লকআউটের সময়ে গণভবন থেকে পাঁচটা গাড়ি বেরিয়ে যেতে দেখা গেছে। সম্ভবত শেখ হাসিনা গণভবন ত্যাগ করেছেন। আরেকটা ভিডিও ভাইরাল হলো, যেখানে গণভবন থেকে একটা আর্মির হেলিকপ্টার উড়ে যেতে দেখা যাচ্ছে। অনেক দূরের একটা বহুতল ভবনের বারান্দা থেকে জুম করে ভিডিওটি করা হয়েছে। আরেকটা হোয়াটসঅ্যাপ স্ক্রিনশট সামনে এল, যেখানে লেখা—‘BAF helicopter Tail num 7682 is ready for giving Safe to PM’। অর্থাৎ, ‘প্রধানমন্ত্রীর নিরাপদ প্রস্থানের জন্য বিমানবাহিনীর ৭৬৮২ নম্বর হেলিকপ্টারটি প্রস্তুত।’ ব্রাভো, ব্রাভো!
এই উত্তেজনায় রুমে স্থির হয়ে বসে থাকতে পারছি না। একবার রিডিংরুমে বসি, আরেকবার খাটে যাই; একবার ফাতিমার সাথে আপডেট শেয়ার করি, একবার হাঁটি, আবার বসি। কিছুতেই স্থির হতে পারছি না। জোহরের নামাজ, দুপুরের খাবার সব ভুলে নিউজফীডে চোখ রাখছি, কখন দুপুর ২টা বাজবে এবং আর্মি চিফ কী বলবেন সেটা শোনার জন্য। কিন্তু বেলা ২টা পার হয়ে গেলেও দেখি আর্মি চীফের কোনো খবর নেই। দেশে ঘোষিত কারফিউ চলছে, কিন্তু কার্যত কারফিউ বলে আর কিছু নেই; পুরো ঢাকার সব রাস্তায় লাখো লাখো মানুষের ঢল নেমেছে।
দলে দলে মানুষ শাহবাগ ছেড়ে গণভবনের অভিমুখে ছুটে চলেছে। স্বপ্নের মতো লাগছে, কিন্তু কোনো মহল থেকেই পরিষ্কার কোনো খবর পাচ্ছি না। উত্তেজনায় ও অস্থিরতায় কী করব বুঝতে পারছি না; গোসল, খাবার, নামাজ কিছুই হয়নি। অফিসে কীভাবে যাব, ভাবছি। অফিসের এডমিনকে ফোন দিলাম, সে জানাল যে অফিসের গাড়ি যাত্রাবাড়ী থেকেই এখনো বাংলামোটর ফিরে আসতে পারেনি, মোহাম্মদপুর কখন আসবে ঠিক নেই। তাহলে কি একাই বের হয়ে যাব?
বিদ্যুতগতিতে চেয়ার থেকে উঠে মুহূর্তের মধ্যে গোসল-নামাজ-খাবার সেরে তিনটার দিকে ফেসবুকে ঢুকে দেখি লাইভ চলছে—ছাত্র-জনতা গণভবনে ঢুকে পড়েছে! শুধু তা-ই নয়, গণভবনের ড্রয়িংরুমে শত শত কর্মচারীর জন্য রান্না করা মোরগ-পোলাও, বিরিয়ানি ও গোশত-ভাত খাচ্ছে গণভবন দখলে নেওয়া সাধারণ জনতা। মুরগির রানে কামড় দিয়ে মানুষ ফেসবুকে ছবি দিচ্ছে। এ কি স্বপ্ন না বাস্তব—কী চলছে পৃথিবীতে? বুকের ভেতরে যেন বিদ্যুতের শিহরণ ছড়িয়ে পড়ল।
অফিসের গাড়ি আসার কোনো খবর নেই। নিজের মতো করেই বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। অফিসের সহকর্মী রিডিং সেকশনের আল-আমিন ভাই আমার প্রতিবেশী। সোয়া তিনটার দিকে আল-আমিন ভাইকে ফোন দিয়ে বের হয়ে গেলাম। তিনি ঢাকা উদ্যান কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনে আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। রাস্তায় নেমে দেখি, মানুষ আনন্দমিছিল করে ছুটে চলেছে। বাসার কাছেই দেখলাম একটা বড় ট্রাক গণভবনের দিকে যাচ্ছে, আর স্থানীয় কিছু মানুষ ট্রাকের ছাদে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিচ্ছে। আমিও লাফিয়ে ট্রাকে উঠে গেলাম এবং আল-আমিন ভাইকে ফোনে ট্রাকে উঠে পড়তে বললাম। অল্প সময়েই ট্রাকটি লোকে লোকারণ্য হয়ে গেল। পুরো রাস্তায় মানুষের ঢল নেমেছে। সবাই গণভবনের অভিমুখে মিছিল করে ছুটে যাচ্ছে। সবার মুখে এক স্লোগান—‘হৈ-হৈ রৈ-রৈ, খুনি হাসিনা গেলি কৈ’, ‘ছি-ছি হাসিনা, লজ্জায় বাঁচি না’, ‘পালাইছে রে পালাইছে, খুনি হাসিনা পালাইছে’।
ট্রাকের ভেতরে এবং বাইরে রাস্তার দুপাশের মানুষের মুখে মুখে এমন নানা স্লোগান ধ্বনিত হচ্ছে। আমিও টুপি খুলে পকেটে পুরে ট্রাকের ছাদে দাঁড়িয়ে স্লোগান দেওয়া শুরু করলাম। স্লোগানে স্লোগানে গলা ভেঙে ফেললাম। ঢাকা উদ্যান থেকে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত এইটুকু পথ মানুষের ভিড় ঠেলে যেতে বিশ মিনিটের বেশি সময় লাগল। পুরো রাস্তায় লক্ষ লক্ষ মানুষ। আসাদ গেটে গিয়ে দেখি, আর ট্রাকে যাওয়া সম্ভব নয়।
মানুষের বাঁধভাঙা ঢলের কারণে হেঁটে চলা মানুষই ঠিকমতো হাঁটতে পারছে না। আসাদ গেটের তিন রাস্তার মোড়ে ট্রাকের ছাদে দাঁড়িয়ে দেখলাম, বামের মোহাম্মদপুর পর্যন্ত পুরো রাস্তা, পেছনের ধানমন্ডির দিক এবং সামনের মিরপুরের দিক—সব দিকেই শুধু বিশাল জনসমুদ্র। ঢাকার বুকে এর আগে কখনো এত বিশাল জনসমুদ্র দেখিনি। এই বিশাল জনতার ভিড় ঠেলে ট্রাকটি অত্যন্ত ধীরগতিতে এগোতে লাগল। পুরো পথ আমি ভিডিও করলাম। এরপর আল-আমিন ভাইকে বলে ট্রাক থেকে নেমে গেলাম।
অল্প কয়েক মিনিট হাঁটলেই গণভবনের প্রবেশপথ। কাছে গিয়ে দেখি, একদিকে বন্যার জলের মতো স্রোত ভেতরে প্রবেশ করছে, আর অন্যদিকে অসংখ্য মানুষ বের হয়ে আসছে। প্রায় সবার হাতেই গণভবনের জিনিসপত্র! যেন গণিমতের মালের মতো যে যা পারছে স্মৃতি হিসেবে নিয়ে আসছে। শেখ হাসিনার ব্যবহৃত আসবাবপত্র, শাড়ি-ব্লাউজ, বালিশ, তোষক, কম্বল, চাদর, খাট, চেয়ার, টেবিল, ফ্রিজ, আলমারি, ড্রেসিং টেবিল, প্লেট, জগ-গ্লাস, আচারের বয়াম, ফ্রিজের বিশাল বিশাল মাছ, গরু-ছাগলের আস্ত রান, শাকসবজি, হাঁস-মুরগি; এমনকি এসি, ফ্যান, লাইট, বেসিন ও পানির কল খুলে নিয়ে আসছে মানুষ। এমনকি বাসার ছাদে থাকা বিশাল প্লাস্টিকের পানির ট্যাংকিও গড়িয়ে গড়িয়ে নিয়ে যেতে দেখা গেল! কেউ কেউ নিয়ে যাচ্ছে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মনিটর, পিসি আরও কত কী! গণভবনে শেখ হাসিনা যেসব গাছ লাগিয়েছিলেন, মানুষ সেই গাছগুলো পর্যন্ত শেকড়সমেত তুলে নিয়ে যাচ্ছে। সবার মুখে বিজয়ের হাসি।
ইচ্ছে হয়েছিল একদম ভেতরে গিয়ে সব দেখে আসি, কিন্তু কিছু দূর যাওয়ার পর আল-আমিন ভাই ফেরার পথ ধরলেন। বাঁধভাঙা প্লাবনের মতো সেই জনস্রোত ঠেলে আমরা গণভবন থেকে বের হয়ে সংসদ ভবনের রাস্তায় এলাম। দেখি, সংসদ ভবনের ভেতরেও মানুষ ঢুকে পড়েছে! সেখানেও একই রকম বাঁধভাঙা গণজোয়ার। এত বছর ধরে সাধারণ মানুষকে সংসদে ঢুকতে দেওয়া হয়নি, আজ সুযোগ পেয়ে সবাই ঢুকছে। ছোটবেলায় তো আমরা নিয়মিতই এখানে ঢুকতাম, এত বছর পর সুযোগ পেয়ে আমরাও ভেতরে প্রবেশ করলাম। ভেতরে গিয়ে ছবি ও ভিডিও নিলাম।
ভবনের একদম ছাদে উঠে মানুষ জাতীয় পতাকা ওড়াচ্ছে, সংসদের লেকে নেমে অনেকে গোসল করছে ও সাঁতার কাটছে। নিচের দুটো প্রবেশপথে পিঁপড়ার লাইনের মতো মানুষের ঢল, আর নিচের বারান্দায় চলছে গণলুট। হঠাৎ দেখি আমাদের কাফরুলের কামরুল হিদায়াত! ছেলেটা সেই শেওড়াপাড়া থেকে হেঁটে এতদূর চলে এসেছে। ওর সঙ্গেও কিছু ছবি তুললাম। ঘড়িতে তখন সাড়ে পাঁচটা বাজে, এবার অফিসের দিকে ফিরতে হবে। বিজয়ের স্মৃতি হিসেবে বাসার জন্য সংসদের ফুলবাগান থেকে কিছু ফুল ছিঁড়ে নিলাম।
জনস্রোত ঠেলে অনেক কষ্টে সংসদ ভবন থেকে বের হয়ে সামনের রাস্তা দিয়ে ফার্মগেটে এসে পৌঁছলাম। সেখানে দ্বিমুখী জনস্রোত— একটা স্রোত শাহবাগ থেকে সংসদ ভবন ও গণভবনের দিকে যাচ্ছে, আরেকটা স্রোত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দিকে যাচ্ছে, আর আমাদের মতো ক্ষীণ একটি স্রোত শাহবাগের দিকে ফিরছে। পুরো পথ হেঁটে মনে হলো, আজ সমগ্র বাংলাদেশের মানুষ একটি বিজয়ের আনন্দ ও স্বাদ উপভোগ করছে।
এক ভয়াবহ কেয়ামত-সদৃশ পরিস্থিতি পেরিয়ে অর্জিত হয়েছে এই বিজয়ের নেয়ামত। ১৯৭১ সালের বিজয়ের দিন মানুষ যেমন স্বাধীনতার আনন্দ উদ্যাপন করেছিল, দীর্ঘ ৫৩ বছর পর দ্বিতীয়বারের মতো সমগ্র জাতি আরেকটি জাতীয় উৎসব উদ্যাপন করছে। ছেলে-মেয়ে, যুবক-যুবতী, পুরুষ-নারী সবার মুখেই আজ বিজয়ের হাসি। মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটেও কারো মুখে নেই ক্লান্তি। চেপে রাখা বিজয়ের আনন্দ হঠাৎ অপ্রত্যাশিতভাবে পেয়ে সবাই যেন স্বপ্ন ভেঙে জেগে উঠেছে। সবাই বিশ্বাস করতে চাইছে যে এই স্বাধীনতা কোনো স্বপ্ন নয়, বাস্তবেই আমরা তা উদ্যাপন করছি, আলহামদুলিল্লাহ!
আমরা হাঁটতে হাঁটতে ফার্মগেট পেরিয়ে কারওয়ান বাজারে গেলাম। একটু পর এক-দুইটা আর্মির গাড়ি যাওয়ার সময় জনগণ উল্লাস করে তাদের স্বাগত জানাচ্ছে এবং তাদের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছে। কারওয়ান বাজারের সার্ক ফোয়ারার চূড়ায় উঠে একজন জাতীয় পতাকা দোলাচ্ছেন, আর নিচে সমস্বরে কিছু মানুষ শেখ হাসিনার নিন্দা জানিয়ে স্বাধীনতার আনন্দ প্রকাশ করছে।
এরপর বাংলামোটরে নাসির ট্রেড সেন্টারের কাছে গিয়ে দেখি এক ভিন্নরকম পরিস্থিতি। ১৬ তলা নাসির টাওয়ারের ৫ম তলায় আমাদের ‘সময়ের আলো’ পত্রিকার অফিস এবং ১১ তলায় ‘সময় টিভি’র অফিস। আন্দোলন চলাকালে সময় টিভি শেখ হাসিনার পক্ষ নিয়েছিল এবং শিক্ষার্থীদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। এমনকি এক রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের হামলা চলাকালে সময় টিভির এক সাংবাদিক শিক্ষার্থীদের দিকে তাকিয়ে এক পুলিশকে বলেছিলেন, ‘ভাই ওই যে, আপনি ধীরে-সুস্থে একটা শুট করেন, আমি একটা শট নিই’।
এতে সবাই ভীষণ ক্ষুব্ধ। এখন বিক্ষুব্ধ জনতা সময় টিভি ভবনে আগুন দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই পরিস্থিতি চলছে ৭১ টিভি, ডিবিসি টিভিসহ প্রায় আটটা টিভি কার্যালয়ে। সঙ্গত কারণেই বিক্ষুব্ধ জনতা আমাদের পুরো ভবনটি অবরোধ করে রেখেছে এবং যেকোনো মুহূর্তে তাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হতে পারে। আসার পথে দেখলাম, ওয়াসা ভবন এবং সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন একটা ভবনেও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে; দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুনের কুণ্ডলী।
আমাদের অফিসের সহকর্মীরা আমজাদ হোটেলের সামনের পার্কিংয়ে দাঁড়িয়ে ও বসে গল্প করছিলেন। নিপু বড়ুয়া ভাই বলছিলেন, বেকুব মানুষের দল তো স্বাধীনতার আনন্দে বিভোর, কিন্তু কয়েক দিন পর দেশে যে অভাব দেখা দেবে, তখন তো সবাই কাঁদবে’। আমাদের অফিসের ভবিষ্যৎ কী হবে, সেটা নিয়েও তিনি শঙ্কা প্রকাশ করলেন; বেতন বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিতে পারে। আলমগীর রেজা চৌধুরী ভাই এই লুটপাট দেখে ভীষণ নাখোশ ও বিরক্ত। আমাদের সামনে দিয়েই লোকজন গণভবন থেকে লুট করা জিনিসপত্র নিয়ে যাচ্ছে কুরবানির হাট থেকে গরু কিনে নিয়ে যাওয়ার মতো করে; আর আশপাশের মানুষ কৌতূহলী হয়ে তাদের কুরবানির গরুর দাম জিজ্ঞাসা করার মতো করে বলছে, ‘ভাই, জিতসেন? ভাই, জিতসেন?’
আমি হাতিরপুরের ঢালে বাইতুল মোবারক মসজিদে মাগরিবের নামাজ পড়ে সামনের দোকান থেকে একটা হাঁসের ডিম ও পানি খেয়ে নিলাম, কারণ গলা শুকিয়ে গিয়েছিল। এরপর অফিসের আইটি ইঞ্জিনিয়ার অপু ভাইয়ের সাথে মার্কেটের সামনের চত্বরে দুটি প্লাস্টিকের চেয়ার নিয়ে বসে গল্প করলাম। অপু ভাইকে বললাম, ‘কখন কী হয়ে যায় বলা যায় না, অফিস বন্ধ হয়ে যেতে পারে কিংবা আগুন ধরিয়ে দিতে পারে। আমার পাঁচ বছরের কাজের ডকুমেন্টগুলো সংরক্ষণ করা দরকার। কেমন পেনড্রাইভ কিনলে ভালো হবে?’ অপু ভাই পরামর্শ দিলেন পেনড্রাইভে সমস্যা হতে পারে, তার চেয়ে ডিভিডি কিনে সেখানে সংরক্ষণ করা নিরাপদ, তবে পেনড্রাইভেও রাখা যেতে পারে।
কমলেশ দাদাকে ফোন দিয়ে আজকের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত জানতে চাইলে তিনি বলেন, তারা মিটিং করে জানাবেন। দাদা সবাইকে আপাতত অফিসের আশপাশে থাকতে বলেছেন, কারণ পত্রিকা যেকোনো মূল্যে বের করতেই হবে; আজকে পত্রিকা বের না করলে প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখা যাবে না। আজকের দিনটা আমাদের জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। আমি তো ভেবেছিলাম দ্রুত কাজ সেরে সন্ধ্যার আগেই বাসায় ফিরব, কিন্তু সময় টিভির এই ঝামেলার কারণে মনে হচ্ছে আজ বাসায় ফিরতেও বেশ রাত হবে।
মাগরিবের নামাজের পর আমজাদ হোটেলের বিপরীতে গণকণ্ঠ পত্রিকা অফিসের সামনে আইল্যান্ডে বসলাম। মোরশেদ ভাই ও আরও কয়েকজন একসঙ্গে বসে দীর্ঘ আড্ডা দিলাম। আলাপ হলো দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও খুনি হাসিনার পলায়ন নিয়ে। মোরশেদ ভাই কিছু সোর্স থেকে আজকের গণভবনের ভেতরের খবর জেনেছেন। তিনি বললেন, হাসিনার পদত্যাগের মূল ক্রেডিট আর্মি চীফের। তিনি আজকের পরিস্থিতি বুঝতে পেরে অল্প সময়ের মধ্যেই কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন এবং তা হাসিনাকে স্ট্রেইট ভাষায় জানিয়ে দেন। সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১০টার দিকে হাসিনা তিন বাহিনীর প্রধান ও পুলিশ প্রধানকে গণভবনে তলব করেছিলেন। বাহিনী প্রধানদের তিনি খুব শাসনের সুরে হুকুম করতে থাকেন। তারপর সন্ত্রাসী ও দুষ্কৃতকারীরা কেন পুলিশের গাড়িতে উঠছে, রঙের স্প্রে করছে, এত সাহস তারা কোথায় পাচ্ছে এবং কেন তাদের গুলি করে মেরে ফেলা হচ্ছে না—এসব নিয়ে ক্ষোভ ঝাড়েন। হাসিনা আরও বলেন যে, অনেক বিশ্বাস করে তোমাদেরকে বাহিনী প্রধান বানিছিলাম।
এ সময় পুলিশ প্রধানের দিকে ইঙ্গিত করে আর্মি চীফকে বলেন, ‘ওর বাহিনী তো বেশ ভালো পারফর্ম করছে, আর্মি ব্যর্থ হচ্ছে কেন?’ তখন পুলিশ প্রধান জানান যে, আসলে পরিস্থিতি এখন তারও নিয়ন্ত্রণে নেই। আর আর্মি চীফ সাফ জানিয়ে দেন, ‘পুরো দেশের মানুষ নেমে আসছে, এত মানুষকে হত্যার দায় আমি নিতে পারব না, আমি আপনাকে স্টেপ-ডাউনের পরামর্শ দিচ্ছি; এবং সেটা এই মুহূর্তেই।’ শেখ হাসিনা তবুও জোরপূর্বক আন্দোলন দমন করার নির্দেশ দেন। তখন সেনাপ্রধান পাশের রুমে শেখ রেহানাকে ডেকে নেন এবং বোনকে পরিস্থিতি বুঝিয়ে বলতে বলেন। পরিস্থিতি যে আসলেই বেশামাল, সেটা শেখ হাসিনা তখনও বিশ্বাস করতে চাইছিলেন না। পরে বোন শেখ রেহানা ফিরে এসে শেখ হাসিনাকে রিয়েলিটি মাইনে নিতে বলেন। হাসিনার জেদ কিছুটা কমে। তারপর তিনি তার প্রবাসী পুত্র জয়ের সাথে ফোনে কথা বলেন। জয়ও তার মাকে সেফ এক্সিটের পরামর্শ দেন।
অবশেষে শেখ হাসিনা পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। গণভবন থেকে বের হওয়ার সময় তিনি জাতির উদ্দেশে একটি ভাষণ রেকর্ড করতে চান। কিন্তু সেনাপ্রধান তখন ঘড়ি দেখে বলেন, ‘শাহবাগ থেকে গণভবন পর্যন্ত ৪৫ মিনিটের হাঁটা পথ; আমি আপনাকে আর ৪৫ মিনিট নিরাপত্তা দিতে পারব। শাহবাগের গণজোয়ার গণভবনের দিকে আসতে ঠিক এই সময়টুকুই লাগবে। আপনি এই সময়ের মধ্যে স্টেপ-ডাউন করে দেশ ছেড়ে চলে যাবেন।’ তখন ঘড়িতে বাজে বেলা সাড়ে ১২টা। খুনি হাসিনা বাধ্য হয়ে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। এর কিছুক্ষণ আগেও তিনি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে, ব্যাপক রক্তপাত ঘটিয়ে হলেও তিনি ক্ষমতার চেয়ারে বসে থাকবেন। বেচারি হতাশ হয়ে দ্রুত একটি স্যুটকেস নিয়ে বেরিয়ে পড়েন এবং গণভবনে পার্ক করে রাখা হেলিকপ্টারে গিয়ে ওঠেন—সঙ্গী হন শেখ রেহানা ও সালমান এফ রহমান। কাছাকাছি পুরোনো বিমানবন্দরে হেলিকপ্টারটি যাত্রাবিরতি করে বাকি লাগেজপত্র তুলে নেয়।
এরপর হেলিকপ্টারটি বঙ্গভবনের উদ্দেশ্যে উড়ে যায়, যেখানে রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে তিনি বিদায়ী স্বাক্ষর করেন। এরপর ঠিক আড়াইটায় হেলিকপ্টারটি উড়াল দেয় ভারতের উদ্দেশ্যে। জানা যায়, প্রথমে হাসিনাকে কলকাতায় অবতরণ করতে নিষেধ করা হয়; কলকাতায় যেতে না পেরে ত্রিপুরার আগরতলায় বিএএফের কোয়ার্টারে ল্যান্ড করে। সেখানে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর আরেকটা বিমান প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। বিকেল সাড়ে চারটায় সেখান থেকে বিমানে যাত্রা করেন এবং সাড়ে পাঁচটার দিকে দিল্লির কাছাকাছি হিন্দোল নদীর তীরে ভারতীয় বিমানবাহিনীর রানওয়েতে অবতরণ করেন।
আমার মনে পড়ে গেল, বিকেল সাড়ে চারটা থেকে পাঁচটার সময়টায় আমি সংসদ ভবনের মাঠে দাঁড়িয়ে ছিলাম। মাঠে ও সংসদ চত্বরে তখন হাজারো মানুষ। উড়ে যাওয়া বিমানের দিকে লক্ষ্য করে সবাই সমস্বরে বলে উঠেছিল, ‘এই বিমানেই খুনি হাসিনা পালিয়ে যাচ্ছে!’ লোকজন আরও নানা স্লোগান দিতে থাকে। আমারও তাই মনে হয়েছিল, কারণ প্রায় দুই-তিন সপ্তাহ ধরে বাংলাদেশের আকাশে কোনো বিমান উড়ছে না এবং বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থবির হয়ে আছে। আমি সেই উড়ে যাওয়া বিমানের পুরো দৃশ্য ভিডিও করেছি। ভারত থেকে তিনি এখন লন্ডনে যাবেন এবং সেখানে টিউলিপ সিদ্দিকীর কাছে গিয়ে উঠবেন। পুরো ঘটনাটি এখনো মনে হচ্ছে অবিশ্বাস্য, চাঞ্চল্যকর এবং অভাবিতপূর্ব। নিশ্চিতভাবেই এটা আমাদের দেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা।
এরকম নানা বিষয়ে গল্প করতে করতে ঘড়িতে বাজল রাত আটটা। আমরা অফিসের সহকর্মীরা সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আইল্যান্ডের ওপর বসে আছি। তখন আমাদের অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে ফোন এল। জানানো হলো, আজ যেহেতু অফিসে প্রবেশ করা যাবে না, তাই তেজগাঁওয়ে প্রেসে গিয়ে ছোট একটি টিম কাজ করবে; কোনোমতে ছবি-টবি দিয়ে পত্রিকাটা রানিং রাখতে হবে, আর বাকিরা চলে যেতে পারে। অবশেষে আমি, মোরশেদ ভাই এবং আল-আমিন ভাই একসাথে মোহাম্মদপুরের দিকে রওনা হলাম।
রাস্তায় আজ কোনো গাড়ি নেই, অল্প কিছু রিকশা চলছে, আর বাকি সব মানুষ হেঁটে বাড়ি ফিরছে। আমরাও হাঁটতে শুরু করলাম সদ্য স্বাধীন হওয়া এই রাষ্ট্রের রাজপথ ধরে। হাঁটতে হাঁটতে ও গল্প করতে করতে আমরা ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর রোডের শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ির সামনে গিয়ে পৌঁছলাম। গিয়ে দেখি, পুরো বাড়িটি বিধ্বস্ত এবং ভেতরে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। পুরো রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলো নেভানো, চারদিকে এক ভূতুড়ে অন্ধকার। কেবল সেই অন্ধকারের মধ্যে লাল লেলিহান শিখা কিছুটা আলো ছড়াচ্ছে, আর সেই আলোতেই চলছে লুটপাট। দিনভর মানুষ ভেতরের জিনিসপত্র নিয়ে গেছে, আর এখন নিয়ে যাচ্ছে রড, সিমেন্ট ইত্যাদি। এখানে শেখ মুজিবের বাড়িসহ মোট পাঁচটি বাড়ি আছে, যেগুলো শেখ মুজিবের আত্মীয়-স্বজন পরবর্তীতে দখল করেছিল, সেগুলোতেও আগুনের কুণ্ডুলি জ্বলছে।
এই বাড়ির সামনে দিয়ে কত যাতায়াত করেছি! রাস্তার দুই পাশে থাকত সশস্ত্র পুলিশের পাহারা। সপ্তাহের দুই দিন অফিস থেকে ইরানি কালচার সেন্টারে ফারসি শিখতে যেতাম, এই বাড়ির সামনে দিয়েই যাতায়াত করতাম। তখন মানুষ এই সড়ক দিয়ে চলতে কত ভয় পেত, যদিও আমি নির্ভয়ে হেঁটে পার হতাম। অথচ আজ সেটা এক বিধ্বস্ত ও পোড়া বাড়ি। কত নির্মম ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই বাড়ি! আমার প্রায়ই মনে হতো, শেখ মুজিবের নাম ও প্রতীকের আশ্রয়ে আওয়ামী লীগ যে দানবীয় শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছিল এবং নিষ্ঠুর ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল, সেই কাঠামোর পতন ঘটাতে হলে এই প্রতীকগুলোর বিলুপ্তিও জরুরি ছিল।
আমরা তিনজন হাঁটতে হাঁটতে ধানমণ্ডি ২৭ নম্বর মেইন রোডে এসে উঠলাম। সেখান থেকে একটা অটোরিকশায় চড়ে চলে এলাম মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ মোড়ে। মোরশেদ ভাই বাসার জন্য আনন্দের মিষ্টি কিনতে ঢুকলেন একটা দোকানে। আমিও ঢাকা উদ্যানে নেমে মিষ্টির দোকান তালাশ করলাম। ফাতিমা ফোন করে জানালে, নুরজাহানের মিষ্টি বিকালেই শেষ হয়ে গেছে। পরে খুঁজে খুঁজে ‘মিঠাই’ নামের একটা মিষ্টির দোকান পেলাম; যদিও ভালো মিষ্টিগুলো আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল, তবে সাড়ে চারশো টাকা কেজি দরে এক কেজি গুড়ের মিষ্টি পছন্দ করে কিনলাম; এক কেজিতে ১২ পিস। আজ যেন বিজয়ের আনন্দে সবাই মিষ্টি কিনছে! ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিব নিহত হওয়ার খবর শুনেও ঢাকার মানুষ এমনিভাবে উল্লাসে ফেটে পড়েছিল এবং মুহূর্তেই মিষ্টির দোকানগুলোর সব মিষ্টি ফুরিয়ে গিয়েছিল। দীর্ঘ ৪৯ বছর পর আজ ঠিক যেন সেই ঘটনারই এক ঐতিহাসিক পুনরাবৃত্তি ঘটল।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
সময়ের আলো/কেএইচও