বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক পরিবর্তনের দিন। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় সেদিন রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসনব্যবস্থার অবসান ঘটে। জন্ম নেয় রাষ্ট্র পুনর্গঠনের এক নতুন প্রত্যাশা।
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন দমন-পীড়নের মুখে বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়। সেই আন্দোলন চাকরিতে বৈষম্য দূর করার দাবির সীমানায় আটকে থাকেনি। ছাত্র-জনতার মধ্যে তৈরি হয় বৈষম্যবিরোধী রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষা।
অভ্যুত্থানের পর গত দুই বছরে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান। রাজনৈতিক পরিসরে তুলনামূলক উন্মুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। নাগরিকদের মতপ্রকাশের ক্ষেত্র আগের তুলনায় প্রসারিত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, পুলিশ প্রশাসন ও জনপ্রশাসনের সংস্কার নিয়ে আলোচনা অব্যাহত আছে। নাগরিক সমাজ বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের বিষয়ে আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। কেবল নির্বাচনে ভোট দিয়েই তরুণ প্রজন্ম দায়িত্ব সারছে না, রাষ্ট্র পরিচালনার কাজের জবাবদিহিও চাইছে। গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় এটা একটা ইতিবাচক পরিবর্তন।
তবে একই সঙ্গে এ কথাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, জনগণের প্রত্যাশার বড় একটি অংশ এখনও অপূর্ণ। মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। বাজারে সিন্ডিকেটের প্রভাব, দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক অদক্ষতা পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা যায়নি।
জুলাই-আগস্টের সহিংসতার বিচারপ্রক্রিয়া ধীরগতিতে এগোচ্ছে বলে অভিযোগ আছে। পাঁচ আগস্টের পর আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার উদ্বেগজনক প্রবণতা দেখা দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মব কালচারের মতো প্রবণতা আইনের শাসনের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। এ কথা বলা যায় না যে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর মব কালচার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে যে, গণতন্ত্রের ধারণা কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কার্যকর ও শক্তিশালী গণতন্ত্রের জন্য আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, সব ধরনের বৈষম্যের অবসান ঘটানোও জরুরি।
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে রাষ্ট্র থেকে সব ধরনের বৈষম্যের অবসান ঘটানোর দৃঢ় অঙ্গীকার করা হয়েছিল। সেই অঙ্গীকারকে বাস্তব রূপ দেওয়ার দায়িত্ব সবার। রাষ্ট্রের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়ন করা। নির্বাচন, বিচার, পুলিশ বাহিনী, জনপ্রশাসন এবং দুর্নীতি দমন ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোকে উপলব্ধি করতে হবে যে, রাষ্ট্র সংস্কার কোনো একক সরকারের প্রকল্প নয়, এটি জাতীয় ঐকমত্যের বিষয়।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বাজারব্যবস্থায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা করাও সমান জরুরি। এগুলো ছাড়া গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে পৌঁছাবে না। মানবাধিকার সুরক্ষা, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা এবং আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীন ও শক্তিশালী হলে কর্তৃত্ববাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারে না।
গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হচ্ছে- জনগণের রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক মুক্তি এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে উপেক্ষা করে কোনো সরকার দীর্ঘমেয়াদে টিকতে পারে না। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করলে একসময় সেই প্রতিষ্ঠান জনআস্থা হারায়, রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে পড়ে। কেবল রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তনের মধ্যে পাঁচ আগস্টের ঐতিহাসিক তাৎপর্য সীমাবদ্ধ নয়। গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক এবং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে ওঠার মধ্যেই গণঅভ্যুত্থানের সার্থকতা নিহিত আছে। আজকের দিনে আমরা আশা করি, বাংলাদেশ এমন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হবে, যেখানে আর কোনো সরকার কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠার সুযোগ পাবে না।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি