বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলন দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারারই অংশ, যেখানে নতুন প্রজন্ম কেবল একটি তাৎক্ষণিক দাবির জন্য নয়, বরং রাষ্ট্র ও সমাজের চরিত্র নিয়ে একটি বৃহত্তর প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। সে কারণেই জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের তাৎপর্য কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ নিয়ে জনগণের নতুন আকাক্সক্ষা এবং বিশেষত তরুণ প্রজন্মের ঐতিহাসিক আত্মপ্রকাশের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
আমাদের জাতীয় জীবনের প্রায় প্রতিটি যুগান্তকারী অধ্যায়ের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল তরুণদের সাহস, স্বপ্ন এবং আত্মত্যাগ। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের মুখেও তরুণ ছাত্রসমাজ মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছে। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে তারুণ্যের নেতৃত্বেই স্বৈরশাসনের ভিত কেঁপে উঠেছিল। ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অসংখ্য তরুণ অস্ত্র হাতে নিয়ে স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রেখেছিল।
১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও ছাত্রসমাজ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। একই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনও প্রমাণ করেছে যে বাংলাদেশের ইতিহাসে পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী চালিকাশক্তি এখনও তরুণ প্রজন্ম। যুগ বদলেছে, প্রেক্ষাপট বদলেছে, কিন্তু ন্যায়, মর্যাদা এবং অধিকারের প্রশ্নে তারুণ্যের ঐতিহাসিক ভূমিকা অপরিবর্তিত রয়েছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৭১, ১৯৯০ কিংবা ২০২৪ বাংলাদেশের ইতিহাসে ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায় হলেও একই জাতীয় অভিযাত্রার গতিধারায় ভিন্ন ভিন্ন মাইলফলক। একটির গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্যটির গুরুত্ব খাটো করার চেষ্টা যেমন ইতিহাসবিরোধী, তেমনি একটি অর্জনকে অন্য অর্জনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করানোও জাতির জন্য ক্ষতিকর। ইতিহাসের প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে তার ধারাবাহিকতার মধ্যে। যে জাতি তার অতীতের বিভিন্ন সংগ্রামকে পরস্পরবিরোধী নয়, বরং পরস্পর-সম্পূরক হিসেবে দেখতে শেখে, সেই জাতিই ভবিষ্যতের জন্য একটি সুদৃঢ় ভিত্তি নির্মাণ করতে সক্ষম হয়।
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এই উপলব্ধি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক তাৎপর্যও ঠিক এই বৃহত্তর ধারাবাহিকতার মধ্যেই নিহিত। দুর্ভাগ্যজনকভাবে রাজনৈতিক স্বার্থে একদেশদর্শিতার ফলে বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চার স্বাভাবিক ও বহুমাত্রিক বিকাশ দীর্ঘদিন ধরে ব্যাহত হয়েছে। ইতিহাস নিয়ে মুক্ত গবেষণা, যুক্তিনির্ভর বিতর্ক এবং সমালোচনামূলক আলোচনা উৎসাহিত হওয়ার পরিবর্তে অনেক সময় তা রাজনৈতিক আনুগত্যের পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। ফলে ইতিহাসের নানা স্তর, নানা অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন প্রজন্মের অবদানকে সমন্বিতভাবে মূল্যায়নের পরিবর্তে একরৈখিক ব্যাখ্যার প্রবণতা শক্তিশালী হয়েছে।
ইতিহাসের রাজনীতিকীকরণ ও ইতিহাসকে প্রতীকী পুঁজি হিসেবে ব্যবহারের ফলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে জাতীয় ঐক্য, সামাজিক সংহতি এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির। কারণ ইতিহাস যখন সমগ্র জাতির অভিন্ন উত্তরাধিকার না হয়ে কোনো বিশেষ রাজনৈতিক শক্তির দলীয় সম্পদে পরিণত হয়, তখন নাগরিকদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ে, পারস্পরিক আস্থা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হতে থাকে। ইতিহাসের মূল কাজ হওয়া উচিত জাতিকে সংযুক্ত করা; কিন্তু যখন ইতিহাসকে বিভাজনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন তা উল্টো জাতিকে বিভাজিত করে।
এই বাস্তবতাকে বোঝার জন্য ‘স্মৃতির রাজনীতি’ (পলিটিক্স অব মেমোরি)-এর ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা যায়, ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীগুলো প্রায়ই অতীতের নির্দিষ্ট ঘটনাকে নিজেদের রাজনৈতিক বৈধতার প্রধান উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে। ফলে ইতিহাসের কিছু অংশ অতিরঞ্জিতভাবে সামনে আসে, আবার কিছু অংশ আড়ালে চলে যায়।
জাতীয় স্মৃতিকে তখন একটি জীবন্ত ও বহুমাত্রিক উত্তরাধিকার হিসেবে নয়, বরং ক্ষমতা রক্ষার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাতেও দীর্ঘদিন ধরে এই প্রবণতার বিভিন্ন প্রকাশ দেখা গেছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস, যা সমগ্র জাতির সম্মিলিত আত্মত্যাগের ফসল, তাকে অনেক সময় এমনভাবে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে যেন তার ব্যাখ্যা দেওয়ার নৈতিক অধিকার কেবল বিশেষ কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে ন্যস্ত।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একটি বিশেষ ঐতিহাসিক তাৎপর্য রয়েছে। কারণ জুলাই আন্দোলন কোনো একক রাজনৈতিক দল, মতাদর্শ বা সংগঠনের একচ্ছত্র উদ্যোগ ছিল না। এর প্রাণশক্তি ছিল সর্বস্তরের ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, যেখানে নানা সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক পটভূমির মানুষ একটি অভিন্ন আকাক্সক্ষাকে সামনে নিয়ে একত্রিত হয়েছিল।
ফলে জুলাইয়ের ইতিহাসকে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ‘প্রতীকী পুঁজি’ হিসেবে দীর্ঘমেয়াদে একচেটিয়াভাবে ব্যবহার করার সুযোগ স্বাভাবিকভাবেই সীমিত হয়ে গেছে। সর্বস্তরের মানুষের এই গণঅভ্যুত্থান আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে ইতিহাসের প্রকৃত মালিক কোনো দল নয়, দেশের জনগণ; আর গণআন্দোলনের প্রকৃত শক্তি কোনো সংগঠনের একক কর্তৃত্বে নয়, বরং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণে নিহিত।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরপরই একটি রাজনৈতিক প্রবণতা দৃশ্যমান হয়েছে, যেখানে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিপরীতে দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হয়েছে, যেন স্বাধীনতার চেতনা এবং রাষ্ট্র সংস্কারের আকাক্সক্ষা একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী। একদিকে কেউ কেউ জুলাইয়ের তাৎপর্য প্রতিষ্ঠার নামে স্বাধীনতা যুদ্ধের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে খাটো করতে চেয়েছেন; অন্যদিকে আরেকটি পক্ষ স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতিকে সামনে এনে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের বৈধতা ও ঐতিহাসিক গুরুত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে। উভয় প্রবণতাই ইতিহাসের প্রকৃত স্বরূপকে অস্বীকার করে, যুক্তির বিচারে অসংগত এবং জাতীয় স্বার্থের ও ইতিহাসের ধারাবাহিকতার পরিপন্থী।
প্রকৃতপক্ষে ১৯৭১ এবং ২০২৪ কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ইতিহাস নয়; বরং একই জাতীয় অর্জনের অব্যাহত অভিযাত্রার ভিন্ন দুই অধ্যায়। ১৯৭১ আমাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতার ভিত্তি নির্মাণ করেছে, আর ২০২৪ সেই স্বাধীন রাষ্ট্রকে আরও বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক এবং স্বৈরাচারমুক্ত করার গণআকাক্সক্ষাকে নতুনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। একটি অর্জনকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্য অর্জনকে অস্বীকার করার চেষ্টা ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করে না; বরং জাতির সম্মিলিত শক্তিকে দুর্বল করে।
আমাদের স্বীকার করতে হবে যে, জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের যে জনআকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছিল, তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দুটি মৌলিক দাবি- একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্রযন্ত্র এবং একটি স্বৈরাচারমুক্ত শাসনব্যবস্থা এই আকাক্সক্ষার প্রতিফলন হিসেবেই ‘জুলাই সনদ’-এর ধারণা সামনে আসে, যার লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, নাগরিক অধিকার সুরক্ষা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি নতুন সামাজিক চুক্তির ভিত্তি নির্মাণ করা।
কিন্তু যখন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু রাষ্ট্রসংস্কার থেকে সরে গিয়ে ইতিহাসের মালিকানা নিয়ে প্রতিযোগিতায় আবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন স্বাভাবিকভাবেই সেই সংস্কার-এজেন্ডা দুর্বল হয়ে যায়। ফলে যে তরুণরা জুলাইয়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিল রাষ্ট্র পুনর্গঠনের স্বপ্ন নিয়ে, তাদের অনেক প্রত্যাশাই অপূর্ণ থেকে যায়; পুরোনো বন্দোবস্ত ভেঙে নতুন বন্দোবস্ত নির্মাণের যে প্রত্যয় আন্দোলনের ভেতরে জন্ম নিয়েছিল, তার বাস্তবায়ন নানা কারণে বাধাগ্রস্ত হয়।
মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ আমাদের গর্ব; চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানও আমাদের গর্ব। একটি আমাদের স্বাধীন অস্তিত্বের ভিত্তি নির্মাণ করেছে, অন্যটি সেই স্বাধীন রাষ্ট্রের চরিত্র, কার্যকারিতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আত্মসমালোচনা এবং আত্মসংশোধনের শক্তিকে প্রকাশ করেছে। একটি আমাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতার দরজা খুলেছে, অন্যটি আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে যে স্বাধীনতার সুফলকে অর্থবহ করতে হলে রাষ্ট্রকে হতে হবে বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক এবং জনগণকেন্দ্রিক।
এই দুটি ঘটনাই বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য ও অনিবার্য অংশ এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র নির্মাণে উভয়ই আমাদের জন্য প্রেরণা, শিক্ষা ও দিকনির্দেশনার উৎস। অতএব, আমাদের সামনে পথ হতে হবে বিভাজনের রাজনীতির পরিবর্তে ঐক্যের রাজনীতি; প্রতিহিংসার সংস্কৃতির পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচারের সংস্কৃতি; ‘প্রতীকী পুঁজি’ ব্যবহার করে ইতিহাসের একচেটিয়া মালিকানা প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বহুমাত্রিক স্মৃতিচর্চার সংস্কৃতি এবং অতীতের অন্তহীন বিতর্কে আবদ্ধ থাকার পরিবর্তে ভবিষ্যৎ নির্মাণের দৃঢ় অঙ্গীকার।
ইতিহাসের প্রকৃত শিক্ষা হলো একটি জাতি তখনই এগিয়ে যায়, যখন সে তার অতীতকে সম্মান করে, বর্তমানের দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং ভবিষ্যতের জন্য নতুন স্বপ্ন নির্মাণ করে। চব্বিশের জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা তাই কেবল একটি আন্দোলনের স্মৃতি নয়; এটি জনগণের রাজনৈতিক জাগরণ, অধিকার সচেতনতা এবং রাষ্ট্রকে আরও ন্যায়ভিত্তিক করার আকাক্সক্ষার বহিঃপ্রকাশ।
এই চেতনাকে ধারণ করে স্বাধীন, সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণের লক্ষ্যে কঠোর পরিশ্রম, জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়ন, সুশাসন, উৎপাদনশীলতা এবং জাতীয় সংহতির নতুন সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠাই হোক আমাদের আগামীর পথচলার মূলমন্ত্র। কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিজয় কোনো একটি মুহূর্তের সাফল্যে নয়; বরং সেই মুহূর্তের চেতনাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাস্তব জীবনে রূপ দেওয়ার মধ্যেই নিহিত।
ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন যুক্তরাজ্য
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি