বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাস গৌরব, সংগ্রাম এবং আত্মত্যাগের এক অনন্য মহাকাব্য হলেও সময়ের আবর্তে আজ তার রূপান্তর ঘটেছে চরমভাবে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে এ দেশের ছাত্রসমাজ যে আপসহীন ও আদর্শিক নেতৃত্ব দিয়েছিল, তা আজ রূপকথার মতো শোনায়। সেকালের সেই ত্যাগের রাজনীতি একালের ক্যাম্পাসে এসে অনেকটাই ভোগ, দখলদারিত্ব আর ক্ষমতার দাসে পরিণত হয়েছে। এই রূপান্তর কেবল রাজনৈতিক আদর্শেরই পতন ঘটায়নি, বরং ছাত্রসমাজের মনস্তত্ত্ব এবং ক্যাম্পাসের সামগ্রিক পরিবেশকে এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
সেকালের ক্যাম্পাস রাজনীতিতে স্লোগান ছিল অধিকার আদায়ের এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক একটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। ‘যুক্তির প্রতিশোধ যুক্তিতেই নেব’, ‘জাগো জাগো বাঙালি জাগো’ কিংবা ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’র মতো সেøাগানগুলো সাধারণ শিক্ষার্থীদের ধমনীতে দেশপ্রেমের জোয়ার তুলত। চায়ের কাপে ঝড় তুলে তরুণরা তখন সাম্যবাদ, গণতন্ত্র আর মুক্তির সংগ্রামে নিজেদের সঁপে দিত। কিন্তু একালে এসে সেই বজ্রকণ্ঠের স্লোগানগুলো রূপান্তরিত হয়েছে নির্দিষ্ট ব্যক্তির গুণকীর্তন এবং চাটুকারিতায়।
এখন ক্যাম্পাসের দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয় ‘অমুক ভাইয়ের আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম’ কিংবা ‘ক্যাম্পাস
যার, মাঠ তার’। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সেকালের ছাত্ররাজনীতি ছিল সৃজনশীলতার এক উর্বর চারণভূমি, যেখানে গান আর কবিতা ছিল প্রতিবাদের প্রধান হাতিয়ার। গণসংগীতের সুর আর সুকান্ত-নজরুলের কবিতা আওড়ে ছাত্রনেতারা বুর্জোয়া ও শোষকদের ভিত কাঁপিয়ে দিতেন। ক্যাম্পাসের মুক্তমঞ্চগুলোতে নাটক আর আবৃত্তির মাধ্যমে সমাজ সংস্কারের ডাক দেওয়া হতো। অথচ একালে এসে সেই সুস্থ সংস্কৃতির জায়গা দখল করেছে অপসংস্কৃতি, ডিজে পার্টি আর ক্ষমতার চটকদার প্রদর্শনী। এখন আর কোনো মিছিলে জীবনমুখী গানের কলি শোনা যায় না।
সেকালের ছাত্রনেতাদের কথোপকথন ও আড্ডায় স্থান পেত বিশ্বরাজনীতি, দর্শন, সাহিত্য এবং দেশের অর্থনৈতিক মুক্তির রূপরেখা। বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিন কিংবা ক্যাফেটেরিয়ার টেবিলে কার্ল মার্কস, লেনিন, কিংবা রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যুক্তিনির্ভর বিতর্ক হতো। সেই প্রাজ্ঞ আলাপচারিতা একালে এসে ঠেকেছে ভয়াবহ স্তাবকতায়।
অর্থনৈতিক চরিত্রের দিক থেকে সেকালের ছাত্ররাজনীতি ছিল সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থ এবং ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল। ছাত্রনেতারা নিজেদের পকেটের পয়সা খরচ করে, এমনকি সহপাঠীদের কাছ থেকে মুষ্টিচাল সংগ্রহ করে রাজনীতির খরচ জোগাতেন। মধ্যবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা সেই নেতারা ছেঁড়া স্যান্ডেল আর সাধারণ পাঞ্জাবি পরেই দেশের ভাগ্য পরিবর্তনের লড়াইয়ে শামিল হতেন। এর বিপরীতে একালের ক্যাম্পাস রাজনীতিতে যোগ হয়েছে করপোরেট ও মাফিয়াতন্ত্রের কালো ছায়া। আজকের ছাত্ররাজনীতি অনেকের কাছেই এক লাভজনক ক্যারিয়ার, যেখানে পদ-পদবি পাওয়ার অর্থই হলো বিপুল অর্থের মালিক বনে যাওয়া এবং বিলাসবহুল জীবনযাপনের লাইসেন্স লাভ করা।
ক্যাম্পাসভিত্তিক চাঁদাবাজির যে বীভৎস রূপ আজ আমরা দেখি, সেকালে তার কোনো অস্তিত্বই ছিল না। তখন ব্যবসায়ীরা ছাত্রনেতাদের সমীহ করতেন তাদের নৈতিক অবস্থানের কারণে ভয়ে নয়। আর একালে চাঁদাবাজি রূপ নিয়েছে এক প্রাতিষ্ঠানিক উৎসবে, যেখানে ক্যাম্পাসের আশপাশের দোকানপাট, হলের ডাইনিং, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোটি কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প থেকেও নির্দিষ্ট হারে বকশিশ বা পার্সেন্টেজ কাটা হয়।
হলের সিট বাণিজ্য একালের ক্যাম্পাস রাজনীতির অন্যতম কুৎসিত ও অমানবিক একটি দিক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সেকালে হলের সিট বরাদ্দ হতো সম্পূর্ণ মেধার ভিত্তিতে এবং প্রশাসনের মাধ্যমে, যেখানে ছাত্রসংগঠনগুলো কেবল দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সহায়তায় সুপারিশ করত। কিন্তু বর্তমানে হলের গণরুম এবং সিট নিয়ন্ত্রণ করে ছাত্রনেতারা, যা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য এক আধুনিক দাসত্বের বন্দিশালা।
লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি সেকাল ও একালের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রাচীর গড়ে তুলেছে। সেকালে ছাত্রসংগঠনগুলো মূল দলের আদর্শ গ্রহণ করলেও তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এক ধরনের স্বাধীনসত্তা ও সার্বভৌমত্ব ছিল। এমনকি অনেক জাতীয় সংকটে ছাত্রনেতারা মূল দলের প্রবীণ নেতাদের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিয়ে সঠিক পথ দেখাতেন। কিন্তু একালে ছাত্ররাজনীতি পরিণত হয়েছে মূল দলের অন্ধ অনুসারী এবং দাসত্বনির্ভর এক লাঠিয়াল বাহিনীতে।
দলদাসের এই সংস্কৃতি ক্যাম্পাসগুলোতে সুস্থ ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার পথ সম্পূর্ণ রুদ্ধ করে দিয়েছে। সেকালের ছাত্রনেতারা উপাচার্য বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হতেন। অথচ একালের তথাকথিত ছাত্রনেতারা প্রশাসনের দুর্নীতি ও অনিয়মের ঢাল হিসেবে কাজ করেন, কারণ অনেক সময় উপাচার্য বা শিক্ষকরাও রাজনৈতিক তদবিরের মাধ্যমে পদ পেয়ে থাকেন।
নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের খতিয়ান ঘাঁটলে দেখা যায়, সেকালের রাজনীতিতে সহিংসতা থাকলেও তা ছিল মূলত আদর্শিক সংঘাত কিংবা রাষ্ট্রীয় শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। কিন্তু একালের সহিংসতা আবর্তিত হয় কেবলই অভ্যন্তরীণ কোন্দল, হলের আধিপত্য বিস্তার, জুয়া, মাদক ব্যবসা এবং টেন্ডারবাজির অর্থ ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে। আবরার ফাহাদের মতো মেধাবী শিক্ষার্থীকে হলের ভেতরে পিটিয়ে হত্যা করার মতো নৃশংসতা একালের ছাত্ররাজনীতির গায়ে এক স্থায়ী কলঙ্কের দাগ লেপে দিয়েছে। অধিকাংশ সাধারণ শিক্ষার্থী তাই এখন ছাত্ররাজনীতি শব্দটিকে সমীহ বা শ্রদ্ধার চোখে দেখে না, বরং একে এক আতঙ্কের সমার্থক শব্দ হিসেবে গণ্য করে।
অস্ত্রের ঝনঝনানি একালের ক্যাম্পাসগুলোতে এক সাধারণ দৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা সেকালের ছাত্ররাজনীতিতে ছিল অত্যন্ত বিরল। সেকালের নেতাদের প্রধান অস্ত্র ছিল কলম, বই, বাগ্মিতা এবং নৈতিক বল; যার সামনে স্বৈরাচারের বন্দুকের নলও কেঁপে উঠত। আর একালে আদর্শহীনতার শূন্যতা ঢাকতে ব্যবহার করা হয় অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র, চাপাতি আর হকিস্টিক। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে কিংবা নিজেদের মধ্যে ক্ষমতার ভাগাভাগি নিশ্চিত করতে প্রকাশ্য দিবালোকে অস্ত্র উঁচিয়ে মহড়া দেওয়া বর্তমান ক্যাম্পাস রাজনীতির এক নৈমিত্তিক এবং নির্মম বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
মেধাবীদের অংশগ্রহণ সেকালে ছাত্ররাজনীতিকে এক অনন্য উচ্চতা দিয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া ছাত্ররাই তখন ছাত্র সংসদের ভিপি বা জিএস হতেন এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের আইকন মানত। রাজনীতি করা মানেই ছিল পড়াশোনা ও জ্ঞানে অত্যন্ত সমৃদ্ধ হওয়া। পক্ষান্তরে, একালে মেধা যেন ছাত্ররাজনীতির সবচেয়ে বড় শত্রু। বর্তমানের বহু ছাত্রনেতার ছাত্রত্বই থাকে ভুয়া, বছরের পর বছর ড্রপআউট হয়েও তারা হলের রুম দখল করে রাজনীতি করেন। ফলে মেধাবী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা এখন রাজনীতি থেকে শতহাত দূরে থাকে।
জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রেও সেকাল ও একালের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। সেকালের ছাত্র আন্দোলনগুলো জাতীয় রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করে দিত, আইয়ুব খান থেকে এরশাদ- সব স্বৈরাচারী শাসকই ছাত্রসমাজের আন্দোলনের তোড়ে ভেসে গিয়েছিল। অথচ একালের ছাত্ররাজনীতি জাতীয় রাজনীতিতে কোনো ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে তো পারেই না, বরং জাতীয় রাজনীতির নোংরা ও কলুষিত ধারাকে ক্যাম্পাসে টেনে এনে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করে।
নারীর অংশগ্রহণ এবং নিরাপত্তার প্রশ্নে সেকাল ছিল অনেক বেশি প্রগতিশীল ও নিরাপদ। সেকালের ছাত্র আন্দোলনে নারী নেত্রীরা সমঅধিকার ও সম্মানের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজপথে লড়তেন এবং ক্যাম্পাসে তারা নিরাপদ বোধ করতেন। কিন্তু একালে ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্ররাজনীতির ছত্রছায়ায় নারী নিপীড়ন, ইভটিজিং এবং ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের ঘটনাও ঘটতে দেখা যায়।
প্রযুক্তির ব্যবহার বর্তমান ক্যাম্পাস রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করলেও তার অপপ্রয়োগই বেশি দৃশ্যমান। সেকালে যোগাযোগের মাধ্যম ছিল লিফলেট, দেয়াল লিখন আর পোস্টার, যা মানুষের মনে গভীর আবেদন তৈরি করত। আর একালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করা হচ্ছে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো, প্রতিপক্ষকে সাইবার বুলিং করা এবং নিজেদের ভুয়া ভাবমূর্তি তৈরির সস্তা হাতিয়ার হিসেবে।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেকালে ছাত্ররাজনীতি ছিল সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষার ঢাল। ডাইনিংয়ের খাবারের মান উন্নয়ন থেকে শুরু করে বেতন বৃদ্ধির প্রতিবাদ- সবকিছুতেই ছাত্রনেতারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করতেন। ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা নেতাদের মনেপ্রাণে ভালোবাসত এবং আপদে-বিপদে তাদের পাশে এসে দাঁড়াত। অথচ একালে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ছাত্ররাজনীতিকে নিজেদের প্রধান শত্রু মনে করে।
ক্যাম্পাস রাজনীতির সেকাল ও একালের এই তুলনামূলক চিত্রটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক হলেও এটিই আমাদের বর্তমান নির্মম বাস্তব। তবে নিরাশার মাঝেও আশার আলো হলো, এদেশের সাধারণ শিক্ষার্থীরা বারবার প্রমাণ করেছে যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে তারা দমে যাওয়ার পাত্র নয়। ক্যাম্পাস রাজনীতিকে যদি আবার তার হারানো গৌরব ফিরিয়ে দিতে হয়, তবে লেজুড়বৃত্তি ও পেশিশক্তির অবসান ঘটিয়ে সুস্থ, মেধাভিত্তিক ও স্বাধীন ছাত্ররাজনীতির পুনর্জন্ম ঘটাতে হবে। আবারও দেশপ্রেমের মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে ক্যাম্পাসগুলোকে জ্ঞানে-বিজ্ঞানে এবং মুক্তচিন্তার আলোয় আলোকিত করার শপথ নিতে হবে।
প্রাবন্ধিক
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি