মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় বিস্ময়গুলো হয়তো সেগুলোই, যেগুলোকে আমরা দেখতে পাই না। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলেন, আমাদের চারপাশে যা কিছু দৃশ্যমান নক্ষত্র, গ্রহ, গ্যালাক্সি, ধূলিকণা, এমনকি আমাদের নিজের শরীর- সব মিলিয়েও মহাবিশ্বের সামান্য অংশ। বাকি অংশের নাম ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি। আমরা তাদের দেখি না, ছুঁতে পারি না, কিন্তু তাদের উপস্থিতি অনুভব করি। গ্যালাক্সির ঘূর্ণন, মহাবিশ্বের প্রসারণ, নক্ষত্রের গতিপথ- সবকিছু যেন এক অদৃশ্য উপস্থিতির সাক্ষ্য বহন করে।
আলো লাখ লাখ আলোকবর্ষ পাড়ি দিয়ে আসে। সেই আলো স্বচ্ছ কাচের ভেতর দিয়ে চলে যায় প্রায় কোনো পরিবর্তন ছাড়াই। আবার একই আলো যখন পাথর, ধাতু কিংবা কাঠের গায়ে পড়ে, তখন প্রতিফলিত হয়, নয়তো শোষিত হয়। কিন্তু মহাবিশ্বের সেই অদৃশ্য সত্তাগুলো ডার্ক ম্যাটার কিংবা ডার্ক এনার্জি- আলোর কাছে যেন অচেনা। আলো তাদের রং জানে না, তাদের মুখও চেনে না। তবু তাদের অস্তিত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই।
মানুষের জীবনেও এমন কিছু মানুষ আছে। তারা আমাদের খুব কাছেই থাকে, অথচ আমাদের ভেতরে কোনো আলোড়ন তোলে না। আমরা তাদের দেখি, তাদের সঙ্গে কথা বলি, একসঙ্গে ছবি তুলি, একই ছাদের নিচে থাকি, কিন্তু তারা যেন কাচের মতো। আলো তাদের ভেতর দিয়ে চলে যায়; কোনো দাগ রাখে না, কোনো উষ্ণতা রেখে যায় না। তাদের উপস্থিতি আছে, কিন্তু প্রভাব নেই।
আবার এমন কিছু মানুষ আছে, যাদের আমরা হয়তো প্রতিদিন দেখি না। তারা হয়তো বহু দূরে, হয়তো বহু বছর আগে চলে গেছেন। তবু তাদের একটি বাক্য, একটি স্পর্শ, একটি স্মৃতি আমাদের জীবনের কক্ষপথ বদলে দেয়। তারা যেন অদৃশ্য কোনো মহাকর্ষ দেখা যায় না, কিন্তু আমাদের ভেতরের মহাবিশ্বকে ধরে রাখে।
এই জায়গাতেই ইমানুয়েল কান্টের দর্শন নতুন অর্থ পায়। কান্ট বলেছিলেন, আমরা জগৎকে যেমন আছে তেমন দেখি না; আমরা দেখি আমাদের উপলব্ধির কাঠামোর মধ্য দিয়ে। বস্তু-স্বয়ং-থিং-ইন-ইটসেল্ফ- আমাদের কাছে অধরা। আমরা কেবল তার প্রকাশকে জানি, তার প্রকৃত সত্তাকে নয়।
সম্ভবত মানুষও তাই। যে মানুষ আমাদের পাশে বসে আছে, সে হয়তো আমাদের কাছে কেবল একটি উপস্থিতি। আর যে মানুষ আমাদের হৃদয়ে বাস করে, তার প্রকৃত রূপও হয়তো আমরা পুরোপুরি জানি না। আমরা তাকে জানি আমাদের স্মৃতি, অভিজ্ঞতা, ভালোবাসা ও বেদনার মধ্য দিয়ে। অর্থাৎ মানুষকে আমরা যেমন, সে তেমন নয়; মানুষকে আমরা যেমন অনুভব করি, সে তেমন।
তাই পৃথিবীতে দুই ধরনের মানুষ আছে। একদল কাছের মানুষ। আরেকদল কাচের মানুষ। কাছের মানুষ দূরত্ব দিয়ে মাপা যায় না। তিনি হাজার মাইল দূরে থেকেও আপনার সিদ্ধান্তে, আপনার সাহসে, আপনার প্রার্থনায় উপস্থিত থাকেন। তার অনুপস্থিতিও একটি উপস্থিতি। কাচের মানুষ ঠিক উল্টো। তিনি আপনার ঘরে আছেন, আপনার অফিসে আছেন, আপনার আত্মীয়তার তালিকায় আছেন, আপনার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিটি ছবিতে আছেন; কিন্তু আপনার জীবনের কোনো অধ্যায়ে নেই। তিনি আছেন, অথচ নেই। আলো তার ভেতর দিয়ে চলে যায়, কিন্তু কোনো রং তৈরি হয় না।
কখনো কখনো আমরা ভুল করি। কাচের মানুষকে কাছের মানুষ ভেবে বসি। কারণ কাচ স্বচ্ছ। সে আড়াল করে না। বরং এমন ভ্রম তৈরি করে যেন কোনো দূরত্বই নেই। অথচ স্পর্শ করতে গেলেই বোঝা যায়- মাঝখানে একটি শক্ত, নীরব, অদৃশ্য দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে। জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি তাই মানুষের সংখ্যা নয়; মানুষের ঘনত্ব। কে কতক্ষণ পাশে ছিল, সেটি নয়; কে আপনার আত্মার মহাকর্ষে পরিণত হয়েছে, সেটিই আসল।
মহাবিশ্বের মতো মানুষের জগতেও দৃশ্যমান সবকিছু সত্যের শেষ কথা নয়। কিছু সম্পর্ক নক্ষত্রের মতো উজ্জ্বল, কিন্তু দ্রুত নিভে যায়। আবার কিছু সম্পর্ক ডার্ক ম্যাটারের মতো অদৃশ্য, অথচ তারাই আমাদের ভেঙে পড়তে দেয় না। তাই মানুষ চিনতে হলে চোখের আলো যথেষ্ট নয়। দরকার হৃদয়ের মহাকর্ষ। কারণ সব কাছের মানুষ আপনজন নয়। আর সব কাচের মানুষ স্বচ্ছ হলেও, তাদের ভেতর দিয়ে জীবন কেবল পার হয়ে যায়।
কিন্তু ইসলাম আমাদের আরেকটি দৃষ্টি শেখায়। আল্লাহ তায়ালা মানুষের চেহারা বা সম্পদ দিয়ে বিচার করেন না; তিনি দেখেন অন্তর ও আমল। একজন মানুষের প্রকৃত মূল্য তার বাহ্যিক উপস্থিতিতে নয়, তার তাকওয়ায়, তার ইখলাসে, তার চরিত্রে। কত মানুষ আমাদের খুব কাছে থেকেও হৃদয়কে আল্লাহর দিকে এক পা এগিয়ে দেয় না। আবার কত মানুষ হয়তো বহু দূরে, কিংবা এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন, তবু তাদের একটি দোয়া, একটি উপদেশ, একটি সৎকাজের স্মৃতি আজও আমাদের ঈমানকে শক্তিশালী করে।
ইসলাম তাই মানুষকে দূরত্ব দিয়ে নয়, প্রভাব দিয়ে বিচার করতে শেখায়। রাসুল (সা.) বলেছেন, উত্তম সঙ্গী ও মন্দ সঙ্গীর উদাহরণ সুগন্ধি বিক্রেতা ও কামারের হাপরের মতো। একজনের কাছে গেলে হয়তো সুগন্ধি উপহার পাবে, না হয় অন্তত সুগন্ধ অনুভব করবে; আর অন্যজনের কাছে গেলে কাপড় পুড়তে পারে, অথবা অন্তত দুর্গন্ধে আক্রান্ত হবে।
অর্থাৎ মানুষ তার সঙ্গ দিয়েই অন্য মানুষের অন্তরকে রাঙিয়ে দেয় অথবা কলুষিত করে। হয়তো এ কারণেই কেয়ামতের দিন আমাদের পরিচয় হবে না- কার সঙ্গে ছবি তুলেছিলাম, কার সঙ্গে একই ঘরে ছিলাম, কিংবা কে আমাদের সবচেয়ে কাছাকাছি বাস করত। পরিচয় হবে- কাদের ভালোবেসেছিলাম আল্লাহর জন্য, কাদের সঙ্গে চলেছিলাম সত্যের পথে, আর কারা আমাদের হৃদয়কে তার দিকে ফিরিয়ে দিয়েছিল। জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য তাই অসংখ্য কাচের মানুষে ঘেরা থাকা নয়; বরং এমন কয়েকজন কাছের মানুষ পাওয়া, যাদের সান্নিধ্যে আল্লাহর কথা মনে পড়ে, ঈমান বৃদ্ধি পায়, চরিত্র সুন্দর হয় এবং আখিরাতের পথ সহজ হয়ে ওঠে। কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষকে আলোর স্বচ্ছতা নয়, হৃদয়ের নূরই আলাদা করে। আর সেই নূর কাচে নয়- জাগ্রত হৃদয়ে প্রতিফলিত হয়।
প্রাবন্ধিক ও সমাজকর্মী
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি