হিরোশিমা থেকে আজকের পৃথিবী

আকমল হোসেন

মতামত

৬ আগস্ট হিরোশিমা দিবস। বিশ্বব্যাপী মানব ইতিহাসের অন্যতম শোকাবহ ঘটনার স্মরণে পালিত হয় দিবসটি। ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের

2026-08-06T05:33:12+00:00
2026-08-06T05:33:12+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট ২০২৬,
২২ শ্রাবণ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট ২০২৬
মতামত
হিরোশিমা থেকে আজকের পৃথিবী
আকমল হোসেন
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২৬, ৫:৩৩ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
৬ আগস্ট হিরোশিমা দিবস। বিশ্বব্যাপী মানব ইতিহাসের অন্যতম শোকাবহ ঘটনার স্মরণে পালিত হয় দিবসটি। ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে জাপানের হিরোশিমা শহরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বি-২৯ বোমারু বিমান এনোলা গে থেকে বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক বোমা লিটল বয় নিক্ষেপ করা হয়। এতে তাৎক্ষণিক ৭০ থেকে ৮০ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। 

পরবর্তী সময়ে তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে মৃতের সংখ্যা প্রায় দেড় লাখে পৌঁছে। যারা বেঁচে ছিলেন, তাদের অনেকেই ক্যানসার, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা এবং মানসিক ট্রমায় দীর্ঘদিন ভুগেছেন। বিস্ফোরণের ভয়াবহ তাপ ও ধ্বংসযজ্ঞে শহরের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হিরোশিমার তিন দিন পর নাগাসাকিতেও আরেকটি পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করা হয়। এরপর ১৫ আগস্ট জাপান আত্মসমর্পণ করে।

শান্তিপ্রিয় মানুষের মতে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮) শেষে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা, পরাজিত রাষ্ট্রগুলোর অপমানবোধ, প্রতিশোধস্পৃহা এবং দায়িত্বশীল রাষ্ট্রগুলোর ব্যর্থতার ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-১৯৪৫) সূচনা হয়। ইউরোপের পরাশক্তিগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও সামরিক বৈরিতা চলছিল। 

১৯১৪ সালের ২৮ জুন অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির যুবরাজ ফ্রানৎস ফার্দিনান্দ ও তার স্ত্রী সারায়েভোতে আততায়ীর গুলিতে নিহত হওয়ার পর ২৮ জুলাই অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ১৯১৮ সালের নভেম্বরে যুদ্ধের অবসান ঘটে। একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে প্রায় দুই কোটি মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এতে প্রায় ৩০টি দেশ অংশ নেয়। কেন্দ্রীয় শক্তির পক্ষে ছিল জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়া ও উসমানীয় সাম্রাজ্য। অন্যদিকে সার্বিয়ার পক্ষে মিত্রশক্তিতে ছিল যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া, ইতালি, জাপান এবং পরে ১৯১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে কেন্দ্রীয় শক্তির পরাজয়ের পর কয়েকটি সাম্রাজ্যের পতন ঘটে এবং ১৯১৯ সালের ২৮ জুন ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদের মিরর হলে ভার্সাই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ১৯২০ সালের ১০ জানুয়ারি চুক্তিটি কার্যকর হয়। কিন্তু এর সুষ্ঠু বাস্তবায়ন না হওয়ায় পরাশক্তিগুলোর মধ্যে বৈরিতা আবারও বাড়তে থাকে। চুক্তির বিভিন্ন ধারায় যুদ্ধের দায় জার্মানির ওপর চাপানো হয় এবং ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১৩২ বিলিয়ন গোল্ডমার্ক পরিশোধের বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়। জার্মানিকে তার ভূখণ্ডের একটি অংশ এবং উপনিবেশ হারাতে হয়। সামরিক শক্তিও ব্যাপকভাবে সীমিত করা হয়। ফলে দেশটিতে অপমান, ক্ষোভ ও প্রতিশোধের মনোভাব আরও প্রবল হয়ে ওঠে।

ভবিষ্যতে যুদ্ধ প্রতিরোধ এবং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯২০ সালে লীগ অব নেশনস বা জাতিপুঞ্জ গঠিত হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তি, সামরিক শক্তি হ্রাস এবং ভবিষ্যৎ যুদ্ধ প্রতিরোধ। কিন্তু সংগঠনটি তার লক্ষ্য অর্জনে সফল হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস সমর্থন না দেওয়ায় দেশটি নিজেই সংগঠনের সদস্য হয়নি। অন্যদিকে ব্রিটেন ও ফ্রান্স জার্মানির অ্যাডলফ হিটলার এবং ইতালির বেনিতো মুসোলিনির প্রতি তোষণনীতি অনুসরণ করায় ১৯৩০ সালে লীগ অব নেশনস কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। এ সময় ১৯৩১ সালে জাপান চীনের মাঞ্চুরিয়া দখল করে এবং ১৯৩৭ সালে নানচিংয়ে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। ১৯৩৫ সালে ইতালিও ইথিওপিয়া আক্রমণ করে।


ঐতিহাসিকদের মতে, ভার্সাই চুক্তির অপমান, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, বেকারত্ব এবং ১৯২৯ সালের মহামন্দার অভিঘাত জার্মানি ও ইতালিতে গণতান্ত্রিক শক্তিকে দুর্বল করে এবং স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শক্তির উত্থানের পথ তৈরি করে। ১৯৩৯ সালে জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। অক্ষশক্তির পক্ষে ছিল জার্মানি, জাপান, ইতালি, হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়া, রোমানিয়া, ফিনল্যান্ড ও থাইল্যান্ড। অন্যদিকে মিত্রশক্তির পক্ষে ছিল যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন, ফ্রান্স, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ভারত (ব্রিটিশ শাসনের অংশ হিসেবে), বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, গ্রিস ও যুগোস্লাভিয়া। ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ এই যুদ্ধে আনুমানিক ৭ থেকে ৮ কোটি মানুষের প্রাণহানি ঘটে। যুদ্ধ চলাকালে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হয়। শেষ পর্যন্ত সোভিয়েত লাল ফৌজের কাছে হিটলারের বাহিনী পরাজিত হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক ভয়াবহ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। এর ফলে শুধু বিপুল প্রাণহানিই ঘটেনি; অর্থনৈতিক ক্ষতি, অবকাঠামো ধ্বংস, কৃষি উৎপাদনে বিপর্যয় এবং খাদ্যসংকটও দেখা দেয়। বিজ্ঞানের অপপ্রয়োগ কীভাবে মানবতাকে বিপন্ন করতে পারে, হিরোশিমা তার নির্মম উদাহরণ। যুদ্ধের বিভীষিকার বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরিতে নোবেলজয়ী দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল এবং বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিরোধিতা করায় রাসেল ১৯১৬ সালে কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজের অধ্যাপকের পদ হারান এবং ১৯১৮ সালে ব্রিটিশ যুদ্ধনীতির সমালোচনা করায় কারাদণ্ড ভোগ করেন। পরবর্তীকালে তিনি পারমাণবিক যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধেও সক্রিয় ছিলেন।

যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন এবং জাতিসংঘের শান্তির আহ্বান সত্ত্বেও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। ফিলিস্তিনে ইসরাইলি হামলা, ইরাকে মার্কিন সামরিক অভিযান, ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ বিভিন্ন সংঘাত মানবসভ্যতার জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। বিশ্বের বহু দেশে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির যৌক্তিকতা কী, তার ব্যাখ্যা যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া উচিত। হিরোশিমা দিবসে শান্তিকামী মানুষের প্রত্যাশা একটাইÑ পৃথিবীর সব বিরোধের সমাধান হোক আলোচনার মাধ্যমে। আর কোনো নিরীহ ও নিরপরাধ মানুষ যেন যুদ্ধের শিকার হয়ে প্রাণ না হারায়।

লেখক : যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে


  বিষয়:   হিরোশিমা  আকমল হোসেন  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: