বিদ্যুৎ বিল নিয়ে গণ অসন্তোষ, প্রতিকার কী

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

মতামত

বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলোকে অনতিবিলম্বে মাঠ পর্যায়ে মিটার রিডিং ব্যবস্থার শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই সশরীরে মিটার না দেখে

2026-08-08T06:53:10+00:00
2026-08-08T06:54:19+00:00
 
  শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২৬,
২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২৬
মতামত
বিদ্যুৎ বিল নিয়ে গণ অসন্তোষ, প্রতিকার কী
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রকাশ: শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬, ৬:৫৩ এএম  আপডেট: ০৮.০৮.২০২৬ ৬:৫৪ এএম
গ্রাফিক : সময়ের আলো
বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলোকে অনতিবিলম্বে মাঠ পর্যায়ে মিটার রিডিং ব্যবস্থার শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই সশরীরে মিটার না দেখে বা অনুমানের ভিত্তিতে ‘ভৌতিক বিল’ তৈরি করা যাবে না। নিয়ম অমান্যকারী মিটার রিডার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। ডিজিটাল বা স্মার্ট মিটারের ক্ষেত্রে কোনো প্রযুক্তিগত ত্রুটি থাকলে তা দ্রুততম সময়ে বিনামূল্যে পরিবর্তন বা সংস্কারের ব্যবস্থা করতে হবে।

জুলাই ২০২৬ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত দেশের মানুষের মাঝে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। জুন ২০২৬ থেকে কার্যকর হওয়া বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের নতুন আদেশ অনুযায়ী খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৬.৬৮ শতাংশ বেড়েছে, তীব্র গরমের কারণে বেড়েছে লোডশেডিং, ভৌতিক মিটার রিডিংয়ে ভূতুড়ে বিল- এসবই গণ অসন্তোষকে চরম রূপ দিয়েছে। দেশের আটটি বিভাগের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে মেগাসিটি ঢাকা পর্যন্ত সর্বত্রই এই অতিরিক্ত বিল নিয়ে তীব্র সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে।

ঢাকা বিভাগের গ্রাহকদের বিল দুইগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা করিম মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আইজকা কয় মাস ধইরা যে বিল আইতাছে, হেইডা দেইখ্যা মাথা ঘোরে; ঘরে ফ্যান চালাই দুইটা, বিল আইছে তিন গুনা, এমনে চললে ঢাকা ছাইড়া গ্রামে যাওন লাগব।’ অতিরিক্ত ডিমান্ড চার্জ ও স্ল্যাব পরিবর্তনের কারণে এখানে অসন্তোষের মাত্রা তীব্রতর হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিভাগে বিদ্যুৎ বিলের অস্বাভাবিক উল্লম্ফন সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তুলেছে। বিশেষ করে পর্যটন নগরী কক্সবাজারের হোটেল ব্যবসায়ী ও চট্টগ্রামের সাধারণ আবাসিক গ্রাহকরা প্রিপেইড মিটারে দ্রুত টাকা শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে ক্ষুব্ধ।

খুলনা বিভাগে জুনের তীব্র তাপপ্রবাহের পর জুলাইয়ের বিলে মিটারের প্রকৃত রিডিংয়ের সঙ্গে কোনো মিল খুঁজে পাচ্ছেন না গ্রাহকরা। খুলনার খালিশপুরের বাসিন্দা শামসুর রহমান খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় বলেন, ‘কামের নাম কুস্তো নেই, মাসের শ্যাষে বিলের কাগজ দেহি চোখ চড়কগাছ; মোটে দুইডাই বাতি জ্বলে, তাতেই এরাম ভূতুড়ে বিল বানায় থুইছে, ওগো আল্লাহ মোদের দেহার কেউ নাই।’ যশোরের ঝিকরগাছার কৃষক আতিয়ার রহমান বলেন, ‘ক্ষেতের সেচের পানির লাইনে যে বিল আইচে, তাতে চাষবাস কইরে আর ভাত প্যামো না, সব টাহা কারেন্টেই গ্যাচে।’

সিলেট বিভাগের সিলেট সদর ও সুনামগঞ্জ জেলা প্রবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও সাধারণ ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো পিডিবির বিলের অত্যাচারে জর্জরিত। সুনামগঞ্জের হাওড় অঞ্চলের সাধারণ মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর জুলাইয়ের এই বিদ্যুৎ বিলকে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে দেখছেন। সিলেটের জিন্দাবাজারের বাসিন্দা উছমান আলী সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় বলেন, ‘ও বাবা, কিতা কমু আর বিলের কথা, ইতা তো বিল নায় যেন আমরার পকেট কাটার ধান্দা। লাইনর মানষে মিটার না দেখিয়াই আন্দাজে এক বিল বানাইয়া দিয়া গেছেগা।’ সুনামগঞ্জের নুর মিয়া বলেন, ‘হাওড়ের ধান বন্যায় গেল, অহন কারেন্টের বিলের ডরে রাইতে ঘুম আহে না, ইতা কুনতা বিচার অইতাছে রে বা।’

বরিশাল বিভাগে পল্লী বিদ্যুতের ভৌতিক বিল ও অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ নিয়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। নদীমাতৃক এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষ চরম আর্থিক সংকটের মধ্যে এই বাড়তি বিলকে অত্যাচার হিসেবে গণ্য করছেন। বরিশালের রূপাতলীর বাসিন্দা মোতাহার হোসেন বরিশালের স্থানীয় ভাষায় বলেন, ‘মোরা তো আর চোর না যে এত বিল দেবা, ঘরে একটা ফ্যানও ঠিকমতো চলে না ভোল্টেজের লাইগ্যা, অথচ বিল আইছে ডাবল। এইরমে বিল দেলে মোরা ক্যামনে বাঁচমু হেইডা কও।’ পটুয়াখালীর আলতাফ গাজী বলেন, ‘হালচাষ কইররা যা পাই, হ্যার বেশি যদি কারেন্টের পিছেই যায়, তয় পোলাপান লইয়া না খাইয়া থাহন লাগব।’

ময়মনসিংহ বিভাগের গ্রাহকদের অভিযোগ মিটার পাঠকরা বাসায় না এসেই অনুমানের ভিত্তিতে ইউনিট বসিয়ে দিয়েছেন। এর ফলে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক বিলের চেয়ে দুই থেকে চারগুণ বেশি টাকা পরিশোধের নোটিস এসেছে। গফরগাঁওয়ের বাসিন্দা আব্দুল কুদ্দুস ময়মনসিংহের আঞ্চলিক টোনে বলেন, ‘কাইলকা বিলের কাগজ দেইখ্যা আমার তো জান শুকায়া গ্যাছে, মিটার না দেইখ্যাই ব্যাটালাইন খাতার মইধ্যে বিল তুলছে; আমরা চাষাভুষা মানুষ, এত টেহা কই থাইক্যা দিতাম।’ ময়মনসিংহ শহরের নুরজাহান বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘পোলাপানের পড়ার টেবিলে একটা বাতি জ্বলে, হ্যার লাইগ্যা এত বিল আইলে আমরা ভাত রাঁধুম কী দিয়া।’

এই সমস্যা সমাধানকল্পে প্রথমত বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলোকে অনতিবিলম্বে মাঠ পর্যায়ে মিটার রিডিং ব্যবস্থার শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই সশরীরে মিটার না দেখে বা অনুমানের ভিত্তিতে ‘ভৌতিক বিল’ তৈরি করা যাবে না। নিয়ম অমান্যকারী মিটার রিডার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। ডিজিটাল বা স্মার্ট মিটারের ক্ষেত্রে কোনো প্রযুক্তিগত ত্রুটি থাকলে তা দ্রুততম সময়ে বিনামূল্যে পরিবর্তন বা সংস্কারের ব্যবস্থা করতে হবে।

দ্বিতীয়ত জুন ২০২৬ থেকে কার্যকর হওয়া ১৬.৬৮ শতাংশের বর্ধিত ট্যারিফ হার পুনর্বিবেচনা করতে হবে, বিশেষ করে লাইফলাইন (০-৫০ ইউনিট) এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির (৫১-২০০ ইউনিট) গ্রাহকদের জন্য। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও মানবিক দিক বিবেচনা করে এই প্রাথমিক ধাপগুলোর বিদ্যুতের দাম কমিয়ে একটি ন্যায়সংগত ও সহনশীল পর্যায়ে নিয়ে আসা জরুরি। এর ফলে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর থেকে আর্থিক চাপ অনেকাংশে কমবে এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।

তৃতীয়ত প্রতিটি বিদ্যুৎ অফিসে (ডেসকো, ডিপিডিসি, নেসকো, ওজোপাডিকো ও পল্লী বিদ্যুৎ) একটি করে স্বাধীন ও উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ‘জরুরি বিলিং অভিযোগ সেল’ গঠন করতে হবে। কোনো গ্রাহক অতিরিক্ত বিলের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ জমা দিলে সর্বোচ্চ ৭ কার্যদিবসের মধ্যে তা তদন্ত করে বিল সংশোধন করতে হবে এবং এই তদন্তকালে ওই গ্রাহকের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ স্থগিত রাখতে হবে। ঢালাওভাবে অভিযোগ অস্বীকার না করে প্রমাণের ভিত্তিতে প্রতিটি সমস্যা নিষ্পত্তি করা বাধ্যতামূলক করতে হবে।

চতুর্থত প্রিপেইড মিটারিং ব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে। বিভিন্ন লুকায়িত চার্জ, যেমন অতিরিক্ত ডিমান্ড চার্জ, মিটার ভাড়া এবং অগ্রিম করের হার সাধারণ মানুষের জন্য সহজবোধ্য করতে হবে। গ্রাহকরা অনেক সময় বুঝতে পারেন না কেন তাদের টাকা দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে, তাই প্রতিবার রিচার্জের পর ব্যয়ের বিস্তারিত বিবরণ এসএমএসের মাধ্যমে গ্রাহককে জানাতে হবে। 

পঞ্চমত বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে আরও শক্তিশালী ও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে, যেন তারা গণশুনানির মাধ্যমে জনগণের প্রকৃত অর্থনৈতিক দশা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সরকারি বা নির্বাহী আদেশে বা একতরফাভাবে বিতরণ কোম্পানিগুলোর লোকসান মেটাতে জনগণের ওপর বাড়তি বিলের বোঝা চাপানোর প্রবণতা স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে। অপচয় হ্রাস, বিদ্যুৎ চুরি রোধ এবং সিস্টেম লস কমিয়ে এনে উৎপাদন খরচ কমানোর দিকে নজর দিতে হবে।

ষষ্ঠত ও সবশেষে দীর্ঘমেয়াদি সুফল পেতে হলে বাংলাদেশকে ক্রমান্বয়ে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তি, যেমন সৌরবিদ্যুৎ এবং বায়ুবিদ্যুতের উৎপাদন ও ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে। জাতীয় গ্রিডে সাশ্রয়ী মূল্যের পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ যুক্ত হলে সামগ্রিক উৎপাদন খরচ কমে আসবে, যা দীর্ঘমেয়াদে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করবে। একই সঙ্গে সাধারণ জনগণকে বিদ্যুৎ ব্যবহারে মিতব্যয়ী হতে উদ্বুদ্ধ করতে ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচারও চালাতে হবে।

বিদ্যুৎ বিল নিয়ে চলমান সংকট কেবল কোনো যান্ত্রিক বা দাফতরিক ভুল নয়, বরং এটি লাখ লাখ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনধারণের অধিকারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি মানবিক ইস্যু। আশা করা যায়, বিদ্যুৎ বিভাগ ও সরকার জনগণের যৌক্তিক ক্ষোভকে আমলে নিয়ে এই সময়োপযোগী প্রতিকারমূলক পদক্ষেপগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করবে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং জনবান্ধব নীতির সঠিক সমন্বয়ই পারে বিদ্যুৎ খাতের এই গভীর সংকট মোচন করে দেশে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে।

লেখক : প্রাবন্ধিক
মতামত লেখকের নিজস্ব

সময়ের আলো/এসএকে




  বিষয়:   বিদ্যুৎ বিল  অসন্তোষ  প্রতিকার  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: