কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ এবং এর বিস্তার বিশ্বব্যাপী এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। একদিকে এআই মানব জীবনের বিভিন্ন দিক সহজ করে তুলছে, অন্যদিকে এর নেতিবাচক প্রভাবও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের নতুন প্রতিবেদন ‘ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ২০২৪’ এই বিষয়টি আবারও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছে, যেখানে দেখা গেছে উন্নত দেশগুলোতে এআই কারিগরি ব্যবহারে চাকরি হারানোর ঝুঁকি বহুগুণ বেশি।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী উন্নত দেশগুলোতে প্রায় ১৪.২ শতাংশ চাকরি সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে, যা তুলনামূলকভাবে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর জন্য মাত্র ৪.৫ শতাংশ। এই হার কম হলেও এর প্রকৃতি একরকম নয়।
উন্নত দেশগুলোতে উচ্চ প্রযুক্তি ও স্বয়ংক্রিয়তার কারণে চাকরির সংখ্যা কমে যাওয়ার আশঙ্কা বেশি। তবে এই প্রযুক্তি কেবল চাকরি হারানোর জন্যই নয়। বিশ্বব্যাংকের মতে, এআই শ্রমিকদের কর্মক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সম্ভাবনাও সৃষ্টি করছে। ছোট ও সাশ্রয়ী এআই টুল ব্যবহার করে উন্নয়নশীল দেশগুলো শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও বিচার ব্যবস্থায় অভূতপূর্ব উন্নতি করতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দেশগুলোর কর্মকাঠামো তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর হওয়ায় জেনারেটিভ এআই সহজেই দাফতরিক কাজ ও রুটিন দায়িত্বগুলো প্রতিস্থাপন করছে। নতুন প্রজন্মের সফটওয়্যার ডেভেলপার, কাস্টমার সার্ভিস ও কন্টেন্ট রাইটাররা সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। এআই প্রযুক্তির কারণে উচ্চ ও উচ্চমধ্যম আয়ের দেশের নারীরাও প্রশাসনিক ও দাফতরিক খাতে চাকরি হারানোর বড় ঝুঁকিতে রয়েছেন।
সুযোগ ও উৎপাদনশীলতা উন্নয়নশীল অর্থনীতির ১৬.২ শতাংশ কর্মসংস্থানে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বড় এআই মডেল তৈরির পেছনে অতিরিক্ত অর্থ না ব্যয় করে ছোট ও সাশ্রয়ী টুল স্থানীয়ভাবে মানিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়াতে পারলে কর্মীরা আরও বেশি মূল্য সংযোজনকারী ও সৃষ্টিশীল কাজের দিকে নিজেদের স্থানান্তরিত করতে পারেন।
তবে, এআই প্রযুক্তির এই বিস্তার অনেক চ্যালেঞ্জও নিয়ে এসেছে। প্রধান সমস্যা হলো- এআই প্রযুক্তি বর্তমানে ধনী ও বড় টেক-প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীয়ভাবে কেন্দ্রীভূত। উন্নয়নশীল দেশে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, ডেটা ও দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে সাব-সাহারান আফ্রিকার পরিস্থিতি দেখানো হয়েছে, যেখানে এক-তৃতীয়াংশ স্কুলে এখনও বিদ্যুৎ নেই এবং দুই-তৃতীয়াংশ স্কুলে ইন্টারনেটের সুবিধা নেই। এসব বৈষম্য এআইয়ের সুফল গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করছে।
বিশ্বব্যাংক এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য তিনটি ধাপের সুপারিশ করেছে। প্রথমত বিশ্বজুড়ে বিদ্যমান এআই সরঞ্জামগুলো গ্রহণ ও ব্যবহার করতে হবে। দ্বিতীয়ত এসব সরঞ্জাম যেন স্থানীয় ভাষা ও পরিবেশের সঙ্গে মানানসই হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত ধাপে ধাপে নিজস্ব এআই পরিকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এই উদ্যোগগুলো গ্রহণের মাধ্যমে বৈষম্য কমানো সম্ভব, তবে তা সময় ও সম্পদের ব্যাপক প্রয়াস দাবি করবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জন্য এই প্রযুক্তি একদিকে যেমন উন্নয়নের দ্বার খুলে দিচ্ছে, অন্যদিকে বৈষম্য বাড়ানোর আশঙ্কাও রয়েছে। তাই, এআইয়ের সুফল ও ঝুঁকি সমানভাবে বিবেচনায় নিয়ে সঠিক নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তোলার গুরুত্ব অপরিহার্য। প্রযুক্তি যেন ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করে, পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ থেকে দূরে থাকে- এমন নজরদারির প্রয়োজনীয়তা বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
আমাদের জন্য এখনই সময় কাজের দিকটি দেখতে হবে। প্রযুক্তি যদি সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয়, তবে এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন ও সমতা অর্জিত হতে পারে। অন্যথায়, বৈষম্য ও অশান্তি আরও বেড়ে যেতে পারে। তাই, সবাইকে সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে, যাতে এআই প্রযুক্তি মানবতার কল্যাণে কাজ করে, বিভেদের জন্য নয়। প্রযুক্তির এই পরিবর্তনকে গ্রহণ করে এক নতুন, সমৃদ্ধ ও সমতামূলক ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা আমাদের সবার দায়িত্ব।
সময়ের আলো/এসএকে