ছিনতাইকারীরা সমাজ ও মানবজীবনে সরাসরি ভয়, আতঙ্ক এবং নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে। তারা শুধু মানুষের কষ্টার্জিত সম্পদই কেড়ে নিচ্ছে না, বরং আকস্মিক আক্রমণ বা ছুরিকাঘাতে অনেক সময় অকালে প্রাণহানিও ঘটছে। সাম্প্রতিক ছিনতাইকারীদের হাতে একের পর এক যে প্রাণহানি ঘটছে তা উদ্বেগজনক। ছিনতাইকারী বেড়ে যাওয়ায় সমাজের সবাই উদ্বিগ্ন।
ছিনতাইকারীদের গ্রেফতার ও মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। মূল দায়িত্ব রাষ্ট্রের হলেও এ জন্য সমাজের সবাইকেই এগিয়ে আসতে হবে। রাজধানীতে নৃশংস হয়ে উঠেছে ছিনতাইকারীরা। একের পর এক প্রাণহানি ঘটলেও ছিনতাইকারীদের ঠেকাতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
মোটরসাইকেল আর প্রাইভেটকার নিয়ে মহাসড়ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ভয়ংকর ছিনতাইকারী। ব্যবহার করছে অস্ত্র। সাধারণ পথচারী ও রিকশায় থাকা যাত্রীদের হাতের ব্যাগ, গায়ের গহনা টেনে মুহূর্তে উধাও হয়ে যাচ্ছে এই অপরাধীরা। আর বাধা বা প্রতিরোধের চেষ্টা করলেই প্রাণ হারাতে হচ্ছে নিরীহ মানুষকে। অস্ত্রের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
রাজধানীর অনিন্দ্যসুন্দর সকালের পিচঢালা পথকে রক্তাক্ত করে তুলছে ছিনতাইকারীরা। রাস্তা থেকে নির্বিঘ্নে কেউ বাসায় যেতে পারবে- এমন নিশ্চয়তা নেই। পথে পথে ছিনতাই আতঙ্ক।
রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে এবং মাঝেমধ্যেই তা প্রাণঘাতী রূপ নিচ্ছে। সাম্প্রতিক রাতের আঁধারে বা ভোরে রিকশায় যাতায়াতের সময় হ্যাঁচকা টানে পড়ে গিয়ে অথবা ছিনতাইকারীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে মর্মান্তিক মৃত্যু ও গুরুতর আহত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে প্রতিনিয়তই।
১১ জুন রাত পৌনে ১টার দিকে শেরেবাংলা নগর থানাধীন জিয়া উদ্যানসংলগ্ন গ্লাসব্রিজ এলাকায় তিন ছিনতাইকারী একটি অটোরিকশা ছিনতাই করে পালানোর চেষ্টা করে। এ সময় জিয়া উদ্যানে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা ছিনতাইকারীদের ধাওয়া করলে তারা দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। পুলিশ সদস্যরা ধাওয়া করে জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের গেটের সামনে পৌঁছালে ছিনতাইকারীদের আটক করার সময় তারা ধারালো অস্ত্র দিয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালায়।
ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে এসআই শামসুজ্জোহা সরকার এবং কনস্টেবল হৃদয় বড়ুয়া গুরুতর আহত হন। তবে গুরুতর আহত অবস্থায় দুই ছিনতাইকারীকে জনতার সহায়তায় তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেফতার করেন তারা। এ ছাড়া রাজধানীতে ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে রিকশা থেকে পড়ে আহত সেই নারীর মৃত্যু হয়েছে। রাজধানীতে ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে রিকশা থেকে পড়ে গুরুতর আহত হওয়া সোহেলী ইসলাম সোমা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। জানা গেছে, ঈদের ছুটি কাটিয়ে ঢাকায় ফেরার পথে গত ৬ জুন ভোরে এ ঘটনার শিকার হন তিনি। নিহত সোমা একটি ওষুধ কোম্পানি এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালসের বিক্রয় কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
ঈদের ছুটি কাটিয়ে কলেজপড়ুয়া মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় ফিরছিলেন সোমা। ভোরে বাস থেকে নেমে ব্যাটারিচালিত রিকশায় সেন্ট্রাল রোডের বাসার উদ্দেশে রওনা দেন তারা। পথে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে মোটরসাইকেলে আসা ছিনতাইকারীরা তার হাতব্যাগ টান দিলে তিনি রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে যান।
এতে তার মাথা সড়ক বিভাজকের সঙ্গে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে গুরুতর জখম হন। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং পরে আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে কয়েক দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর তিনি মারা যান।
সমাজে যারা ছিনতাই বা ডাকাতি করে, জনসাধারণকে আতঙ্কে রাখে কিংবা শারীরিক ও আর্থিক ক্ষতিতে ফেলে, তাদের বসবাস আমাদের আশপাশেই। ছিনতাইকারীরা বিশেষত সন্ধ্যা, রাত, ভোর কিংবা তাদের সুযোগমতো সময় বেছে নিয়ে ছিনতাই বা ডাকাতিতে নেমে পড়ে। পথচারীদের সঙ্গে থাকা মূল্যবান দ্রব্যসামগ্রী যেমন স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, ক্যামেরা, মানিব্যাগ, অলংকার ইত্যাদি ছিনিয়ে নেয়।
অনেক ছিনতাইকারী পথচারীদের শারীরিকভাবে আঘাত করে থাকে, যা কখনো কখনো মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ছিনতাইকারীরা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে থাকে। ভালো মানুষের অভিনয় করে সর্বস্বান্ত করে যায়। বাস, রিকশা, ট্রেন থেকে মোবাইল ফোন, ব্যাগ বা মূল্যবান জিনিস হঠাৎ করে টান দিয়ে নিয়ে সটকে পড়ে। ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িতরা মাদকাসক্ত, কোনো কারণে বিভ্রান্ত অথবা বিপথগামী হয়ে উঠেছে। এদের গ্রেফতার করে সংশোধনের ব্যবস্থা করা উচিত। তাই ছিনতাই বন্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।
ছিনতাই বন্ধে আমাদের সোচ্চার হতে হবে। প্রতিটি গ্রাম-মহল্লায় ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করতে হবে, এদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। যুবসমাজকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে ছিনতাইকারীদের ধরে আইনের হাতে তুলে দিতে। সমাজ হোক ছিনতাইমুক্ত আর নিরাপদ। মানুষ জীবনযাপন করুক শান্তি ও শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে। ছিনতাইপ্রবণ এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে যাত্রাবাড়ী মোড়, জুরাইন রেলগেট, পোস্তগোলা ব্রিজ ও আশপাশের এলাকা, কমলাপুর রেলস্টেশন ও পীরজঙ্গি মাজার এলাকা, টিকাটুলী মোড়, বঙ্গভবন এলাকা, গোপীবাগ এলাকা, মতিঝিল রোড, আরামবাগ, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল, দয়াগঞ্জ, পুরানা পল্টন মোড়, কাকরাইল মোড়, রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতাল এলাকা, পুলিশ লাইন্স থেকে শাহজাহানপুর, খিলগাঁও রেলগেট থেকে তেজগাঁও রেললাইন, ফার্মগেট ওভারব্রিজ এলাকা, তেজতুরী বাজার, তেজকুনিপাড়া, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকা, মৎস্য ভবন, শিশুপার্ক ও শাহবাগ মোড়, দোয়েল চত্বর থেকে চানখাঁরপুল, আজিমপুর, নিউমার্কেটের দক্ষিণের রাস্তা, সদরঘাট, টিপু সুলতান রোড, গাবতলী থেকে টেকনিক্যাল হয়ে দারুসসালাম, মিরপুর গোলচত্বর, চিড়িয়াখানা রোড, বিআরটিএ এলাকা, ভাসানটেক, কামরাঙ্গীরচর এলাকা, মিরপুর বেড়িবাঁধ, খিলক্ষেত থেকে বিমানবন্দর, মোহাম্মদপুর, বসিলা, বনশ্রী থেকে ডেমরা রোডগুলো ছিনতাইয়ের ডেঞ্জার জোন নামে পরিচিত।
এসব স্থানে প্রকাশ্য দিনদুপুরে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর এবং ভোরে এসব স্থান দিয়ে পথচারীদের আসা-যাওয়ায় আতঙ্ক বিরাজ করে। ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত দুই মাসে অন্তত দুই শতাধিক ভুক্তভোগী চিকিৎসা নিয়েছেন।
আরও পড়ুন
তাদের মধ্যে অনেকেই প্রাথমিক চিকিৎসা আবার অনেকেই দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা নিয়েছেন। চিকিৎসা নিতে আসা বেশিরভাগই ছোরার আঘাতের রোগী। সাধারণ জখম হলে প্রাথমিক চিকিৎসা আর মারাত্মক জখমের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা নিচ্ছেন অনেকে। এর বাইরে ছোটখাটো আঘাতের জন্য বেসরকারি হাসপাতালেও যান অনেকে। তবে ছিনতাইয়ের ঘটনার শিকার ভুক্তভোগীরা অনেকেই থানা পুলিশের ঝামেলা এড়ানোর জন্য মামলা করতে চান না।
সমাজকে ছিনতাইকারীর হাত থেকে রক্ষা করতে হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর টহল, জনসচেতনতা এবং সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এবং যুবসমাজকে বিপথগামী হওয়া থেকে ফেরানো অত্যন্ত জরুরি।
ইদানীং ঢাকা শহরের বিভিন্ন অঞ্চলে সময়ে-অসময়ে রিকশারোহীদের কাছ থেকে হ্যাঁচকা টানে ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনতাইয়ের ঘটনা অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। ভোরের সময়টুকু ছিনতাইকারীদের জন্য মোক্ষম সময়। তাই ভোরের ঢাকা মানেই এখন আতঙ্কের বিষয়। ওই সময়ে জনসমাগম কম থাকে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের তৎপরতাও শিথিল থাকে।
ছিনতাইকারীরা প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাসযোগে আরোহীদের টার্গেট করে পিছু নেয়। এরপর সুযোগ বুঝে আক্রমণ করে। এ সময় সাধারণ পথচারীরাও ছিনতাইয়ের কবলে পড়েন। এসব ছিনতাইয়ের ঘটনায় টাকা-পয়সা, গহনাগাটি বা মোবাইল তো হারানোর সঙ্গে সঙ্গে রিকশা থেকে পড়ে কেউ কেউ আহত হন।
এমনকি কোনো কোনো হতভাগাকে এতে জীবনও দিতে হয়েছে। এসব অপ্রত্যাশিত, উটকো বিপদাপদ থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখতে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। কথায় বলে, সাবধানের মার নেই। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সদস্যদের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে নিজেদেরও কিছু বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। মানুষ তার প্রয়োজনে রাস্তায় বের হবেই।
এ জন্য মানুষকে অবশ্যই সংকোচহীনভাবে পথ চলতে হবে। সে জন্য দরকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সদস্যদের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। ছিনতাইকারীরা যেহেতু প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস নিয়ে ছিনতাইকর্মগুলো করে থাকে সেহেতু তাদের চেনা মুশকিল। এ জন্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে তাদের গোয়েন্দা কার্যক্রম বৃদ্ধি করে ছিনতাইকারী গ্রুপগুলোকে চিহ্নিত করে ধরাশায়ী করতে হবে। এ জন্য গোয়েন্দা কার্যক্রম বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে।
সাবেক রেজিস্ট্রার, জাবিপ্রবি
এএডি/