দারিদ্র্য ঘোচাবে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু

রেজাউল করিম, গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী)

সারাদেশ

পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার যোগাযোগব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। তবে এই সুফল থেকে এখনও অনেকটা বঞ্চিত

2026-06-18T03:58:38+00:00
2026-06-18T03:58:38+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬,
৪ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬
সারাদেশ
দারিদ্র্য ঘোচাবে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু
রেজাউল করিম, গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী)
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬, ৩:৫৮ এএম   (ভিজিট : ৭)
ছবি : সংগৃহীত
পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার যোগাযোগব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। তবে এই সুফল থেকে এখনও অনেকটা বঞ্চিত রাজবাড়ী, মাগুরা, কুষ্টিয়া ও মেহেরপুরসহ এই অঞ্চলের একটি বড় অংশ। দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে দীর্ঘদিনের ভোগান্তি নিরসন এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু। 

দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন থেকে শুরু করে দেশের দারিদ্র্য বিমোচন ও প্রবৃদ্ধির বিকাশে পদ্মা সেতু সহায়ক হবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। অর্থনৈতিক তৎপরতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। সেই বিবেচনায় এখন পদ্মা সেতুর তাৎপর্য অনেক বেশি। পদ্মা সেতুর বড় দিক হলো মধ্যপশ্চিম, দক্ষিণ-পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের ফেরি পারাপারের দীর্ঘ সময় অপচয় ও ভোগান্তির অবসান। এর অর্থনৈতিক উপযোগ হচ্ছে যাত্রী ও পণ্যবাহী যানের ভ্রমণ সময়, জ্বালানি খরচ ও শ্রমঘণ্টা সাশ্রয়। এ অঞ্চলকেন্দ্রিক কাঁচা ও পচনশীল কৃষি ফলন ও মৎস্য অর্থনীতিকে গতিশীল করবে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু।
 
এ বিষয়ে রাজবাড়ী সদর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক রফিকুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, পদ্মা সেতু আমাদের গর্ব। কিন্তু রাজবাড়ীবাসীর জন্য দ্বিতীয় পদ্মা সেতু এখন বাঁচার দাবি। অসুস্থ রোগী নিয়ে ঘাটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকা যে কী কষ্টের, তা শুধু ভুক্তভোগীরাই জানেন। আমরা চাই দ্রুত এই প্রকল্পের কাজ শুরু হোক।  

রাজবাড়ী-১ আসনের সংসদ সদস্য ও সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, পদ্মা ব্যারেজ ও দ্বিতীয় পদ্মা সেতু হলে দৌলতদিয়ার মাটি স্বর্ণে পরিণত হবে। এই বিএনপি নেতা আরও বলেন, আমি বরাবরই দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া পয়েন্টে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু এবং পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের জোরালো দাবি জানিয়ে আসছি। আমি মনে করি, এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে রাজবাড়ীসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আর্থসামাজিক অবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন ঘটবে। 
 
সরকার দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে যাচ্ছে জানিয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, তিনটি প্রস্তাবনা আছে। এক নম্বর প্রস্তাবনা, দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া পয়েন্টে করা হতে পারে। ফিজিবিলিটি স্টাডি অলরেডি কমপ্লিট। অর্থায়নের জায়গাটা নিয়ে ভাবছি, কথা বলছি। অন্যান্য প্রাক-প্রস্তুতি চলছে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পূর্ণাঙ্গ উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে একটি মাত্র সেতু যথেষ্ট নয়। লোড শেয়ারিং এবং বিকল্প রুটের সহজলভ্যতার জন্য দ্বিতীয় সেতুটি নির্মাণ করা জরুরি। এটি মূলত প্রস্তাবিত এশিয়ান হাইওয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেও কাজ করবে। দ্বিতীয় পদ্মা সেতু কেবল রাজবাড়ীবাসীর আবেগ নয়, এটি দেশের অর্থনীতির চাকা আরও সচল করার একটি অপরিহার্য চাবিকাঠি। দেশের অগ্রযাত্রায় রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া পয়েন্টে এই সেতুটি হবে উন্নয়নের এক নতুন মাইলফলক। সরকারের মেগা প্রকল্পগুলোর তালিকায় অচিরেই দ্বিতীয় পদ্মা সেতু স্থান পাবে= এমনটাই প্রত্যাশা এই অঞ্চলের কোটি মানুষের।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) দারিদ্র্য মানচিত্র অনুযায়ী, পদ্মার ওপারের ২১টি জেলায় ১৩৩টি উপজেলা আছে। এর মধ্যে ৫৩টি উপজেলা উচ্চ দারিদ্র্য ঝুঁকিতে আছে। এসব উপজেলার মধ্যে ২৯টি বরিশাল বিভাগে। এ ছাড়া ৪২টি উপজেলা মধ্যম দারিদ্র্য এবং ৩৮টি নিম্নদারিদ্র্য ঝুঁকিতে আছে। সেতু চালুর পর ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হলে দ্রুত ওই এলাকার মানুষের আয় বেড়ে দারিদ্র্য বিমোচন হবে। বিনিয়োগের দিক থেকে দক্ষিণাঞ্চলের পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগের সময় ও দূরত্ব। বেনাপোল ও ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে ভারতের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি আমদানি-রফতানি হয়। এসব পণ্যবাহী ট্রাককে যমুনা সেতু ঘুরে কিংবা মাওয়া দিয়ে যাতায়াত করতে হয়।
 
পরিবহন ব্যবসায়ীরা বলছেন, বেনাপোল থেকে রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় আসতে এখন ২৪ থেকে ৩৬ ঘণ্টা লাগে। দ্বিতীয় পদ্মা সেতু হলে ৬-৭ ঘণ্টায় পণ্য পরিবহন করা যাবে। এতে আমদানি-রফতানির খরচ ও সময় দুটোই বাঁচবে। দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৯ জেলাকে সারা দেশের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করবে এই সেতু। যোগাযোগ সহজ হওয়ার পাশাপাশি অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে পদ্মা সেতু।
 
২০০৫ সালে ২য় পদ্মা সেতুর সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষা অনুযায়ী, ২য় পদ্মা সেতু চালু হলে ১ দশমিক ২৩ শতাংশ হারে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বৃদ্ধি পাবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিডিপি বাড়বে ২ দশমিক ৩ শতাংশ। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ পয়েন্টে (দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া) এই সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনা চললেও তা এখনও বাস্তবায়নের অপেক্ষায়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দৌলতদিয়া-পাটুরিয়ায় দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় পদ্মা সেতু দেশের জন্য অপরিহার্য। কারণ দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া রুটের দীর্ঘস্থায়ী ভোগান্তি নিরসন এখন সময়ের দাবি। বর্তমানে এই নৌরুট দিয়ে প্রতিদিন কয়েক হাজার যানবাহন পারাপার হয়। 

কুয়াশা, নাব্যতা সংকট কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফেরি চলাচল ব্যাহত হলে দৌলতদিয়া ও পাটুরিয়া ঘাটে মাইলের পর মাইল যানজট তৈরি হয়। দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মিত হলে এই চিরচেনা ভোগান্তি চিরতরে বিলীন হবে। রাজবাড়ী, কুষ্টিয়া ও যশোর অঞ্চলের সবজি ও পচনশীল পণ্য দ্রুত ঢাকার বাজারে পৌঁছাতে এই সেতু হবে আশীর্বাদস্বরূপ। বর্তমানে ফেরিঘাটে দীর্ঘ সময় আটকে থাকায় অনেক পণ্য নষ্ট হয়ে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। সেতুটি হলে কৃষক তাদের পণ্যের সঠিক মূল্য পাবেন এবং গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হবে। দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মিত হলে ঢাকা থেকে রাজবাড়ীর দূরত্ব কমবে অন্তত ৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটার।

এতে শুধু সময় নয়, যানবাহনের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি খরচও সাশ্রয় হবে, যা দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। পদ্মা সেতু (মাওয়া পয়েন্ট) ঘিরে যেমন শিল্পায়ন শুরু হয়েছে, রাজবাড়ীতে দ্বিতীয় সেতু হলে এই জেলাও শিল্পনগরীতে পরিণত হবে। বিসিক শিল্পনগরীসহ নতুন নতুন কল-কারখানা গড়ে উঠবে যার ফলে স্থানীয় শিক্ষিত যুবসমাজের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল এবং দর্শনার সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগ সবচেয়ে সহজ পথ হলো দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া। 

দ্বিতীয় পদ্মা সেতু হলে ভারত থেকে আমদানিকৃত কাঁচামাল ও রফতানি পণ্য অতি দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা- এই তিন নদী বাংলাদেশের ভূখণ্ডকে মূল তিনটি ভাগে ভাগ করেছে। ঢাকা ঘিরে মধ্যাঞ্চল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগ নিয়ে পূর্বাঞ্চল এবং রাজশাহী, রংপুর, খুলনা ও বরিশাল নিয়ে পশ্চিমাঞ্চল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পর্যায়ক্রমে সড়ক যোগাযোগ বিস্তৃত হয়েছে। 

মেঘনা, মেঘনা-গোমতী, বঙ্গবন্ধু ও ভৈরব সেতু নির্মাণের ফলে মধ্য, পূর্বাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর সরাসরি সড়ক যোগাযোগ সম্ভব হয়। সারা দেশকে সড়ক যোগাযোগে এক সুতায় বাঁধার কাজটি আটকে ছিল পদ্মা নদীর কারণে। মুন্সীগঞ্জের মাওয়া দিয়ে ফেরিতে ওঠার পর পদ্মা নদী পার হতে সময় লাগে দুই ঘণ্টা। মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া দিয়ে লাগে ৩৫ থেকে ৪০ মিনিট। মাওয়া ফেরিঘাটে যাত্রীবাহী যানবাহনকে গড়ে দুই ঘণ্টা ও পণ্যবাহী যানকে আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকতে হয়। অবশ্য ঈদ, বড় ছুটি অথবা শীতে ঘন কুয়াশায় ফেরিঘাটে ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টাও অপেক্ষা করার নজির রয়েছে। 

/আআ


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: