আদিবাসী শিক্ষার্থীদের আড়ালে ঢাকা সংগ্রাম

হ্লাথোয়াইছা চাক, রাবি

শিক্ষা

ক্যাম্পাসের এক কোণে একা বসে থাকা মেয়েটির দিকে হয়তো কেউ ফিরেও তাকায় না। কিন্তু তার গল্পটা জানলে থমকে যেতে হয়।

2026-06-18T04:04:09+00:00
2026-06-18T04:04:09+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬,
৪ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬
শিক্ষা
পাহাড়ের পথ পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে
আদিবাসী শিক্ষার্থীদের আড়ালে ঢাকা সংগ্রাম
হ্লাথোয়াইছা চাক, রাবি
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬, ৪:০৪ এএম   (ভিজিট : ৭)
ছবি : সংগৃহীত
ক্যাম্পাসের এক কোণে একা বসে থাকা মেয়েটির দিকে হয়তো কেউ ফিরেও তাকায় না। কিন্তু তার গল্পটা জানলে থমকে যেতে হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এক গ্রাম থেকে উঠে আসা এই তরুণী এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তার পরিবারের ইতিহাসে তিনিই প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠ পেরিয়েছেন। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে আসা সেই মেয়েটির স্বপ্ন ছোট নয়। সে এক দিন নিজের সম্প্রদায়ের জন্য কাজ করতে চায়। 

তার সেই পথটুকু মসৃণ করে দেওয়ার দায়িত্ব এই সমাজ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর। কারণ একটি জাতির প্রকৃত অগ্রগতি তখনই নিশ্চিত হয় যখন সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া মানুষটিও সমান গতিতে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। এমন গল্প শুধু পাহাড়ের সেই মেয়েটির নয়। প্রতি বছর চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, চাক, সাঁওতাল, গারোসহ নানা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর তরুণরা বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজায় এসে দাঁড়ান। তারা শুধু একটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আসেন না, সঙ্গে বহন করেন বহু বছরের বঞ্চনা, সীমিত সুযোগ এবং একটি পুরো সম্প্রদায়ের সঞ্চিত স্বপ্ন।

ক্যাম্পাসে পা রাখা মানেই কি সমান সুযোগ : বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার পরিসর বেড়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু এই বিস্তার কি সবার জন্য সমান সুযোগ এনেছে? একজন আদিবাসী শিক্ষার্থীর কাছে প্রশ্নটির উত্তর প্রায়ই হতাশাজনক। ক্যাম্পাসে আসার আগেই তাকে অতিক্রম করতে হয় এমন বাধা যা তার অনেক সহপাঠীর কাছে সম্পূর্ণ অদৃশ্য। প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত দ্বিতীয় ভাষায় পড়াশোনার চাপ, পাহাড়ি বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানসম্পন্ন প্রস্তুতির সুযোগের অভাব, পারিবারিক আর্থিক সংকট- এগুলো প্রায়ই স্বপ্নের পথে বড় দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়। তারপরও তারা আসেন। এটিই তাদের অদম্যতার পরিচয়।

ভাষা দুর্বলতা নয়, পরিচয় : বিশ্ববিদ্যালয়ে এলে চ্যালেঞ্জ শেষ হয় না, নতুন রূপ নেয়। ক্লাসে কিছু উপস্থাপন করার সময়, সেমিনারে মতামত জানানোর সময়, শিক্ষকের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার সময় অনেক আদিবাসী শিক্ষার্থী এক অদৃশ্য সংকোচে আটকে যান। এটি মেধার সীমাবদ্ধতা নয়, এটি সেই ভাষার চাপ যা শৈশব থেকে তাদের সঙ্গী।

মাতৃভাষায় স্বাচ্ছন্দ্যময় একজন মানুষ যখন তৃতীয় বা চতুর্থ ভাষায় নিজেকে প্রকাশ করতে গিয়ে থমকে যান তখন অনেকেই সেটিকে বুদ্ধিমত্তার ঘাটতি ভাবেন। এই ভুল মূল্যায়ন শিক্ষার্থীর ভেতরে এক স্থায়ী ক্ষত তৈরি করে। একটি উচ্চারণের ভিন্নতা বা বাক্য গঠনের তারতম্য কখনোই কোনো শিক্ষার্থীর সম্ভাবনার পরিমাপক হতে পারে না। অথচ বাস্তবে অনেক আদিবাসী শিক্ষার্থী এমন পরিস্থিতির মুখে পড়েন যেখানে তার ভাষাগত পরিচয়কেই দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয় যদি সত্যিকার অর্থে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হতে চায় তবে ভাষাগত বৈচিত্র্যকে বোঝা নয়, সম্পদ হিসেবে দেখতে শিখতে হবে।

হাজার মানুষের ভিড়েও একাকিত্ব : বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস সবসময় মুখর ও প্রাণবন্ত। কিন্তু এই বিশাল ভিড়ের মাঝেও অনেক আদিবাসী শিক্ষার্থী এক গভীর একাকিত্ব বহন করেন। নিজের ভাষায় মনের কথা বলার মানুষ নেই, নিজের উৎসব পালনের সুযোগ নেই, নিজের সংস্কৃতির চর্চার জায়গা নেই। সঙ্গে আছে পোশাক, চেহারা বা উচ্চারণ নিয়ে নানা মন্তব্য। কখনো সরাসরি, কখনো পরোক্ষভাবে হয় এই আক্রমণ। সেমিনার কক্ষে একটি ব্যঙ্গাত্মক হাসি, হলের করিডোরে একটি অপ্রয়োজনীয় মন্তব্য, পরিচয় পর্বে বিস্মিত দৃষ্টি- এসব মুহূর্ত দৃশ্যমান বৈষম্য না হলেও ভেতরে ভেতরে চাপ জমতে থাকে। একসময় সেই চাপ বহন করা কঠিন হয়ে ওঠে।

টাকার অভাবে কি মেধা থামবে : পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া শুধু মেধার প্রশ্ন নয়, এটি সামর্থ্যরে প্রশ্নও। বাংলাদেশের বহু আদিবাসী পরিবার এখনও অত্যন্ত সীমিত আয়ে জীবনযাপন করেন। ছেলে বা মেয়েটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে- এই খবর পরিবারে আনন্দ আনে ঠিকই, কিন্তু সেই আনন্দের পেছনে থাকে চাপাপড়া উদ্বেগও। আবাসন, বই, ইন্টারনেট, খাওয়া সব মিলিয়ে প্রতি মাসের খরচ অনেক পরিবারের পুরো মাসের আয়কে ছাড়িয়ে যায়। তাই অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি বা খণ্ডকালীন কাজ করেন। অর্থের চাপ কিছুটা কমে, কিন্তু পড়ার সময় ও মনোযোগ কমে আরও বেশি। কিছু বৃত্তি কার্যক্রম থাকলেও সেগুলো প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য এবং আবেদন প্রক্রিয়া এতটাই জটিল যে, তথ্যের অভাবে অনেকেই সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত থেকে যান।

পাঠ্যবইয়ে যে ইতিহাস অনুপস্থিত : বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে বাংলাদেশের ইতিহাস, সাহিত্য আর সমাজ নিয়ে অনেক কথা হয়। কিন্তু সেই আলোচনায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ইতিহাস বা জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্য কতটুকু জায়গা পায়? একজন আদিবাসী শিক্ষার্থী যখন দেশের ইতিহাস পড়েন, তখন তিনি সেই পাঠ্যক্রমে নিজের সম্প্রদায়ের কোনো প্রতিফলন খুঁজে পান না। 

তার পূর্বপুরুষের জ্ঞান, তার সংস্কৃতির সৌন্দর্য, তার ভাষার সাহিত্য সবই মূলধারার শিক্ষায় অনুপস্থিত। এই অনুপস্থিতি শুধু একটি পাঠ্যক্রমের ত্রুটি নয়, এটি একটি জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বকে নীরবে অস্বীকার করার নামান্তর। পরিবেশ সংরক্ষণ, টেকসই জীবনধারা আর সামাজিক সহাবস্থানের প্রশ্নে পৃথিবীর অনেক দেশ এখন আদিবাসী জ্ঞানব্যবস্থাকে মূলধারার শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করছে। বাংলাদেশেও এই ভাবনার সময় এসেছে।

পরিবর্তন কোথা থেকে শুরু হবে : সমস্যাগুলো জটিল, কিন্তু অসমাধানযোগ্য নয়। আদিবাসী শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকর বৃত্তি দরকার। ভাষাগত বৈচিত্র্যকে সম্মান করার সংস্কৃতি দরকার। পাঠ্যক্রমে আদিবাসী ইতিহাস ও সংস্কৃতির যথাযথ স্থান দরকার। আর সবচেয়ে জরুরি, নীতিনির্ধারণের টেবিলে আদিবাসী প্রতিনিধিত্ব দরকার। কারণ যাদের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে তাদের কণ্ঠস্বর সেই প্রক্রিয়ায় না থাকলে সিদ্ধান্তগুলো কখনো সঠিক হয় না।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত সৌন্দর্য তার একরূপতায় নয়, তার বৈচিত্র্যে। আর সেই বৈচিত্র্যের ভেতরেই লুকিয়ে আছে আরও ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশের সম্ভাবনা।

/আআ


Loading...
Loading...
শিক্ষা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: