করাচিতে পৌঁছানোর পর চীনে নির্মিত নতুন হাঙ্গর-শ্রেণির সাবমেরিন পিএনএস হাঙ্গরকে আনুষ্ঠানিক নৌ-অভ্যর্থনা জানায় পাকিস্তান নৌবাহিনী। ছবি : ইন্ডিয়া টুডে
১৯৭১ সালের যুদ্ধে পরাজয়ের পর থেকে বঙ্গোপসাগরে কার্যত কোনো উল্লেখযোগ্য নৌ উপস্থিতি ছিল না পাকিস্তানের। তবে পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর সেই বাস্তবতা বদলাতে চাইছে ইসলামাবাদ। চীনে নির্মিত নতুন হাঙ্গর-শ্রেণির সাবমেরিন বহরে যুক্ত হওয়ার পর পাকিস্তান নৌবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা বঙ্গোপসাগরে নিয়মিত উপস্থিতি বজায় রাখার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
গত সপ্তাহে চীনে নির্মিত প্রথম হাঙ্গর-শ্রেণির সাবমেরিন পিএনএস হাঙ্গর করাচিতে পৌঁছায়। এর পরপরই পাকিস্তান নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, নতুন এই সাবমেরিন শুধু আরব সাগরে নয়, প্রয়োজনে বঙ্গোপসাগরেও দীর্ঘমেয়াদি অভিযান পরিচালনা করতে সক্ষম।
নতুন কৌশলে পাকিস্তান
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তান হারিয়ে বর্তমান বাংলাদেশের জন্ম হয়। সেই যুদ্ধে ভারতীয় বাহিনীর কাছে পরাজয়ের ফলে বঙ্গোপসাগরে পাকিস্তানের সামরিক উপস্থিতি কার্যত বিলুপ্ত হয়ে যায়। এরপর থেকে পাকিস্তানের নৌ তৎপরতা মূলত আরব সাগরকেন্দ্রিক ছিল।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কৌশলগত প্রতিযোগিতা বাড়তে থাকায় পাকিস্তান এখন আরও বিস্তৃত নৌ উপস্থিতি গড়ে তুলতে চাইছে। পাকিস্তান নৌবাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, হাঙ্গর-শ্রেণির নতুন সাবমেরিনগুলো তাদেরকে দূরবর্তী এলাকায় দীর্ঘ সময় মোতায়েন থাকার সুযোগ দেবে।
বঙ্গোপসাগর দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের অন্যতম কৌশলগত অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত। ভারতের পূর্ব নৌ কমান্ডের সদর দফতর বিশাখাপত্তনমে অবস্থিত এবং আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জও এ অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এছাড়া ভারত, বাংলাদেশ, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও শ্রীলঙ্কাসহ একাধিক দেশের জন্য বঙ্গোপসাগর একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহন রুট। ফলে এখানে নতুন কোনো নৌশক্তির সক্রিয় উপস্থিতি আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ-পাকিস্তান ঘনিষ্ঠতা নতুন মাত্রা যোগ করছে
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের এই পরিকল্পনার সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সামরিক যোগাযোগ বেড়েছে।
দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সমুদ্রপথে বাণিজ্য পুনরায় চালু হয়েছে। ২০২৫ সালে পাকিস্তানি যুদ্ধজাহাজ পিএনএস সাইফ চট্টগ্রাম সফর করে, যা ১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশে কোনো পাকিস্তানি যুদ্ধজাহাজের প্রথম সফর ছিল।
এছাড়া দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো, যৌথ মহড়ায় অংশগ্রহণ এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা পাকিস্তানের জন্য নতুন কৌশলগত সুযোগ তৈরি করছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ পাকিস্তানের নৌবাহিনীকে কোনো সামরিক ঘাঁটি বা স্থায়ী সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে— এমন কোনো তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।
উত্তর ভারত মহাসাগর অঞ্চলে ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার সামুদ্রিক সীমানার অবস্থান দেখানো হয়েছে এই মানচিত্রে। তবে এটি প্রকৃত স্কেল অনুযায়ী অঙ্কিত নয়। ছবি : ইন্ডিয়া টুডে
হাঙ্গর-শ্রেণির সাবমেরিন কতটা শক্তিশালী?
পাকিস্তান মোট আটটি হাঙ্গর-শ্রেণির সাবমেরিন নৌবহরে যুক্ত করার পরিকল্পনা করেছে। করাচিতে পৌঁছানো পিএনএস হাঙ্গর এই বহরের প্রথম সদস্য।
চীনে নির্মিত এসব সাবমেরিনে এয়ার-ইন্ডিপেনডেন্ট প্রপালশন (এআইপি) প্রযুক্তি রয়েছে বলে জানা গেছে। এর ফলে সাবমেরিনগুলো দীর্ঘ সময় পানির নিচে অবস্থান করতে পারে এবং সহজে শনাক্ত করা কঠিন হয়।
সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ভবিষ্যতে এসব সাবমেরিন পাকিস্তানের সমুদ্রভিত্তিক পারমাণবিক প্রতিরোধ সক্ষমতার অংশও হতে পারে, যদিও এ বিষয়ে পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।
ইসলামাবাদ এখনো প্রকাশ্যে জানায়নি যে নতুন হাঙ্গর-শ্রেণির সাবমেরিনগুলো পারমাণবিক অস্ত্র বহন করবে কি না, তবে বিশ্লেষকদের মতে এগুলো পাকিস্তানের সমুদ্রভিত্তিক পারমাণবিক সক্ষমতার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ প্ল্যাটফর্ম হতে পারে। ছবি: ইন্ডিয়া টুডে
ভারতের জন্য কী বার্তা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তানের নতুন সাবমেরিন বহর বঙ্গোপসাগরে শক্তির ভারসাম্য নাটকীয়ভাবে পরিবর্তন করতে পারবে না। কারণ গত পাঁচ দশকে ভারতীয় নৌবাহিনী ব্যাপকভাবে শক্তিশালী হয়েছে। ভারতের হাতে পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন, বিমানবাহী রণতরী এবং উন্নত সামুদ্রিক নজরদারি ব্যবস্থা রয়েছে।
তবে পাকিস্তানের সম্ভাব্য উপস্থিতি ভারতের জন্য একটি নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে যখন ভারত আন্দামান-নিকোবর অঞ্চল এবং বঙ্গোপসাগরে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা আরও বাড়াচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের এই উদ্যোগ তাৎক্ষণিকভাবে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বদলে না দিলেও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান কৌশলগত প্রতিযোগিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।