কিশোরগঞ্জের বগাদিয়া গোল মসজিদ এলাকার এক ওয়ার্কশপে ঢুকতেই শোনা যায় লোহা কাটার শব্দ, চারদিকে ছড়িয়ে আছে ধোঁয়া আর পোড়া লোহার গন্ধ। বড় বড় যন্ত্রপাতির মধ্যে ব্যস্ত কিশোর ফাহাদ। তার বয়স বড়জোর ১২ বছর। সে শিখছে লোহার গ্রিল বানানোর কাজ। এভাবেই কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় নীরবে বেড়ে উঠছে শ্রমজীবী শিশুরা।
জেলা শহর থেকে শুরু করে বিভিন্ন উপজেলার বিভিন্ন ওয়ার্কশপ ও গ্যারেজে প্রতিদিন অসংখ্য শিশু কিশোরকে এভাবে কাজ করতে দেখা যায়।
ফাহাদের বাড়ি সদর উপজেলার বগাদিয়া এলাকায় । তার বাবা এলাকায় রিকশা চালান। সংসারে সদস্য বেশি, তাই দুই বছর আগে থেকেই এ কাজ করে সে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গ্যারেজে কাজ করলেও দিন শেষে পায় সামান্য ২০০ টাকা।
কম মজুরিতে দীর্ঘ সময় কাজ করানো যায় শিশুদের দিয়ে। কর্মক্ষেত্রে এসব শিশুকে ‘সহকারী’ বা ‘কাজ শিখছে’ বলে পরিচয় দেওয়া হয়। অন্যদিকে ফাহাদ এখন পরিবারের উপার্জনকারী। মাত্র ছয় মাসে সহকারী থেকে কারিগর হয়ে উঠেছে সে।ফাহাদ বলে, শুরুতে সহকারী ছিলাম, এখন নিজেই কাজ করি।
ওয়ার্কশপে ঝুঁকিপূর্ন কাজ করছে ফাহাদ (১২)
জেলা শহরের কালিবাড়ি এলাকায় দেখা মেলে ১২ বছরের রাহিমের। সকাল ৮টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মোটর গ্যারেজে কাজ করে সে। নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই ধোঁয়া আর ধুলার, গ্রিজ, পোড়া মবিলের মধ্যে কাজ করতে হয় তাকে। রাহিম বলে, শুরুতে শেখার জন্য আসছিলাম, এখন পুরো সময় কাজ করি। স্কুলে যাওয়ার সময় পাই না।
এদিকে বিশেষজ্ঞদের মতে, দারিদ্র্য ও পরিবারের আর্থিক সংকট শিশুশ্রমের প্রধান কারণ। অনেক শিশু সংসারের দায়ভার নিতে বাধ্য হয়ে কাজে নামছে। যদিও শ্রম আইন অনুযায়ী ১৪ বছরের নিচে শিশুদের কাজ করানো নিষিদ্ধ, বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে সেই আইন মানা হচ্ছে না বলে মনে করছেন তাঁরা।
স্থানীয়রা বলেন, খুব কম মজুরিতে শিশুদের দিয়ে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানো হচ্ছে, যা আইন ও নীতিমালার পরিপন্থী।
গুরুদয়াল সরকারি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক সৌরভী তানিয়া বলেন, শিশুশ্রমের প্রধান কারণ দারিদ্র্য ও শিক্ষার ব্যয়। আর্থিক সংকটের কারণে অনেক পরিবার শিশুদের স্কুলে না পাঠিয়ে কাজে পাঠায়। এ ছাড়া কম মজুরিতে কাজ করানো যায় বলে অনেক নিয়োগকর্তারও শিশু শ্রমিক নিতে আগ্রহ থাকে।
তিনি আরো বলেন,শিশু শ্রমিক নিয়োগকারী শোষণকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং দরিদ্র শিশুদের শিক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সমাজকে আরও বেশি গুরুত্বের সঙ্গে পালন করতে হবে।তবেই শিশুশ্রম বন্ধ করে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করে গড়ে তুলা যাবে আগামী প্রজন্মকে।