ঐতিহাসিক এক চুক্তির মাধ্যমে অবশেষে অবসান ঘটতে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের। দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এই শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। চুক্তি সম্পাদনের পরপরই ইরানের ওপর থেকে নিজেদের বিতর্কিত নৌ-অবরোধ তুলে নিয়েছে ওয়াশিংটন। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) রাষ্ট্রপতির নির্দেশনায় অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে কৌশলগত কারণে ওই অঞ্চলে কিছু মার্কিন যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
এদিকে, চুক্তি স্বাক্ষরের পর প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে মুখ খুলেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতাবা খামেনি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলায় তার পিতা ও সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর, গত মার্চে তিনি দায়িত্ব নেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর এই প্রথম তিনি কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিলেন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা জানান, চুক্তির কিছু বিষয়ে তার ‘ভিন্নমত’ থাকা সত্ত্বেও ইরানি জাতির অধিকার রক্ষার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের দেওয়া আশ্বাসের ভিত্তিতে তিনি এই চুক্তির অনুমোদন দিয়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘মরিয়া হয়ে সব ধরনের চাপ প্রয়োগ’ করে এই চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি। খামেনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে ওয়াশিংটনের সাথে মুখোমুখি আলোচনা হলেও তার অর্থ এই নয় যে ইরান শত্রুর অবস্থান মেনে নিয়েছে।
অন্যদিক, ট্রাম্প সরাসরি খামেনির বক্তব্যের জবাব না দিলেও নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ লিখেছেন, তিনি লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলসহ সব ফ্রন্টে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি কার্যকর দেখতে চান এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এই শান্তি আলোচনার প্রতিশ্রুতি বজায় রাখবে বলে আশা করেন।
অন্যদিকে ইরানের সাথে এই যুদ্ধ অবসানের সিদ্ধান্ত নিয়ে খোদ মার্কিন রাজনীতির অন্দরমহলে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে রিপাবলিকান সিনেটর বিল ক্যাসিডি এই চুক্তিকে ‘কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় পররাষ্ট্রনৈতিক ভুল’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তার দাবি, এর মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা যেমন কমবে না, তেমনি ইরান বুঝতে পারল যে হরমূজ প্রণালী বন্ধের হুমকি দিলে কাজ হয়।
তবে এই সমালোচনার কড়া জবাব দিয়েছেন মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ইরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ধ্বংস না করলে এবং আঞ্চলিক প্রক্সি গ্রুপগুলোকে অর্থায়ন বন্ধ না করলে কোনো নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা অর্থ পাবে না।
একই সাথে ইসরায়েলি মন্ত্রিসভার উগ্রপন্থী সদস্য ইতামার বেন গভির এবং বেজালেল স্মোটরিচের সমালোচনার জবাবে ভ্যান্স ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তারা যেন বাস্তবতার মুখোমুখি হন। ৯ মিলিয়নের একটি দেশ হয়ে কেবল হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে সব জাতীয় নিরাপত্তা সমস্যার সমাধান করা যায় না। একমাত্র শক্তিশালী বন্ধুকে আক্রমণ করার আগে তাদের ভাবা উচিত।
যদিও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সুসম্পর্কের ওপর জোর দিয়েছেন, তবে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ একে অপরের ওপর হামলা অব্যাহত রেখেছে। হিজবুল্লাহ এই চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং ইসরায়েলের দাবি— হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের লড়াই ইরানের চেয়ে আলাদা। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, বৈরুতে বেসামরিক নাগরিক হত্যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং ইসরায়েলকে অবশ্যই এই শান্তি প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে হবে।
/কহু