হিজরি সনের প্রথম মাস মহররম। কুরআন ও হাদিসে এ মাসকে বিশেষ সম্মানিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা মুমিনের জন্য ইবাদত, আত্মশুদ্ধি, তওবা-ইসতিগফার এবং জীবন পরিমার্জনের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ নিয়ে আসে। মহররম মাস আখেরাতমুখী জীবন গঠনের শিক্ষা দেয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এ মাসের প্রকৃত শিক্ষা ভুলে গিয়ে আমরা কেবল ঐতিহাসিক স্মৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ি। কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এ মাসের করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়গুলো আলোচনা করা হলো।
আশুরার রোজা পালন : মহররম মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো নফল রোজা পালন করা। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মহররমের রোজা’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১১৬৩)।
বিশেষভাবে আশুরার রোজার ফজিলত অত্যন্ত বেশি। হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে, এ রোজার মাধ্যমে পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ মাফ হয়ে যায় (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১১৬২)। তাই ৯ ও ১০ অথবা ১০ ও ১১ তারিখে রোজা রাখা সুন্নত ও উত্তম।
তওবা ও ইসতিগফার : মহররম আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ সময়। মুমিনের উচিত এ মাসে বিগত জীবনের গুনাহ ও ভুল-ত্রুটির কথা স্মরণ করে আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে তওবা করা। অন্তরের অনুতাপ, পাপ থেকে ফিরে আসার দৃঢ় সংকল্প এবং ভবিষ্যতে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার অঙ্গীকারের নামই তওবা।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা তওবাকারীদের ভালোবাসেন বলে ঘোষণা করেছেন (সুরা বাকারা, আয়াত : ২২২)।
আল্লাহর এ ঘোষণা তওবার মর্যাদা ও গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। তাই মহররম মাসে বেশি বেশি ইস্তিগফার করা, আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং হৃদয় থেকে গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের আন্তরিক তওবা মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ এবং ইমানকে জাগ্রত করে। পাশাপাশি তাকে নতুনভাবে আল্লাহমুখী জীবন শুরু করার শক্তি ও অনুপ্রেরণা প্রদান করে।
নফল ইবাদত : মহররম আল্লাহর মাস, এ মাস তাই ইবাদত বৃদ্ধি ও আত্মিক উন্নতির জন্য অত্যন্ত উপযুক্ত সময়। একজন মুমিনের উচিত এ সময় ফরজ ইবাদতের পাশাপাশি নফল নামাজ, কুরআন তেলাওয়াত, জিকির-আজকার এবং দোয়া-ইসতিগফারের প্রতি বেশি মনোযোগী হওয়া। নেক আমলের আলো হৃদয়ে প্রবেশ করলে মানুষের চিন্তা-চেতনা, আচার-আচরণ ও জীবনধারায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। ইবাদতের প্রতি গভীর মনোযোগ মানুষকে দুনিয়ামুখী ব্যস্ততা থেকে আখেরাতমুখী চিন্তায় ফিরিয়ে আনে এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের পথে অগ্রসর হতে সহায়তা করে।
গুনাহ থেকে বিরত থাকা : ইবাদতের পাশাপাশি মহররম গুনাহ থেকে বেঁচে থাকারও মাস। সব ধরনের পাপাচার থেকে দূরে থাকা একজন মুমিনের অপরিহার্য গুণ। গুনাহ মানুষের অন্তরকে অন্ধকার করে দেয় এবং আল্লাহর নৈকট্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। মিথ্যা বলা, গিবত করা, সুদ ও ঘুষের সঙ্গে জড়িত থাকা, প্রতারণা, অশ্লীলতা এবং অন্যান্য হারাম কাজ থেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত
থাকার চেষ্টা করা উচিত। মহররমের মতো সম্মানিত মাসে কেউ যদি সচেতনভাবে নিজেকে গুনাহ থেকে সংযত রাখতে পারে, তবে তা জীবনকে পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী অনুপ্রেরণায় পরিণত হবে।
শোকের নামে বেদাত থেকে বেঁচে থাকা : কারবালার মর্মান্তিক ঘটনাকে স্মরণ করতে গিয়ে কেউ কেউ অতিরঞ্জিত শোক প্রকাশ, মাতম, বুক চাপড়ানো কিংবা শরীরকে কষ্ট দেওয়ার মতো কাজ করে, এগুলো ইসলামের শিক্ষা ও সুন্নাহ পরিপন্থী। ইসলাম কখনোই এ ধরনের আত্মকষ্ট বা অসংযত আবেগপ্রবণ আচরণকে সমর্থন করে না। কারবালার প্রকৃত শিক্ষা হলো বিপদের সময় ধৈর্য ধারণ করা এবং সত্যের ওপর অবিচল থাকা, হতাশা বা অযৌক্তিক শোকাচারে লিপ্ত হওয়া নয়।
কুসংস্কার বর্জন করা : মহররম মাসকে ঘিরে সমাজে অনেক ধরনের কুসংস্কার ও ভিত্তিহীন রীতিনীতি প্রচলিত আছে। যেমন নির্দিষ্ট খাবারকে বরকতময় মনে করা, অযৌক্তিক নিয়ম-কানুন পালন করা এবং এমন প্রচলিত আমলে লিপ্ত হওয়া, যার কোনো ভিত্তি কুরআন ও সুন্নাহে নেই। নিজের মনগড়া রীতি বা সমাজে প্রচলিত ধারণাকে দ্বীনের অংশ বানানো ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়।
তাই একজন সচেতন মুমিনের দায়িত্ব হলো এসব কুসংস্কার ও ভিত্তিহীন আমল থেকে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে দূরে রাখা এবং শরিয়তসম্মত ইবাদত ও আমলের ওপর অটল থাকা।
অপচয় ও বিলাসিতা পরিহার : মহররম মাস আমাদের আত্মসংযম ও সাদামাটা জীবনযাপন অনুশীলনের শিক্ষা দেয়। একজন মুমিনের উচিত অপ্রয়োজনীয় খরচ, অপচয় এবং অতিরিক্ত বিলাসিতাপূর্ণ জীবনধারা থেকে নিজেকে দূরে রাখা। ইসলাম স্পষ্টভাবে অপচয়কে নিষেধ করেছে এবং অপচয়কারীদের আল্লাহর অপছন্দের পাত্র হিসেবে উল্লেখ করেছে। তাই সম্পদের যথাযথ ব্যবহার, পরিকল্পিত ব্যয় এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে দান-সদকা করা একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত।
গুনাহমুক্ত জীবনের সূচনা : মহররমের অন্যতম মূল শিক্ষা হলো নতুনভাবে জীবন শুরু করার মানসিকতা তৈরি করা। একজন মুমিন এ মাসে বিগত জীবনের গুনাহগুলো পরিত্যাগ করে আন্তরিকভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। মহররম তাই নিজের পরিবর্তন, সংশোধন এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সুবর্ণ সুযোগ, যা মানুষের ভবিষ্যৎ জীবনকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে সক্ষম।
লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা
সময়ের আলো/এসএকে