হিজরি নববর্ষে মুমিনের আত্মজিজ্ঞাসা

মাওলানা মুহাইমিনুল ইসলাম

ইসলাম

মুসলমানদের সারা বছরের ইবাদত ও আমলের হিসাব গোনা হয় হিজরি সনের মাধ্যমে। ইসলামের ইতিহাস-ঐতিহ্য, ঘটনাবলি এবং অন্যান্য বিধিবিধান সবকিছু এ

2026-06-19T11:40:44+00:00
2026-06-19T11:40:44+00:00
 
  বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬,
১০ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
ইসলাম
হিজরি নববর্ষে মুমিনের আত্মজিজ্ঞাসা
মাওলানা মুহাইমিনুল ইসলাম
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬, ১১:৪০ এএম 
ইসলামের ইতিহাস-ঐতিহ্য, ঘটনাবলি এবং অন্যান্য বিধিবিধান সবকিছু এ হিজরি ক্যালেন্ডারকে কেন্দ্র করে। গ্রাফিক : সময়ের আলো
মুসলমানদের সারা বছরের ইবাদত ও আমলের হিসাব গোনা হয় হিজরি সনের মাধ্যমে। ইসলামের ইতিহাস-ঐতিহ্য, ঘটনাবলি এবং অন্যান্য বিধিবিধান সবকিছু এ হিজরি ক্যালেন্ডারকে কেন্দ্র করে। রোজা, রমজান, ঈদ, কুরবানি, হজ, জাকাত, তালাক ও মৃত্যুর ইদ্দতপালনসহ গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের হিসাব হিজরি বা চাঁদের সময়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তিনিই সূর্যকে করলেন দীপ্তিময় এবং চাঁদকে আলোকময় আর তার জন্য নির্ধারণ করলেন বিভিন্ন মঞ্জিল, যাতে তোমরা জানতে পার বছরের গণনা এবং সময়ের হিসাব’ (সুরা ইউনুস : ৫)। 

অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমার কাছে মানুষ জিগ্যেস করবে নতুন চাঁদ বিষয়ে। তুমি বলে দাও, এটি মানুষের জন্য এবং হজের জন্য সময় নির্ধারণ করে’ (সুরা বাকারা : ১৮৯)। তাই চান্দ্র বছরের তারিখ ব্যবহারে ও চর্চায় রাখা সব মুসলমানের জন্য কর্তব্য।

ইসলামে নববর্ষ পালনের কোনো বিধান না থাকলেও হিজরি বছরের প্রথম মাস আমাদের দাঁড় করায় আত্মজিজ্ঞাসার সামনে। বর্ষপঞ্জি হচ্ছে জীবনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ। দিন, মাস আর সনের হিসাব ছাড়া আধুনিক পৃথিবীতে কোনো কাজই চলে না। আমাদের বাংলাদেশে তিনটি বর্ষপঞ্জির ব্যবহার লক্ষ করা যায়। সরকারি-বেসরকারি দাফতরিক কাজকর্ম, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও লেনদেনের ক্ষেত্রে ইংরেজি বর্ষপঞ্জি একটা অপরিহার্য মাধ্যম। হিন্দু সম্প্রসায়ের পূজা-পার্বণ, বিয়ের দিনক্ষণ নির্ধারণ আর কৃষিজীবীদের আবাদি মৌসুমের হিসাব ছাড়া বাংলাদেশে বাংলা পঞ্জিকার ব্যবহার খুব একটা চোখে পড়ার মতো নয়।


মুসলমানদের নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, শবে বরাত, শবে কদর, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহাসহ ধর্মীয় বিষয়াবলির জন্য হিজরি সনের হিসাব অপরিহার্য। কিন্তু জীবনের প্রাসঙ্গিকতায় ইংরেজি ও বাংলা সনের বিদায় ও বরণে যতটা গুরুত্ব দেওয়া হয় হিজরি সনের বেলায় তা মোটেও লক্ষ করা যায় না। অথচ হিজরি নববর্ষকে গুরুত্বসহকারে উদযাপন করাই ছিল আমাদের মুসলিম অধ্যুষিত দেশে কাম্য।

হিজরি সন গণনার সূচনা হয়েছিল ঐতিহাসিক এক অবিস্ময়রণীয় ঘটনাকে উপলক্ষ করে। রাসুল (সা.) এবং তাঁর সঙ্গী-সাথিদের মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখার জন্যই আরবি মহররম মাসকে হিজরি সনের প্রথম মাস ধরে সন গণনা শুরু হয়েছিল। আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে তথা দ্বীনের স্বার্থে পবিত্র মক্কা থেকে মদিনায় রাসুল (সা.) এবং সাহাবায়ে কেরামগণের হিজরতের বছর থেকেই হিজরি সনের সূচনা। 

খলিফা হজরত ওমর ফারুক (রা.)-এর শাসনামলে ১৬ হিজরি সনে, প্রখ্যাত সাহাবি হজরত আবু মুসা আশআরী (রা.) ইরাক এবং কুফার গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একদা হজরত আবু মুসা আশআরী (রা.) খলিফা ওমর (রা.)-এর খেদমতে এ মর্মে পত্র লিখেন যে, আপনার পক্ষ থেকে পরামর্শ কিংবা নির্দেশসংবলিত যেসব চিঠি আমাদের কাছে পৌঁছে তাতে দিন, মাস, কাল, তারিখ ইত্যাদি না থাকায় কোন চিঠি কোন দিনের তা নিরূপণ করা আমাদের জন্য সম্ভব হয় না। 

এতে করে আমাদের নির্দেশ কার্যকর করতে সমস্যা হয়। অনেক সময় আমরা বিব্রতবোধ করি চিঠির ধারাবাহিকতা না পেয়ে। হজরত আবু মুসা আশআরীর চিঠি পেয়ে হজরত ওমর (রা.) এ মর্মে পরামর্শ সভার আহ্বান করেন যে, এখন থেকে একটি ইসলামি তারিখ প্রবর্তন করতে হবে। ওই পরামর্শ সভায় হজরত উসমান (রা.), হজরত আলি (রা.)সহ বিশিষ্ট অনেক সাহাবি উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিত সবার পরামর্শ ও মতামতের ভিত্তিতে ওই সভায় ওমর (রা.) সিদ্ধান্ত দেন ইসলামি সন প্রবর্তনের। তবে কোন মাস থেকে বর্ষের সূচনা করা হবে তা নিয়ে পরস্পরের মাঝে মতভেদ সৃষ্টি হয়। কেউ মত পোষণ করেন রাসুল (সা.)-এর জন্মের মাস রবিউল আউয়াল থেকে বর্ষ শুরু করার। আবার কেউ কেউ মত পোষণ করেন রাসুলের ওফাতের মাস থেকে বর্ষ শুরু করা হোক। অন্যান্যের মতে নবীজি (সা.)-এর হিজরতের মাস থেকে বর্ষ করা হোক। 

এভাবে বিভিন্ন মতামত আলোচিত হওয়ার পর হজরত ওমর (রা.) বললেন, নবীজি (সা.)-এর জন্মের মাস থেকে হিজরি সনের গণনা শুরু করা যাবে না। কারণ খ্রিস্টান সম্প্রদায় হজরত ঈসা (আ.)-এর জন্মের মাস থেকেই খ্রিস্টাব্দের গণনা শুরু করেছিল। তাই রাসুলের জন্মের মাস থেকে সূচনা করা হলে বাহ্যত খ্রিস্টানদের অনুসরণ ও সাদৃশ্যতা হয়ে যায়, যা মুসলমানদের জন্য পরিত্যাজ্য।


অপরদিকে নবীজি (সা.)-এর ওফাত দিবসের মাস থেকেও গণনা শুরু করা যাবে না, কারণ এতে নবীজি (সা.)-এর মৃত্যুব্যথা আমাদের মাঝে বারবার উত্থিত হবে। পাশাপাশি অজ্ঞ যুগের মৃত্যুর শোক পালনের ইসলামবিরোধী একটি কুপ্রথারই পুনরুজ্জীবন ঘটবে। হজরত ওমর (রা.)-এর দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যকে হজরত উসমান (রা.) ও হজরত আলি (রা.) এক বাক্যে সহমত পোষণ করে বললেন, এরই পরিপ্রেক্ষিতে খলিফা হজরত ওমর ফারুক (রা.) হিজরতের বছর থেকেই ইসলামি দিনপঞ্জি গণনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। 

এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় হিজরতের ১৬ বছর পর ১০ জুমাদাল উলা ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দ। মোটকথা, আমিরুল মুমিনিন হজরত ওমর (রা.)-এর শাসনামলে হিজরি সনের গণনা সূচনা করেন। এটাই ছিল হিজরি সনের প্রেক্ষাপট।

মুসলিম জীবনে হিজরি সনের গুরুত্ব অপরিসীম। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে গণনা হিসাবের মাস হলো বারোটি। হিজরি সনের প্রথম মাস হলো মহররম। মহররম একটি তাৎপর্যমণ্ডিত ও বরকতময় মাস। মুসলিম ইতিহাসে এ মাসটি বিভিন্ন কারণে মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। কুরআন কারিমে এ মাসটিকে ‘শাহরুল্লাহ’ তথা আল্লাহর মাস বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘চারটি মাস রয়েছে যেগুলো সম্মানিত মাস। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হলো মহররম (সুরা তওবা : ৩৬)। 

আর এ মাসেই রয়েছে ফজিলতপূর্ণ ‘আশুরা’। মহররমের দশম তারিখে ঐতিহাসিক ‘কারবালা’ সংঘটিত হয়েছিল। এ ছাড়া বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এদিনে ঘটেছে এবং ভবিষ্যতেও এদিনে আরও অনেক ঘটনা ঘটবে।

হিজরি সন মুসলমানদের সন। মুসলমানদের উচিত এর অনুসরণ করা। এ ক্ষেত্রে উদাসীনতা কাম্য নয়। ইসলামি ফিকাহবিদরা চান্দ্রবর্ষের হিসাব রাখাকে মুসলমানদের জন্য ফরজে কেফায়া বলেছেন। অর্থাৎ কেউ কেউ এর খবরা-খবর রাখলে সবার দায়িত্ব আদায় হয়ে যাবে। কিন্তু সবাই যদি এ বিষয়ে উদাসীনতা দেখায় তা হলে প্রত্যেকে গুনাহগার হবে। 

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন, সৌর হিসাব রাখা ও ব্যবহার করা নাজায়েজ নয়। বরং এই এখতিয়ার থাকবে, কোনো ব্যক্তি নামাজ, রোজা, জাকাত, ইদ্দতের ক্ষেত্রে চান্দ্রবর্ষের হিসাব ব্যবহার করবে। কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অন্যান্য বিষয়ে সৌর হিসাব ব্যবহার করবে। কিন্তু শর্ত হলো সামগ্রিকভাবে মুসলমানদের মধ্যে চান্দ্র হিসাবের প্রচলন থাকতে হবে। যাতে রমজান, হজ ইত্যাদি ইবাদতের হিসাব জানা থাকে। এমন যাতে না হয়, শুধু জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ছাড়া অন্য কোনো মাসই তার জানা নেই।

প্রতিটি নতুন হিজরি বর্ষ আমাদের দ্বীনের জন্য ত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। শুধু আনন্দ নয়; মনে করিয়ে দেয়, বছর শেষে গেল বছরের আমলের জমা-খরচ মিলিয়ে দেখার পালা। আমাদের ইবাদত-বন্দেগির তরিকা কতটুকু শুদ্ধ এবং অন্য সবকিছু কতটা ইখলাস ও একনিষ্ঠতার সঙ্গে করতে পারছি। 


তাই নিয়তে গরমিল থাকলে নিয়ত শুদ্ধ করতে হবে। আমল সুন্দর বানাতে হবে। নিয়তের শুদ্ধতা ছাড়া যতই নেক করা হোক তা বেকার ও ক্রিয়াহীন। আমাদের থেকে যে সময়গুলো বিদায় নিচ্ছে তা কখনো ফিরে আসার নয়। প্রতিটা সেকেন্ড, মিনিট, ঘণ্টা, দিন, মাস এবং বছর আমাদের থেকে চলে যাওয়া আমাদের চির সত্য মৃত্যুর নিকটবর্তী করে দিচ্ছে। 

তাই সময়ের সঠিক ব্যবহার করতে হবে। চলে যাওয়া একটি বছরে আমরা কী করলাম? বিদায় নেওয়া সময়গুলোতে কী কাজ করতে পারলাম? এ প্রশ্নগুলোর উত্তরের জন্য নিজেকে তৈরি করতে হবে। 

ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) বলেন, ‘(আখেরাতে) হিসাব নেওয়ার আগে তোমরা নিজেদের হিসাব মেলাও’ (তিরমিজি : ২৪৫৯)। আল্লাহ আমাদের এই নতুন হিজরি বছরকে আমাদের জন্য শান্তি, সমৃদ্ধি ও হেদায়েতের বছর হিসেবে কবুল করুন।

সময়ের আলো/এসএকে


  বিষয়:   হিজরি  নববর্ষ  মুমিন  আত্মজিজ্ঞাসা  ইসলাম  ধর্ম 


Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: