কক্সবাজারের টেকনাফে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরে হাতির চলাচলের করিডোরজুড়ে একটি সুউচ্চ বাউন্ডারি দেয়াল নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। বনবিভাগের আপত্তি ও লিখিত নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও নির্মাণকাজ অব্যাহত রয়েছে বলে জানা গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, টেকনাফ রেঞ্জের মুচনী বিটের নয়াপাড়া শালবাগান এলাকায়, ২৬ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পেছনে সংরক্ষিত সেগুন বাগানসংলগ্ন স্থানে দেয়াল নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। বর্তমানে শুধু প্লাস্টার ও ফিনিশিংয়ের কাজ বাকি রয়েছে।
তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দাবি করেছেন, প্রয়োজনীয় অনুমতি নিয়েই কাজ করা হচ্ছে। অন্যদিকে বনবিভাগ জানিয়েছে, সংরক্ষিত বনাঞ্চলে এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণের জন্য তাদের পক্ষ থেকে কোনো অনুমোদন দেওয়া হয়নি।
বনবিভাগ সূত্রে জানা যায়, বিষয়টি জানতে পেরে গত ২৬ মে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কাছে লিখিতভাবে নির্মাণকাজ বন্ধের অনুরোধ জানান। এরপরও কাজ বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
বনবিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২৬ নম্বর ক্যাম্পের পেছনের সংরক্ষিত বনাঞ্চলটি হাতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চলাচল করিডোর। পাহাড়ঘেরা এই পথ দিয়েই বন্য হাতির দল নিয়মিত চলাচল করে। সেখানে প্রায় ৫ মিটার উঁচু ও ১৩৭ মিটার দীর্ঘ বাউন্ডারি নির্মিত হলে হাতির স্বাভাবিক চলাচল সম্পূর্ণভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
এ ছাড়া টেকনাফের এই বনাঞ্চল প্রায় ২৭০ প্রজাতির বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ও খাদ্যসংগ্রহের এলাকা হিসেবে পরিচিত। পরিবেশবিদ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, দেয়াল নির্মাণের ফলে প্রাণীদের বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হবে এবং জীববৈচিত্র্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।
নির্মাণকাজ তদারকির দায়িত্বে থাকা এক প্রতিনিধি জানান, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্যই এই অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
তবে স্থানীয়দের আশঙ্কা, বনের ভেতরে এ ধরনের বৃহৎ স্থাপনা নির্মাণ পরিবেশের ক্ষতির পাশাপাশি ভবিষ্যতে নিরাপত্তা ও সামাজিক সমস্যারও কারণ হতে পারে। রোহিঙ্গা নেতাদের কেউ কেউ মনে করছেন, দেয়ালঘেরা এলাকা ভবিষ্যতে অপরাধপ্রবণ অঞ্চলে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বনপাহারা দলের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, মুচনী বিট এলাকায় এখনো বানর, শিয়াল, ভাল্লুক, বনমোরগ, হাতি, বিভিন্ন সরীসৃপসহ নানা বন্যপ্রাণীর উপস্থিতি দেখা যায়। তবে রোহিঙ্গা বসতি স্থাপনের পর থেকেই প্রাণীগুলো ক্রমশ গভীর বনের দিকে সরে যাচ্ছে।
পরিবেশবিদদের মতে, আবাসস্থল সংকোচন ও খাদ্যসংকটের কারণে টেকনাফের বনাঞ্চল ও বন্যপ্রাণী ইতোমধ্যে সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে নতুন করে হাতির করিডোরে দেয়াল নির্মাণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।
বন্যপ্রাণী গবেষক সরোয়ার আলম দীপু বলেন, সংরক্ষিত বনাঞ্চলে কোনো স্থাপনা নির্মাণের আগে অবশ্যই পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) করা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে বন ও বন্যপ্রাণীর ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিরূপণ করা সম্ভব।
২৬ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইনচার্জ (সিআইসি) মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়ে ক্যাম্প প্রশাসনের সরাসরি কোনো ভূমিকা নেই। তার জানা মতে, আরআরআরসির মাধ্যমে ইউএনডিপি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।
কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, হাতির চলাচলের করিডোরে দেয়াল নির্মাণের বিষয়টি জানার পরই নির্মাণকাজ বন্ধ রাখতে আরআরআরসিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে আবারও লিখিতভাবে বিষয়টি জানানো হবে।
অন্যদিকে কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য সৃষ্টি হয়। এসব বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা না হলে পরিবেশ দূষণ আরও বাড়বে। আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার স্বার্থে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, বনের মধ্যে দেয়াল নির্মাণ আদর্শ নয়; আবার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না করাও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।
এদিকে পরিবেশবাদী সংগঠন ও স্থানীয় সচেতন মহল সংরক্ষিত বন, বন্যপ্রাণী এবং হাতির চলাচলের করিডোর রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
সময়ের আলো/এসএকে