কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার সাতবাড়িয়া উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বয়স এখন ১০০ বছর। ১৯২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি এক শতাব্দী ধরে এলাকার মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসার অন্যতম ভরসাস্থল। অথচ শতবর্ষে এসে জীর্ণ ভবন, জনবল সংকট ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসুবিধার অভাবে কেন্দ্রটির কার্যক্রম চলছে সীমিত পরিসরে। স্থানীয়দের দাবি, পুরোনো এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি আধুনিকায়ন করে ১০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে উন্নীত করা হোক।
ধরমপুর ইউনিয়নের সাতবাড়িয়া এলাকায় হিসনা নদীর তীরে, হিসনা ব্রিজের পশ্চিম পাশে অবস্থিত উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ১৯২৬ সালে এস. জে. যোগেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি ও তৎকালীন স্থানীয় মাড়োয়ারী ব্যবসায়ীদের উদ্যোগে নির্মিত হয়। প্রতিষ্ঠার সময় উদ্যোক্তারা ৪১ শতাংশ জমি দান করলেও বর্তমানে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির দখলে রয়েছে ২১ শতাংশ।
চলতি ২০২৬ সালে প্রতিষ্ঠানটি শতবর্ষে পদার্পণ করেছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেও কেন্দ্রটির গুরুত্ব রয়েছে। ভেড়ামারা উপজেলার পশ্চিমাঞ্চলের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী দৌলতপুর ও মিরপুর উপজেলার একাংশের মানুষও দীর্ঘদিন ধরে এখান থেকে চিকিৎসাসেবা নিয়ে আসছেন।
ভেড়ামারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স শহর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে ১৬ দাগ এলাকায় অবস্থিত। সেখানে যেতে হলে ভেড়ামারা দক্ষিণ ও উত্তর রেলগেট পার হতে হয়। ট্রেন চলাচলের সময় রেলগেট বন্ধ থাকলে সড়ক যোগাযোগ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। সাধারণ রোগীর ক্ষেত্রে বিষয়টি সহনীয় হলেও মুমূর্ষু রোগী, দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তি কিংবা জরুরি প্রসূতি রোগীর ক্ষেত্রে কয়েক মিনিটের বিলম্বও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ কারণে শহরের প্রবেশমুখে অবস্থিত সাতবাড়িয়া উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির গুরুত্ব বেশি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে রয়েছে দুটি পুরোনো ভবন। মূল ভবনে বর্তমানে উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার মো. নিশান চাঁদ বিশ্বাস ও ফার্মাসিস্ট মনিরুল ইসলাম দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের নিয়েই সীমিত পরিসরে চলছে চিকিৎসাসেবা। ভবনের ছাদের বিভিন্ন স্থানে পলেস্তারা খসে পড়েছে। মাঝে মধ্যে ছাদের ভাঙা অংশও নিচে পড়ে। একাধিকবার জানালা ভেঙে চুরির ঘটনাও ঘটেছে। শত বছরের পুরোনো ভবনটিতে আধুনিক চিকিৎসাসেবার প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধারও যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দক্ষিণ পাশের ভবনটি দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত। ভবনটির চারপাশে গজিয়ে উঠেছে আগাছা ও ঝোপঝাড়। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেখানে সাপ-ব্যাঙসহ বিভিন্ন প্রাণীর উপদ্রব রয়েছে। পুরো স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চারপাশে কোনো সীমানাপ্রাচীরও নেই। ফলে সন্ধ্যার পর এলাকাটি অনেকটা অরক্ষিত হয়ে পড়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতে সেখানে চোর ও মাদকসেবীদের আনাগোনা বাড়ে।
উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার মো. নিশান চাঁদ বিশ্বাস বলেন, ওষুধ থাকলে প্রতিদিন ভেড়ামারা, দৌলতপুর ও মিরপুরের কিছু অংশ থেকে শতাধিক রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। ভেড়ামারা-দৌলতপুর প্রধান সড়কের পাশে হওয়ায় দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিরাও প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য এখানে আসেন। এত বড় এলাকার মানুষের চিকিৎসার প্রাথমিক ভরসাস্থল হিসেবে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির জনবল ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করা প্রয়োজন।
ধরমপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সেলিম হোসেন বলেন, প্রতিদিন এই কেন্দ্রে গড়ে ১০০ থেকে ১৫০ জন রোগী চিকিৎসাসেবা নেন। আগে এখানে একজন মেডিকেল অফিসার কর্মরত ছিলেন, বর্তমানে কোনো মেডিকেল অফিসার নেই। সাতবাড়িয়া উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে ১০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে উন্নীত করার দাবির প্রতি তিনি জোরালো সমর্থন জানান।
পেটের সমস্যার চিকিৎসা নিতে আসা বৃট্তিপাড়া গ্রামের ১০৩ বছর বয়সী আকছের আলী বলেন, ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছেন এলাকার মানুষ এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। এখনো মানুষ আসে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির উন্নয়ন করা প্রয়োজন।
ভেড়ামারা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মিজানুর রহমান বলেন, সাতবাড়িয়া উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি উন্নত করার দাবির প্রতি তার পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির উন্নয়নের জন্য এরই মধ্যে একাধিকবার বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করা হয়েছে।
কুষ্টিয়ার নির্বাহী প্রকৌশলী প্রদীপ কুমার শীল বলেন, সাতবাড়িয়া উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জন্য নতুন বরাদ্দ চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়েছে এবং প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কিছু জমি বেদখল হয়ে গেছে। সেগুলো উদ্ধার করা জরুরি।
এদিকে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এইচইডি) প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, সাতবাড়িয়া উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এলাকাবাসীর দাবি, নতুন ভবন নির্মাণের পাশাপাশি পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, ওষুধ সরবরাহ, জরুরি চিকিৎসাসেবা, রোগ নির্ণয়ের ব্যবস্থা এবং সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হলে ভেড়ামারার পশ্চিমাঞ্চল, দৌলতপুর ও মিরপুরের একাংশের বিপুলসংখ্যক মানুষ উপকৃত হবেন। শতবর্ষী প্রতিষ্ঠানটির ঐতিহ্য ও ভৌগোলিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত ১০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে উন্নীত করার দাবি তাদের।
সময়ের আলো/জোই