কিংবদন্তি রবিন হুডকে আশ্রয় দেওয়া ১২০০ বছরের পুরনো প্রাচীন ওক গাছটি মারা গেছে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

ইংল্যান্ডের শেরউড ফরেস্টে অবস্থিত প্রায় ১,২০০ বছরের পুরোনো মেজর ওক গাছটি এখন আর জীবিত নেই বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। কিংবদন্তি

2026-06-19T17:48:43+00:00
2026-06-19T17:48:43+00:00
 
  শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬,
২৪ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
কিংবদন্তি রবিন হুডকে আশ্রয় দেওয়া ১২০০ বছরের পুরনো প্রাচীন ওক গাছটি মারা গেছে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬, ৫:৪৮ পিএম 
ইংল্যান্ডের শেরউড ফরেস্টে অবস্থিত প্রায় ১,২০০ বছরের পুরোনো মেজর ওক গাছটি এখন আর জীবিত নেই। ছবি : এপি
ইংল্যান্ডের শেরউড ফরেস্টে অবস্থিত প্রায় ১,২০০ বছরের পুরোনো মেজর ওক গাছটি এখন আর জীবিত নেই বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। কিংবদন্তি অনুযায়ী, এই বিশাল ওক গাছটি লোককাহিনির বিখ্যাত চরিত্র রোবিন হুডের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত ছিল—অনেকের বিশ্বাস, তিনি নাকি এই গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকতেন এবং এখানে আশ্রয় নিতেন।

যুক্তরাজ্যের সংরক্ষণ সংস্থা রয়্যাল সোসাইটি ফর দ্য প্রোটেকশন অব বার্ডস (আরএসপিবি) জানিয়েছে, চলতি বসন্তে গাছে নতুন কোনো পাতা না গজানোয় ধারণা করা হচ্ছে এটি মারা গেছে। সাধারণত বসন্তে ওক গাছে নতুন পাতা গজানো তার জীবনের স্বাভাবিক লক্ষণ, কিন্তু এবার সেই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ব্যাহত হয়েছে।

গাছটির বিশালতা ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব

মেজর ওক ছিল ব্রিটেনের অন্যতম বৃহৎ ও ঐতিহাসিক গাছ। এর ডালপালা প্রায় ২৮ মিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিল এবং কাণ্ডের পরিধি ছিল প্রায় ১১ মিটার। এত বিশাল গাছকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষ শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক প্রতীক হিসেবেও দেখে এসেছে।

গাছটির বিশালতা এতটাই ছিল যে বহু মানুষ একসঙ্গে হাত ধরেও এর কাণ্ড পুরোপুরি ঘিরে ফেলতে পারত না।

সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রচেষ্টা

গাছটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য বহু বছর ধরে বিভিন্ন ধরনের সংরক্ষণ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। বিশ শতকের শুরু থেকেই এর ভারী ডালপালাকে ধরে রাখতে লোহার খুঁটি ও সহায়ক কাঠামো ব্যবহার করা হয়।

পরবর্তীতে ১৯৭০-এর দশকে পর্যটকদের সরাসরি প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করতে গাছটির চারপাশে বেড়া দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়, যাতে অতিরিক্ত চাপ থেকে এটি রক্ষা করা যায়।

তবুও ধীরে ধীরে গাছটির অবস্থা খারাপ হতে থাকে।

ধীরে ধীরে মৃত্যুর কারণ

বিশেষজ্ঞদের মতে, মেজর ওকের মৃত্যুর পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে।

প্রথমত, শত শত বছর ধরে অসংখ্য পর্যটকের ভিড়ে গাছটির চারপাশের মাটি অত্যন্ত শক্ত হয়ে যায়। এতে বৃষ্টির পানি ও বাতাস শিকড় পর্যন্ত পৌঁছাতে পারত না, ফলে শিকড় ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।

দ্বিতীয়ত, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাজ্যে একের পর এক তীব্র গরম ও খরার মৌসুম গাছটিকে আরও বিপর্যস্ত করে তোলে। বিশেষ করে ২০২২ সালের রেকর্ড ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা গাছটির ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে।

তৃতীয়ত, দীর্ঘ সময় ধরে গাছটিকে টিকিয়ে রাখতে যেসব কৃত্রিম সহায়তা (খুঁটি ও কাঠামো) ব্যবহার করা হয়েছিল, তা একদিকে সাহায্য করলেও অন্যদিকে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করে দেয় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

গাছটির দেখাশোনার সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞ সাইমন পারফে জানান, পরিবেশ পুনরুদ্ধারের জন্য দীর্ঘদিন চেষ্টা চালানো হলেও ক্ষতি এতটাই গভীর ছিল যে গাছটিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।

আরএসপিবির শেরউড ফরেস্ট সাইট ম্যানেজার ক্লোয়ি রাইডার বলেন, এই এলাকায় মানুষের ভিড় অনেক বেশি ছিল, এবং সেই চাপ দীর্ঘমেয়াদে গাছটির জন্য ক্ষতিকর হয়েছে। 

আরেক বিশেষজ্ঞ রেগ হ্যারিস বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক তাপপ্রবাহ ও খরা গাছটির অবনতিকে দ্রুততর করেছে।


রোবিন হুডের সঙ্গে সম্পর্ক— বাস্তব নাকি কিংবদন্তি?

শেরউড ফরেস্ট মধ্য ইংল্যান্ডের নটিংহ্যামশায়ারে অবস্থিত এবং এটি রোবিন হুডের লোককাহিনির কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। গল্প অনুযায়ী, রোবিন হুড নটিংহামের শেরিফের হাত থেকে বাঁচতে এই বনেই আশ্রয় নিতেন এবং ধনীদের কাছ থেকে সম্পদ নিয়ে গরিবদের সাহায্য করতেন।

তবে ইতিহাসবিদদের মতে, মেজর ওকের সঙ্গে রোবিন হুডের সরাসরি ঐতিহাসিক প্রমাণ খুবই দুর্বল। ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ অ্যালেক্স ব্রাউন বলেন, প্রাচীন মধ্যযুগীয় গল্পগুলোতে এই নির্দিষ্ট গাছের কোনো স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায় না।

তবে তিনি আরও যোগ করেন, লোককাহিনিতে প্রায়ই বনাঞ্চলের একটি নির্দিষ্ট গাছকে মিলনস্থল বা আশ্রয়স্থল হিসেবে কল্পনা করা হতো, যা সময়ের সঙ্গে “মেজর ওক”-এর মতো গাছের কিংবদন্তি তৈরি করেছে।

মৃত্যুর পরও গাছটির অস্তিত্ব

যদিও মেজর ওক আর জীবিত নেই, তবুও এটি সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে যাবে না। সংরক্ষণ কর্মকর্তারা বলছেন, গাছটি এখনো শেরউড ফরেস্টের কেন্দ্রে একটি প্রাকৃতিক স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকবে।

আরএসপিবির হোলি ড্রেক বলেন, এই গাছটি মৃত্যুর পরও বনজ পরিবেশে ভূমিকা রাখবে—এটি পোকামাকড়, ছত্রাক ও ছোট জীবের আবাসস্থল হিসেবে কাজ করবে এবং বাস্তুতন্ত্রে অবদান রাখবে।

নতুন প্রজন্মের গাছ

মেজর ওকের বীজ (অ্যাকর্ন) থেকে আগেই নতুন চারা তৈরি করা হয়েছে, যেগুলো বিভিন্ন দেশে রোপণ করা হয়েছে। এমনকি লন্ডনের মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বাসভবন উইনফিল্ড হাউসেও এর একটি চারা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক পরিচর্যা পেলে এই নতুন গাছগুলো ভবিষ্যতে মেজর ওকের উত্তরসূরি হিসেবে দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে পারে।

মেজর ওকের মৃত্যু শুধু একটি গাছের শেষ নয়, বরং একটি হাজার বছরের ইতিহাস, লোককাহিনি এবং মানুষের প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কের প্রতীকী অধ্যায়ের সমাপ্তি। তবে তার গল্প, কিংবদন্তি এবং নতুন চারা গাছগুলোর মাধ্যমে সে ভবিষ্যতেও বেঁচে থাকবে— শেরউড ফরেস্টের বাতাসে, রোবিন হুডের গল্পে, এবং মানুষের স্মৃতিতে।


সূত্র : এপি 

/ইউএমএইচ




  বিষয়:   কিংবদন্তি  রবিন হুড  ওক গাছ 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: