সময়ের সঠিক সংজ্ঞা বা পরিচয় কী- বলা কঠিন। কারণ এটি ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না, ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করা যায় না; তবে এর বাস্তবতাও অস্বীকার করা যায় না। কারণ সমগ্র সৃষ্টিজগৎ সময়ের ভেতর দিয়েই অতিক্রম করে চলে। সময়ের আদি-অন্ত সম্পর্কেও মানুষ পরিষ্কারভাবে কিছু বলতে পারে না, এর প্রকৃত জ্ঞান রয়েছে কেবল মহান আল্লাহর। মহান আল্লাহ নিজের অস্তিত্বের একাংশকেই সময় বলে ঘোষণা দিয়েছেন এবং সময়ের শপথ করেছেন।
পবিত্র কুরআন ও হাদিসের বিভিন্ন স্থানে এর যথার্থ মূল্যায়নের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইসলামে এ কারণে সময় ব্যবস্থাপনাকে মানবজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করেছে। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘মহামহিম আল্লাহ সূর্যকে তৈরি করেছেন বিচ্ছুরিত আলোর উৎসরূপে আর চাঁদকে করেছেন জ্যোতির্ময় (সে আলোর প্রতিফলন)। তিনি চাঁদের কক্ষপথ ও কলাকাল নির্দিষ্ট করেছেন, যাতে তোমরা বছর দিন ও সময়ের হিসাব নির্ণয় করতে পারো। আল্লাহ এসব অনর্থক সৃষ্টি করেননি। জ্ঞানীদের জন্য তিনি তাঁর বাণী বিশদভাবে বয়ান করেন।’ (সুরা ইউনুস : ৫)
সময় শব্দটি তিন অক্ষরের ছোট শব্দ হলেও এর ব্যাপ্তিকাল অনেক বড়। সৌর বছরে ৩৬৫ দিন আর চান্দ্র বছরে ৩৫৪ দিন। ঘণ্টার হিসাবে ২৪ ঘণ্টা এবং মিনিটের হিসাবের দিক দিয়ে ১৪৪০ মিনিট। এ সময় হতে এক ঘণ্টা বা এক মিনিট চলে যাওয়া মানে প্রকৃতপক্ষে জীবনের একটা মূল্যবান অংশ কমে যাওয়া। এ কারণে সময়ের যথাযথ ব্যবহার একান্ত অপরিহার্য। সময়ের সমষ্টিই জীবন। মানুষ তার দুনিয়ার জীবন কীভাবে অতিবাহিত করেছে আখেরাতে সে হিসাব প্রদান করতে হবে।
সময় একটি মানদণ্ড, যেখানে ঘটনাগুলো অতীত থেকে বর্তমান হয়ে ভবিষ্যতের পানে বা অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতে সন্নিবেশ করা যায়। কুরআনে সময় অপচয় ও অনর্থক কাজে ব্যয় করার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। সময়ের গুরুত্ব বোঝানোর জন্য আল্লাহ তায়ালা কুরআনে অনেক প্রতিশব্দ ব্যবহারও করে এর প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তিনি সূর্যকে করেছেন তেজোদীপ্ত, আর চন্দ্রকে করেছেন আলোকময়। আর তার (হ্রাস-বৃদ্ধির) পক্ষগুলোকে সঠিকভাবে নির্ধারণ করেছেন, যাতে তোমরা এ নিয়ম দ্বারা বছরের গণনা এবং দিন-তারিখের হিসাবটা জানতে পারো; আসলে আল্লাহ তায়ালা যে এসব কিছু সৃষ্টি করে রেখেছেন তার কোনোটাই তিনি অনর্থক সৃষ্টি করেননি; যারা সৃষ্টির রহস্য সম্পর্কে জানতে চায় তাদের জন্য আল্লাহ তায়ালা তাঁর নির্দেশগুলোকে সুস্পষ্ট করে বর্ণনা করেন।’
মানুষকে সময়ের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বোঝানোর জন্য কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় আল্লাহ সময়ের কসম করেছেন। যেমন, ‘শপথ রজনীর, যখন তা আচ্ছন্ন হয়ে যায়’, ‘শপথ দিনের, যখন তা আলোকিত হয়’, ‘শপথ ফজরের, শপথ দশটি রাতের’, ‘সকালের উজ্জ্বল আলোর শপথ’, ‘রাতের শপথ যখন তা হয় শান্ত নিঝুম’; মহান আল্লাহ কোনো তুচ্ছ বিষয়কে নিয়ে শপথ করেন না। আর সময় নিয়ে কসম করায় সময়ের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। মহানবী (সা.) সময়কে গুরুত্ব দিতে এবং একে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে অনেক তাগিদ দিয়েছেন। এমনকি তিনি সর্তক করে দিয়েছেন, প্রতিটি মানুষকে সময়ের হিসাব কেয়ামতের দিন দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, কেয়ামতের দিন কোনো মানুষ চারটি প্রশ্নের উত্তর না দেওয়া পর্যন্ত সামনে যেতে পারবে না- ১. সে তার জীবনকাল কোন কাজে ব্যয় করেছে। ২. তার যৌবনকাল কোথায় ক্ষয় করেছে। ৩. তার সম্পদ কোথা থেকে আয় করে কোথায় ব্যয় করেছে এবং ৪. তার অর্জিত জ্ঞান অনুযায়ী সে আমল করেছে কি না (তিরমিজি : ২৪১৬)। এ চার বিষয়ই সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। একবার রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে প্রশ্ন করা হলো, সৌভাগ্যবান কারা? তিনি বললেন, সৌভাগ্যবান তারা, যারা দীর্ঘায়ু লাভ করেছে এবং তা নেক আমলের মাধ্যমে অতিবাহিত করেছে। পুনরায় জিগ্যেস করা হলো, দুর্ভাগা কারা? তিনি বললেন, দুর্ভাগা তারা যারা দীর্ঘায়ু পেয়েছে এবং তা বদ আমলে কাটিয়েছে বা আমলবিহীন অতিবাহিত করেছে। (তিরমিজি : ২৩২৯; মুসনাদে আহমাদ : ১৭৭৩৪)
পরকালে মানুষ যে বিষয়ে সবচেয়ে অনুতপ্ত হবে তা হলো, অবসর সময়ের সদ্ব্যবহার না করা। সময় কাজে লাগিয়ে নেক আমল করলে বান্দার অবস্থার উন্নয়ন হবে, বদ আমল করলে তার অবনতি হবে। আমল ছাড়া সময় পার করলে তাও তার জন্য প্রকারান্তরে ক্ষতি হিসেবেই গণ্য হবে।
কারণ মানুষের আয়ুষ্কাল প্রবহমান নদীর মতো। তা যদি সৎকর্মে ব্যয় হয়, তবে নেক আমল হিসেবে গণ্য হবে; আর যদি নেক আমলবিহীন চলে যায়, তা বদ আমল হিসেবেই পরিগণিত হবে। যেহেতু নিষ্ক্রিয়তা বা অকর্মণ্যতাও একটি ক্রিয়া। নবীজি (সা.) বলেন, ‘তোমরা পাঁচটি জিনিসকে তার বিপরীত পাঁচটি জিনিসের পূর্বে মূল্যায়ন করো ও তার সদ্ব্যবহার করো- ১. তোমার যৌবনকে বার্ধক্যের পূর্বে। ২. সুস্থতাকে অসুস্থতার পূর্বে। ৩. সচ্ছলতাকে দারিদ্র্যের পূর্বে। ৪. অবসরকে ব্যস্ততার পূর্বে। ৫. জীবনকে মৃত্যুর পূর্বে’ (বায়হাকি, শোয়াবুল ঈমান : ১০২৪৮; আত-তারগিব ওয়াত-তারহিব : ৪/২০৩)
আমরা প্রায় সময় নানা ব্যস্ততায় ব্যতিব্যস্ত থাকি। যেকোনো উপলক্ষে অবসর যখন আসে, তা আমাদের জন্য মহামূল্যবান নেয়ামত। সময় আমাদের জীবনের এমন একটি মূলধন বা পুঁজি, যা বিনিয়োগ করলে আমরা ইহকাল ও পরকালে লাভবান ও উপকৃত হব; আর এটি হেলায় নষ্ট করলে উভয় জগতে ক্ষতিগ্রস্ত হব। সময় চলে গেলে তা আর কখনো ফিরে আসে না। তাই বহমান সময় যেন কাজে লাগিয়ে পরকালের জীবন সমৃদ্ধ ও সজ্জিত করতে পারি, আল্লাহ কাছে তওফিক প্রার্থনা করি।
সময়ের আলো/আআ