ফকল্যান্ড যুদ্ধের মাত্র চার বছর পর মেক্সিকো সিটির অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে মুখোমুখি আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের সেই কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচটিকে যেন একাই প্রতিশোধের মঞ্চ বানিয়ে ফেলেছিলেন ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা।
১ লাখের বেশি দর্শককে সাক্ষী রেখে পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি উচ্চতার এই ফুটবল জাদুকর জন্ম দিয়েছিলেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত ও একই সঙ্গে সবচেয়ে বিতর্কিত মুহূর্তের। মাত্র ৪ মিনিটের ব্যবধানে তার করা দুটি গোল আর্জেন্টিনাকে সেমিফাইনালে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি ম্যারাডোনাকে দিয়েছিল অমরত্ব।
কাকতালীয়ভাবে, সোমবার (২২ জুনের) এই রাতে যখন আর্জেন্টিনা দল অস্ট্রিয়ার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই ফুটবলবিশ্ব স্মরণ করছে ম্যারাডোনার সেই অবিস্মরণীয় কীর্তিকে। ম্যাচের ৫১ ও ৫৬ মিনিটে ফুটবল ইতিহাসের এই মহানায়ক উপহার দিয়েছিলেন ‘হ্যান্ড অব গড’ ও ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ নামের বিখ্যাত দুই গল্পের।
‘হ্যান্ড অব গড’ বা ঈশ্বরের হাত
ম্যাচের প্রথমার্ধ ছিল গোলশূন্য। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধের ষষ্ঠ মিনিটে (৫১ মিনিটে) ম্যারাডোনা নিজের বক্সের বাইরে থেকে বল নিয়ে সতীর্থ হোর্হে ভালদানোকে পাস দেন। বলটি ইংলিশ ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে বাতাসে ভেসে পেনাল্টি বক্সের দিকে চলে যায়। বলটি লুফে নিতে এগিয়ে আসেন ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক পিটার শিলটন, যিনি উচ্চতায় ম্যারাডোনার চেয়ে প্রায় ৮ ইঞ্চি লম্বা ছিলেন।
শিলটন যখন ডান হাত উঁচিয়ে বলটি ক্লিয়ার করতে ঝাঁপান, ঠিক তখনই ম্যারাডোনা তার বাঁ হাত মাথার কাছে মুষ্টিবদ্ধ করে লাফিয়ে ওঠেন। শিলটনের আগেই ম্যারাডোনার হাত বল স্পর্শ করে এবং তা জালে জড়িয়ে যায়। তিউনিসিয়ার রেফারি আলি বিন নাসের ইংলিশ খেলোয়াড়দের তীব্র প্রতিবাদ সত্ত্বেও লাইন্সম্যানের সঙ্গে পরামর্শ করে গোলের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন।
ম্যাচ শেষে ড্রেসিংরুমে ম্যারাডোনা বলেছিলেন, “গোলটি হয়েছিল কিছুটা আমার মাথা দিয়ে, আর কিছুটা ঈশ্বরের হাত দিয়ে।” এর দীর্ঘ ১৯ বছর পর ২০০৫ সালে ম্যারাডোনা এক টিভি অনুষ্ঠানে স্বীকার করেন যে গোলটি তিনি হাত দিয়েই করেছিলেন।
শতকের সেরা গোল
প্রথম গোলের বিতর্কিত রেশ কাটতে না কাটতেই ৪ মিনিট পর (৫৬ মিনিটে) ম্যারাডোনা যা করলেন, তা ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা গোলের মর্যাদা পায়। নিজের অর্ধে বল পেয়ে ম্যারাডোনা শুরু করেন এক অবিশ্বাস্য দৌড়। মাত্র ১০ সেকেন্ডে ৬০ গজ দূরত্ব পার করার পথে তিনি একে একে পিটার বিয়ার্ডসলি, পিটার রিড, টেরি বুচার ও টেরি ফেনউইককে কাটিয়ে বক্সে ঢোকেন। এরপর এক চমৎকার ফেইন্টে গোলরক্ষক পিটার শিলটনকে মাটিতে ফেলে বল ঠেলে দেন ফাঁকা জালে। আর্জেন্টিনা এগিয়ে যায় ২-০ গোলে।
পরবর্তীতে ২০০২ সালে ফিফার ওয়েবসাইটে বিশ্বব্যাপী ফুটবলপ্রেমীদের ভোটে এই গোলটি ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ বা শতকের সেরা গোল হিসেবে নির্বাচিত হয়। উরুগুয়ের ধারাভাষ্যকার ভিক্টর হুগো মোরালেসের সেই আবেগী ধারাভাষ্য—“জিনিয়াস, জিনিয়াস, জিনিয়াস… গোল! আমি কাঁদতে চাই… ঈশ্বর, ফুটবলের জন্য ধন্যবাদ!”
ম্যাচের ৮১ মিনিটে গ্যারি লিনেকার ইংল্যান্ডের হয়ে একটি গোল শোধ করলেও তা আর্জেন্টিনার জয় আটকাতে পারেনি। জীবনের শেষ দিনগুলোতেও ম্যারাডোনা এই দুই গোলের মোহে আবদ্ধ ছিলেন।
২০২০ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “দ্বিতীয় গোলটি আমি এ কারণেই করেছিলাম, যাতে কেউ বলতে না পারে যে আমি শুধু হাত দিয়েই গোল করে জিতেছি।”
সময়ের আলো/জেডি