বিপুল ভোটে জয়লাভ করে যুক্তরাজ্যের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন স্যার কিয়ার স্টারমার। তার এই আকস্মিক পদত্যাগের নেপথ্যে লেবার পার্টির অভ্যন্তরীণ কোন্দল, ভোটারদের আস্থা হারানো এবং বিশেষ করে গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসনের মুখে স্টারমার প্রশাসনের বিতর্কিত ভূমিকা ও নীতিকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন জনমত জরিপ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গাজা গণহত্যা এবং ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতা বজায় রাখার নীতি বামপন্থী ও মধ্যপন্থী ভোটারদের লেবার পার্টি থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছে।
সাবেক লেবার ভোটারদের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, অর্ধেকেরও বেশি ভোটার দলটিকে ভোট না দেওয়ার কারণ হিসেবে গাজা ইস্যুতে স্টারমারের অবস্থানকে দায়ী করেছেন।
লেবার পার্টির সাবেক নেতা জেরেমি করবিন এই পরিস্থিতিকে স্টারমারের ‘নৈতিক দেউলিয়াত্ব’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে ব্রিটিশ গণমাধ্যম ‘মিডল ইস্ট আই’-কে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী করপোরেট দাতাদের সন্তুষ্ট করতে গিয়ে রাজনৈতিক নীতি বিসর্জন দিয়েছেন। তিনি রেখে গেছেন ভঙ্গ হওয়া প্রতিশ্রুতি, ভয়াবহ বৈষম্য এবং গণহত্যায় সম্পৃক্ততার এক কলঙ্কিত উত্তরাধিকার।’
বিরোধী দলে থাকাকালীন ইসরায়েলকে অন্ধ সমর্থন
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর তৎকালীন রক্ষণশীল সরকারের নীতিই অনুসরণ করেছিলেন বিরোধী দলীয় নেতা কিয়ার স্টারমার। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উদ্বেগ উপেক্ষা করে তিনি ইসরায়েলের গাজা অবরোধ ও বোমাবর্ষণকে সমর্থন করেন।
২০২৩ সালের ১১ অক্টোবর এলবিসি রেডিওতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্টারমারকে প্রশ্ন করা হয়েছিল— গাজার বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ইসরায়েলের এই সামগ্রিক অবরোধ কি আইনত সমীচীন? জবাবে স্টারমার বলেছিলেন, ‘আমি মনে করি ইসরায়েলের সেই অধিকার আছে... আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় সবকিছু করা উচিত, তবে ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারের মূল নীতি থেকে আমি সরতে চাই না।’
যদিও ব্যাপক সমালোচনার মুখে এর নয়দিন পর তিনি এই বক্তব্য থেকে আংশিক সরে আসেন।
পরবর্তী সময়ে, ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলার অবসান চেয়ে স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির আনা যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিতে নিজের দলের এমপিদের নির্দেশ দিয়েছিলেন স্টারমার। এমনকি ২০২৪ সালের শুরুতে কমন্সের স্পিকারকে প্রথা ভেঙে লেবার পার্টির একটি দুর্বল সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপনের সুযোগ দিতে তিনি তদবির করেন, যা কার্যকরভাবে যুদ্ধবিরতির মূল প্রস্তাবটিকে অকার্যকর করে দিয়েছিল।
গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও অস্ত্র সরবরাহ
টোরি সরকারের পর ক্ষমতা গ্রহণ করেও স্টারমার প্রশাসন ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতা বজায় রাখে। স্টারমারের প্রধানমন্ত্রীত্বকালে যুক্তরাজ্যের রয়্যাল এয়ার ফোর্স গাজার ওপর দিয়ে অন্তত ৫১৮টি নজরদারি ও গুপ্তচর বিমান পাঠায়।
সরকারের দাবি ছিল, এগুলো কেবল জিম্মিদের অবস্থান শনাক্ত করতে ব্যবহৃত হয়েছিল। তবে যে দিনগুলোতে ইসরায়েলি হামলায় ব্রিটিশ সাহায্যকর্মীরা নিহত হন, সেই দিনগুলোর সংগৃহীত ভিডিও ফুটেজ বা তথ্য ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র অজহাতে প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানায় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
অস্ত্র বিক্রির ক্ষেত্রেও স্টারমার দ্বিমুখী নীতি গ্রহণ করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের ‘সুস্পষ্ট ঝুঁকি’র কথা উল্লেখ করে লেবার সরকার ইসরায়েলে প্রায় ৩০টি অস্ত্রের রফতানি লাইসেন্স স্থগিত করে।
তবে ইসরায়েলের ব্যবহৃত অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের ১৫ শতাংশ যন্ত্রাংশ যুক্তরাজ্যে তৈরি হওয়া সত্ত্বেও, বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের অজহাতে সেই যন্ত্রাংশ রফতানি অব্যাহত রাখা হয়। এর বাইরেও স্টারমার সরকার ইসরায়েলের কাছে প্রায় ১৬৯ মিলিয়ন ডলার মূল্যের সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির অনুমোদন দেয়।
প্রমাণ উপেক্ষা করার গুরুতর অভিযোগ
স্টারমারের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ ধামাচাপা দেওয়া এবং উপেক্ষা করার গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন তারই সাবেক ক্যাবিনেট মন্ত্রী ও ঘনিষ্ঠ সহযোগী, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং।
এক সাক্ষাৎকারে স্ট্রিটিং দাবি করেন, গাজায় দায়িত্ব পালন করে আসা ব্রিটিশ ডাক্তারদের সরবরাহ করা ইসরায়েলি যুদ্ধাপরাধের অকাট্য প্রমাণের একটি নথি যখন তিনি সরকারের ভেতরে ছড়াতে চেয়েছিলেন, তখন খোদ প্রধানমন্ত্রী স্টারমার তার বিরুদ্ধে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নথি ফাঁসের’ অভিযোগ এনেছিলেন।
স্ট্রিটিং বলেন, ‘আমি ব্রিটিশ ডাক্তারদের মুখে যুদ্ধাপরাধের লোমহর্ষক বিবরণ শুনেছিলাম। একটি সভ্য দেশ হিসেবে এর জবাব দেওয়ার নৈতিক ও আইনগত দায়িত্ব আমাদের ছিল, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তা এড়িয়ে যান।’
অভ্যন্তরীণ দমনপীড়ন ও দ্বিমুখী পররাষ্ট্রনীতি
যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরে ইসরায়েল-বিরোধী কণ্ঠস্বর দমনেও স্টারমার সরকার কট্টর অবস্থান নেয়। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার ফিলিস্তিনপন্থী অধিকার সংগঠন ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’-কে নিষিদ্ধ করেন। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট নিষেধাজ্ঞাটিকে ‘বেআইনি’ ও ‘বৈষম্যমূলক’ বললেও, পরে আপিল আদালতে তা বহাল রাখা হয়। এর ফলে যুক্তরাজ্যজুড়ে সাধারণ প্ল্যাকার্ড হাতে নীরব প্রতিবাদ করার অপরাধেও হাজার হাজার মানুষকে গ্রেফতার করা হয়।
এমনকি ইসরায়েলের সমালোচনা করার কারণে মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক চেঙ্ক উইগুর ও হাসান পিকারকে ব্রিটেনে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়।
অথচ এর বিপরীতে, গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েলি সামরিক প্রধান হারজি হালেভি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিয়ন সার এবং প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগদের যুক্তরাজ্যে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে স্বাগত জানানো হয় এবং হালেভিকে বিশেষ আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়।
কলঙ্কিত আন্তর্জাতিক রেকর্ড
যদিও মে ২০২৫-এ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানাকে সমর্থন এবং সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়ে স্টারমার ইসরায়েল সরকারের ক্ষোভের মুখে পড়েছিলেন, তবে সেই পদক্ষেপগুলো তার সামগ্রিক ‘ইসরায়েল-তোষণ’ নীতিকে ঢাকতে পারেনি।
‘মেডিকেল এইড ফর প্যালেস্টাইনিয়ানস’-এর অ্যাডভোকেসি ডিরেক্টর রোহান ট্যালবটের মতে, ‘গাজার হাসপাতালগুলোতে যখন ইসরায়েলি বাহিনী বোমা ফেলছিল এবং একটি পুরো জাতিকে খাদ্য ও ওষুধ থেকে বঞ্চিত করছিল, তখন কিয়ার স্টারমারের নিষ্ক্রিয়তা তার আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে চিরতরে কলঙ্কিত করে রেখেছে।’
গাজা গণহত্যার ইস্যুতে কোনো পক্ষকেই সন্তুষ্ট করতে না পারা এবং মার্কিন তোষণ নীতি বজায় রাখতে গিয়ে নিজ দেশের ভোটারদের বড় অংশকে ক্ষুব্ধ করাই শেষ পর্যন্ত কিয়ার স্টারমারের সংক্ষিপ্ত ও বিতর্কিত আদেশকালের অবসান ঘটাল।
সময়ের আলো/জেডি