হাম সংক্রমণ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই দেশে আবারও ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে শুরু করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১৩৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে দুই নারীর মৃত্যু হয়েছিল। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ জনে এবং আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৫ হাজার। গত বছরের একই সময়ে ডেঙ্গুতে ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছিল। যদিও এবার মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলক কম, তবে বর্ষা মৌসুমে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে সংক্রমণ বৃদ্ধির আশঙ্কা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে।
সোমবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ১৩৯ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় এ সংখ্যা ছিল ২২০। এ নিয়ে চলতি বছর হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৩৯ জনে। আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ৫৬ দশমিক ৮ শতাংশ এবং নারী ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ। একই সময়ে ১২৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। চলতি বছর এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ৪ হাজার ৬৯২ জন।
গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ব্যক্তিসহ চলতি জুন মাসে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে পাঁচজনে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ পাঁচজনের মধ্যে চারজনই নারী। তাদের বয়স ২১ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে। অন্যজন কিশোর, যার মৃত্যুর তথ্য ১ জুন জানানো হয়েছিল। চলতি বছর ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ১০ জনের মধ্যে পাঁচজন পুরুষ এবং পাঁচজন নারী।
বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪৬ জন রয়েছেন বরিশাল বিভাগে। এ ছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ২১ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও খুলনা বিভাগে ১৬ জন করে, চট্টগ্রামে ১৪ জন, ঢাকা বিভাগের অন্যান্য জেলায় ১২ জন, রাজশাহীতে ৯ জন, সিলেটে ৩ জন এবং ময়মনসিংহ ও রংপুরে ১ জন করে রোগী ভর্তি হয়েছেন।
গত বছরের একই সময়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ছিল আরও উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালের ২১ জুন পর্যন্ত জুন মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল ৩ হাজার ৮৪ জন এবং ওই মাসে মৃত্যু হয়েছিল ৮ জনের। তবে বছরের শুরু থেকে ওই দিন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছিল, যার প্রায় অর্ধেকই ছিলেন নারী।
গত বছরও বরিশাল বিভাগে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি ছিল। ২১ জুনের হিসাব অনুযায়ী মোট ৩৫২ জন রোগীর মধ্যে ১৬৭ জনই ছিলেন বরিশাল বিভাগের। এ বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী ছিল বরগুনা জেলায়। সে সময় এক দিনে বরগুনা সদর হাসপাতালে ৬৩ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়। ২১ জুন বিকাল পর্যন্ত ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন ২২১ জন ডেঙ্গু রোগী।
তবে সরকারি পরিসংখ্যান ডেঙ্গুর প্রকৃত পরিস্থিতির পুরো প্রতিফলন ঘটাচ্ছে না বলে মনে করেন অনেক জনস্বাস্থ্যবিদ। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পরও অনেক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন না। অন্যদিকে ডেঙ্গুজনিত সব মৃত্যুর তথ্যও সরকারের কাছে পৌঁছায় না। ফলে প্রকৃত আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি হতে পারে।
সাধারণত বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি দেখা যায় বর্ষা মৌসুমে, বিশেষ করে জুলাই থেকে অক্টোবরের মধ্যে। বৃষ্টির পানিতে জমে থাকা ছোট ছোট জলাধার এডিস মশার প্রজননের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় জলবায়ু পরিবর্তন, অস্বাভাবিক আবহাওয়া, দীর্ঘ উষ্ণ সময়কাল এবং দ্রুত নগরায়ণের কারণে ডেঙ্গুর মৌসুমি ধারা বদলে যাচ্ছে। এখন সংক্রমণ আগেভাগে শুরু হয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে।
হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু : এদিকে দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে নতুন করে আরও ১৬০ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। সোমবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের দেওয়া সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, সারা দেশে গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম আক্রান্ত হয়ে ৯৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৫৯০ জন। হামের উপসর্গ নিয়ে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে ২৫০ জনের। এ ছাড়া রাজশাহী বিভাগে ৮৮, সিলেটে ৭৪, চট্টগ্রামে ৫০, বরিশালে ৩৯, ময়মনসিংহে ৫৪, খুলনায় ২৭ ও রংপুরে আটজন মারা গেছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১৬০ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে ৯৬৫ জন। তাদের মধ্যে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৮৮৪ জন।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে, ঢাকা বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে আসা ৩৬৭ জন রোগীর মধ্যে ৩০৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। রাজশাহীতে ৫২ জনের মধ্যে ৪৭, সিলেটে ৬৫ জনের মধ্যে ৬০ ও চট্টগ্রামে ২১০ জনের মধ্যে ২১০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এ ছাড়া বরিশালে ১১০ জনের মধ্যে ১১০, ময়মনসিংহে ৬০ জনের মধ্যে ৫৭, খুলনায় ৮৪ জনের মধ্যে ৮৩ ও রংপুরে ১৭ জনের মধ্যে ১২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে এ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৭৭ হাজার ৭৪৩ জন। এর মধ্যে ৭৩ হাজার ৯৮৫ জন রোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে।