বর্ষা মৌসুম শুরু হতেই ফরিদপুরের পদ্মা নদীতে দেখা দিয়েছে তীব্র নদীভাঙন। গত এক সপ্তাহে ভাঙনের কবলে পড়ে কয়েকশ একর ফসলি জমি, কয়েকটি বসতভিটা চলে গেছে নদীগর্ভে। অপরদিকে ফসলসহ জমি হারিয়ে দিশাহারা চরাঞ্চলের কয়েকশ পরিবার। বর্তমানে ভাঙনের তীব্রতায় আতঙ্কিত হয়ে বাড়িঘর সরিয়ে নিচ্ছেন নদী তীরের বসতিরা। ভাঙন আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন পদ্মা তীরবর্তী এলাকার হাজারো মানুষ।
ফরিদপুর সদর উপজেলার পদ্মার তীরবর্তী একটি ইউনিয়ন হচ্ছে নর্থচ্যানেল। এ ইউনিয়নটি প্রতি বছরই নদী ভাঙনের কবলে পড়ে। ভাঙনের শিকার হয়ে ভিটেহারা হয় হাজারো মানুষ। ফসলি জমিসহ বিভিন্ন স্থাপনা বিলীন হয় নদীগর্ভে। বিগত প্রায় ২০ বছর ধরে এ চিত্র নর্থচ্যানেল ইউনিয়নের। এ বছর বর্ষা মৌসুম শুরু হতে না হতেই ইউনিয়নটির দুটি গ্রামে নদী ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। ইউনিয়নটির ৫ নং ওয়ার্ডের ইউসুফ মাতুব্বরের ডাঙ্গী ও শুকুর আলী মৃধা ডাঙ্গীতে দেখা দিয়েছে তীব্র নদী ভাঙন।
শুকুর আলী মৃধা ডাঙ্গীর বাসিন্দা মোহাম্মদ জসিম, মাসুম খাঁ বলেন, এবার নদী ভাঙন ভয়ংকর আকার ধারণ করেছে। প্রতিদিনই ভাঙনের শিকার হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। গ্রামের বাসিন্দা জমিলা বেগম, শেখ মোহাম্মদ ও খায়রুল ইসলামের অভিযোগ, পদ্মা নদী থেকে অবাধে বালু তোলার কারণেই ভাঙন শুরু হয়েছে। বালুখেকোদের কিছুই বলা যায় না। তারা বেশ প্রভাবশালী, সবাইকে ম্যানেজ করে তারা বালু তোলে। ফলে পদ্মায় পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদী ভাঙন শুরু হয়।
ইউসুফ মাতুব্বর ডাঙ্গীর বাসিন্দা মো. হাসেম, শিল্পী আক্তার বলেন, পদ্মায় কয়েকবার বাড়ি ভাঙছে, এইবার আবার ভাঙনের মুখে পড়েছি। বাড়িঘর নদীতে চলে গেলে কোথায় গিয়ে দাঁড়াব জানি না।
এদিকে নর্থচ্যানেল ইউনিয়নের শুকুর আলী মৃধা ডাঙ্গীর ৮০ বছর বয়সি মাসেম খাঁ ভাঙা গলায় বলেন, গত ৫০-৬০ বছর ধরে ১০ থেকে ১২ বার পদ্মা নদীর তীব্র নদী ভাঙনের কবলে পড়েছেন তিনি। এখন শেষ বয়সে এসে আবার ভাঙনের কবলে পড়লে রাস্তায় গিয়ে বসতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এগিয়ে এসে ভাঙনকবলিত স্থানগুলোতে টেকসই বাঁধ নির্মাণ করে শত শত পরিবারকে বাঁচানোর আকুতি করেন তিনি।
নর্থচ্যানেল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, নদী ভাঙনের বিষয়টি জেলা প্রশাসক, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়েছে। আশা করছি ভাঙনরোধে দ্রুতই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিব হোসেন বলেন, বর্ষা মৌসুম এলেই এ ইউনিয়নটিতে নদী ভাঙন শুরু হয়। গত বছর ভাঙনকবলিত স্থানে বালুর বস্তা ফেলে প্রতিরোধের চেষ্টা হয়েছিল। এবার যেসব স্থানে ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে সেখানে দ্রুতই কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ফরিদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেশকাতুল জান্নাত রাবেয়া বলেন, নদী ভাঙন এলাকায় সরেজমিন গিয়ে দেখা হয়েছে। এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। তা ছাড়া জেলা প্রশাসকের কাছেও বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। আশা করছি ভাঙন রোধে দ্রুতই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বর্তমানে নদী ভাঙনের হুমকির মুখে রয়েছে কয়েকশ বসতবাড়ি, হাজারো একর ফসলি জমি, স্কুল, মসজিদ, কমিউনিটি ক্লিনিক, ইটভাটাসহ বিভিন্ন স্থাপনা। এ ছাড়া এ ইউনিয়নের আরও দশটি গ্রাম রয়েছে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে। পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভাঙন শুরু হয়েছে। নদীর পানি কমলে ভাঙন আরও তীব্র আকার ধারণ করবে বলে জানান স্থানীয় গ্রামবাসী।
বিগত দিনে ভাঙনের শুরুতে কিছু বালুর বস্তা ফেলে প্রতিরোধের চেষ্টা করা হয়। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই নগণ্য। স্থানীয়দের অভিযোগ, নদী থেকে অবাধে বালু লুট ও টেকসহ বাঁধ না দেওয়ায় প্রতি বছর ভিটেমাটিহারা হচ্ছেন হাজারো মানুষ।