স্মার্টফোনের রঙিন দুনিয়া ছোট-বড় সবারই পছন্দের। শিশুরা অবুঝ বলে তারা আরও বেশি আকৃষ্ট হয়। পড়াশোনা, ভিডিও দেখা, গেম খেলা- সবকিছুর জন্যই তারা স্মার্টফোনের সান্নিধ্যে থাকতে চায়। কিন্তু অনেক শিশুই নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর আরও স্ক্রিনটাইম চায়, এমনকি ফোন নিজের হাত থেকে মা-বাবাকে ফিরিয়ে দিতেও অস্বীকৃতি জানায়। এই পরিস্থিতিতে অনেক অভিভাবকই নিজের মেজাজ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন না, যা একদম অনুচিত।
সবার আগে অভিভাবকদের মাথায় রাখতে হবে, শিশুরা অবুঝ। তাদের সঙ্গে অযথা রাগারাগি করা কোনো যুক্তিসঙ্গত কাজ নয়। দ্বিতীয়ত, বোঝার চেষ্টা করতে হবে- কেন শিশুরা ফোনের প্রতি আকৃষ্ট হয়? গেম খেলার চ্যালেঞ্জ, জেতার আনন্দ, ভিডিওতে নতুন নতুন জিনিস দেখতে পাওয়া তাদেরকে স্ক্রিনের দিকে চুম্বকের মতো টেনে নেয়। ফলে, পরবর্তীতে ফোন নিয়ে নিতে চাইলে তারা বিরক্তি প্রকাশ করতে বা রাগান্বিত হয়ে উঠতে পারে। এ ছাড়া যদি স্ক্রিনই শিশুর প্রধান বিনোদন বা অবসর কাটানোর মাধ্যম হয়, তাহলে ফোনের প্রতি আসক্তি তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এক্ষেত্রে করণীয় কী?
নিয়ম ঠিক করুন
স্ক্রিন ব্যবহার নিয়ে একটি নিয়ম তৈরি করুন। প্রতিদিন কতক্ষণ স্ক্রিন ব্যবহার করা যাবে, কখন ফোন ব্যবহার করা যাবে এবং কখন যাবে না, তা নির্ধারণ করুন। বিশেষ করে খাবারের সময়, ঘুমানোর আগে বা পারিবারিক আড্ডার সময় শিশুকে স্ক্রিন থেকে দূরে রাখুন। যখন নিয়ম আগেই নির্ধারিত থাকবে, শিশু ধীরে ধীরে সেই নিয়মে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে। এতে ফোন ফেরত নেওয়ার সময় ঝামেলা কম হবে।
হঠাৎ ফোন কেড়ে নেবেন না
কোনো ভিডিও দেখা বা গেম খেলার মুহূর্তে হঠাৎ করে শিশুর কাছ থেকে ফোন কেড়ে নিবেন না। বরং তাকে আগে থেকেই সতর্ক করুন। ১০ মিনিট পরে ফোন রাখতে হবে, এই ভিডিওটি শেষ হলে ফোন বন্ধ করবে- এসব বলে শিশুকে আগাম বার্তা দিন। এ ধরনের প্রস্তুতি শিশুকে মানসিকভাবে পরিবর্তনের জন্য তৈরি করে।
শান্ত থাকুন
শিশু যদি ফোন দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন মা–বাবার প্রথম কাজ হলো নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা। চিৎকার চেঁচামেচি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। শান্তভাবে তাকে বুঝিয়ে বলুন এবং নিয়মের কথা স্মরণ করিয়ে দিন। শিশুর অনুভূতিকে বোঝার চেষ্টা করুন, প্রয়োজনে খানিক সময় নিন, কিন্তু নিয়ম থেকে সরে আসবেন না।
ধারাবাহিকতা বজায় রাখুন
একদিন নিয়ম মানিয়ে, আবার অন্যদিন ছাড় দিলে শিশু বিভ্রান্ত হয়। তখন সে বুঝে যায়, জোরাজুরি বা কান্নাকাটি করলেই সে অতিরিক্ত স্ক্রিনটাইম পেয়ে যাবে। তাই নিয়ম করলে সেটি ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করা প্রয়োজন। নিয়মের ব্যত্যয় হলে তার কারণও পরিষ্কারভাবে শিশুকে জানানো উচিত, যেন সে প্রশ্রয় না পায়।
বিকল্প আনন্দের সুযোগ তৈরি করুন
স্ক্রিনের পরিবর্তে যদি আকর্ষণীয় বিকল্প তৈরি করতে পারেন, তাহলে শিশু আর ফোন দেখার জন্য জেদ করবে না। যেমন- বাইরে খেলাধুলা, ছবি আঁকা, গল্পের বই পড়া ইত্যাদি। যে শিশুর বাস্তব জীবনে আনন্দের অনেক উৎস থাকে, তার ফোনের প্রতি আকর্ষণ তুলনামূলক কম হয়।
মা–বাবাও উদাহরণ হোন
শিশুরা অন্যকে দেখে বেশি শেখে। যদি মা–বাবা সারাক্ষণ ফোনে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে শিশুকে স্ক্রিন কমাতে বললেও কাজ হবে না। তাই মা-বাবা কিংবা পরিবারের সদস্যদেরও উচিত, শিশুদের সামনে যতটা সম্ভব ফোন কম ব্যবহার করা।
চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
যদি দিনের পর দিন আপনার শিশু অতিরিক্ত স্ক্রিনটাইম না পেলে আগ্রাসী আচরণ করতে থাকে, ঘুম ক্ষতিগ্রস্ত হয়, পড়াশোনা বা অন্য কোনো খেলাধুলার প্রতি তার আগ্রহ কমে যায়, মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করতে অনীহা দেখায় কিংবা সারাক্ষণ শুধু ফোন নিয়েই চিন্তা করে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
সময়ের আলো/মহু