বাবার ভালোবাসা থাকে নীরবতায় ঘেরা। জীবনের ব্যস্ত সময়ে সবচেয়ে কম বলা, বেশি অনুভব করা সম্পর্ক- বাবা। মুখে হয়তো কঠিন কথা, শাসনের সুর; কিন্তু সেই কঠিন আবরণে লুকিয়ে থাকে সন্তানের জন্য গভীর মমতা, নিরাপত্তা আর সমুদ্রসমান ত্যাগ।
বাবাদের জীবন-সংগ্রামের গল্প থাকে নীরবতায় ঢাকা ও নানামুখী। কৃষক বাবা ভোরে মাঠে যান, শ্রমজীবী বাবা দিনের পর দিন পরিশ্রম করেন, প্রবাসী বাবা হাজার মাইল দূরে থেকেও পরিবারের স্বপ্ন পূরণে লড়াই করেন। প্রবাসে থাকা অনেক বাবার সন্তানের শৈশব কেটে যায় অপেক্ষায়। ঈদে কিংবা পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিনে বাবার ফোন যেন সন্তানের কাছে উচ্ছ্বাসভরা দূরালিঙ্গন।
বাবা সন্তানের কাছে শুধু ডাক নয় নিরাপদ ভবিষ্যতের ছায়া। নগরজীবনে বাবার দায়িত্বতে এসেছে আরও কত দাবি। শুধু অফিস নয়, সন্তানের পড়াশোনা, খাবার, খেলাধুলা থেকে দৈনন্দিন যত্নেও তার ছোঁয়া চাই। কর্মজীবী বাবা-মায়ের সন্তানে বাবার যত্ন আরও বেশি। স্কুলে নেওয়া, চিকিৎসকের কাছে নেওয়া কিংবা ছুটির দিনে সময় কাটানো যেন বাবা ছাড়া ভাবতে কষ্ট হয় অনেকের।
আজ ২১ জুন বিশ্বজুড়ে বাবা দিবস। বাংলাদেশেও নানা আয়োজন, শুভেচ্ছা আর ভালোবাসায় সিক্ত হবেন বাবারা। তবে একটি প্রশ্ন থেকেই যায় বাবার প্রতি ভালোবাসা কি শুধু একটি দিনের আনুষ্ঠানিকতা? নাকি প্রতিদিনের ছোট ছোট যত্ন, সম্মান আর কৃতজ্ঞতায় ভরা?
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, পরিবারে বাবার ভূমিকা সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে। একসময় বাবাকে দেখা হতো শুধু উপার্জনকারী হিসেবে। কিন্তু বর্তমানে সন্তানের মানসিক বিকাশ, শিক্ষা, মূল্যবোধ ও স্বপ্ন গঠনের অংশীদার তিনি।
ছোটবেলায় অনেক সন্তানের কাছেই বাবা মানে কঠোর একজন মানুষ। সময়মতো পড়তে বসতে বলা, ভুল করলে বকা দেওয়া, অযথা বাইরে যেতে নিষেধ করা এসবের মধ্যেই বাবা সীমাবদ্ধ। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় সেই উপলব্ধি। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত বাবাদের জীবন যেন এই নীরব ত্যাগের গল্প। সীমিত আয়, বাড়তি দায়িত্ব, সামাজিক চাপ- সবকিছুর মধ্যেও সন্তানের ভবিষ্যৎ সবার আগে দেখতে হয় বাবাকে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাবা-সন্তান সম্পর্কেও যুক্ত হয়েছে নতুন ধরন। আগের দিনে অনেক বাবার সঙ্গে সন্তানের দূরত্ব ছিল। অনেক কথা মায়ের সঙ্গে হলেও বাবার সঙ্গে ছিল সংকোচ। এখন অনেক বাবা সন্তানের বন্ধু হতে চান। পড়াশোনা, ক্যারিয়ার, সম্পর্ক কিংবা মানসিক চাপে পাশে থাকার চেষ্টা করেন।
মনোবিশেষজ্ঞরা মনে করেন, একজন শিশুর আত্মবিশ্বাস, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও সামাজিক আচরণ গঠনে বাবার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বাবার উৎসাহ শিশুকে নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে শেখায়।
অনেক বাবা সন্তানের খেলনা কিনে দিতে গিয়ে নিজের প্রয়োজনের জিনিসটি কেনেন না। ভালো স্কুলে পড়ানোর জন্য নিজের আরাম কমিয়ে দেন। সন্তানের অসুখে রাত জেগে থাকেন, অথচ পরদিন ক্লান্ত শরীরে কাজে যান। এসব ত্যাগের গল্প সাধারণত লেখা হয় না; কিন্তু পরিবারের প্রতিটি অর্জনের পেছনে থাকে তার ঘামের গন্ধ।
বৃদ্ধ বাবাদের একাকিত্ব: বাবা দিবসের আনন্দের পাশাপাশি আরেকটি বাস্তবতা মনে রাখা জরুরি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক বাবা পরিবারের ভেতরেই একা হয়ে যান। যে বাবা একসময় সবার প্রয়োজন মেটাতে ব্যস্ত ছিলেন, বয়সের ভারে তিনিই অনেক সময় হয়ে পড়েন অপ্রয়োজনীয় কিছুর মতো। আধুনিক সময় অনেক পরিবারেই প্রবীণ বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের দূরত্ব তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাবা দিবস শুধু শুভেচ্ছা জানানোর দিন নয়। পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের প্রতি দায়িত্ব স্মরণ করারও দিন। একটি ফোন, কিছুটা সময়, পাশে বসে গল্প করা এসবই হতে পারে কোনো বাবার বড় পাওয়া।
বাবা দিবসের ধারণা মূলত যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হয়। বিশ শতকের শুরুতে বাবাদের সম্মান জানাতে একটি বিশেষ দিন পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে ধীরে ধীরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জুন মাসের তৃতীয় রোববার বাবা দিবস হিসেবে উদযাপিত হতে থাকে।
বর্তমানে বিশ্বের বহু দেশে দিনটি বাবাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশের উপলক্ষ। বাংলাদেশেও গত কয়েক দশকে দিনটির গুরুত্ব বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গণমাধ্যম ও বিভিন্ন আয়োজনের মাধ্যমে মানুষ বাবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তবে দিবসটির মূল বার্তা হতে পারে- বাবার অবদান স্মরণ করা।
/সময়ের আলো/এসএকে