কোথায় যেন পড়েছিলাম, ‘কাচে ঢাকা গাড়িতে বসে মানুষের দুঃখ দুর্দশা কখনও পুরোপুরি দেখা যায় না, অনুভবও করা যায় না।’ তবু, মানুষ হিসেবে আমাদের উচিত অন্যের কষ্ট অনুভব করা, তাদের দুর্দিনের পাশে দাঁড়ানো। যদি তা না পারি, তাহলে ‘মানুষ’ পরিচয়ের মাহাত্ম্য রইল কোথায়?
কয়েক বছর আগে পাশের দেশ মিয়ানমার থেকে লাখ লাখ শরণার্থী এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিল। আমরা কজন চোখের সামনে থেকে তাদের দুঃখ দুর্দশা দেখেছি? কজন অনুভব করেছি তাদের দেশ হারানোর বেদনা? কজন জানতে চেয়েছি, ক্যাম্পে তারা কেমন আছে? শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর কোনো ক্যাম্পেই শরণার্থীরা ভালো থাকে না। দেশবিহীন মানুষের পক্ষে ভালো থাকা সম্ভব নয়। স্বচক্ষে তাদের দুর্দিন দেখতে না পেলেও চলুন আমরা একটু ভাবার চেষ্টা করি, আমাদের দৈনন্দিন ও তাদের ক্যাম্প জীবনের ভেতর কতটা ফারাক?
সকালে ঘুম থেকে উঠে আপনি হয়ত মোবাইল ফোন হাতে নেন। খবর দেখেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখ বোলান কিংবা দিনের পরিকল্পনা করেন। এরপর কলের পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে নাস্তা সেরে কাজে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেরিয়ে পড়েন। কোথায় যাবেন, কতক্ষণ থাকবেন, কী কাজ করবেন- এসব সিদ্ধান্ত মূলত আপনার নিজের। এতটাই স্বাভাবিক এই জীবন যে আমরা খুব কমই ভাবি, পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ এই সাধারণ স্বাধীনতাগুলোর অনেকটাই পায় না।
কক্সবাজার কিংবা বিশ্বের অন্যান্য শরণার্থী ক্যাম্পে বসবাসকারী মানুষের জীবন আমাদের পরিচিত নগরজীবনের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে প্রতিটি দিন শুরু হয় সীমাবদ্ধতার বাস্তবতার মধ্যে। একটি দেশের নাগরিক না হওয়া, নিজ ভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্যে জীবনযাপন করা কেবল একটি রাজনৈতিক বা মানবিক সংকট নয়, এটি প্রতিদিনের জীবনের প্রতিটি খুঁটিনাটিকে প্রভাবিত করে।
আপনি শহরে নিজের বা ভাড়া করা বাসায় থাকেন, আপনার নির্দিষ্ট ঠিকানা আছে। এই ঠিকানাটা একজন মানুষের জন্য খুব জরুরি। কিন্তু ক্যাম্পের মানুষগুলোর দিকে তাকান- তাদের আশ্রয় অস্থায়ী, ঘনবসতিপূর্ণ, ব্যক্তিগত পরিসরও খুব সীমিত। আপনি কল খুললেই পানি পাচ্ছেন, আপনার বা আপনার পরিবারের নিজস্ব এক বা একাধিক শৌচাগার আছে। অন্যদিকে, ক্যাম্পে নির্দিষ্ট পয়েন্ট থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়, একটি পরিবারের জন্য একটি শৌচাগার সেখানে বিলাসিতা। আপনি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন। কিন্তু শরণার্থীদের শিক্ষা সুবিধা সীমিত, উচ্চশিক্ষার সুযোগ তো আরও বিরল। আপনি চাইলেই ইন্টারনেট প্রায় সারাক্ষণ হাতের নাগালে। অন্যদিকে, শরণার্থীদের ইন্টারনেট ব্যবহারে রয়েছে নানান বিধিনিষেধ। আপনার ইচ্ছে হলেই শহর বা দেশের যেকোনও জায়গায় যেতে পারবেন, কিন্তু শরণার্থীদের চলাচল নিয়ন্ত্রিত, সীমাবদ্ধ।
ঢাকার একজন কিশোর সকালে সিদ্ধান্ত নিতে পারে আজ সে কোচিংয়ে যাবে, বিকেলে বন্ধুর সঙ্গে দেখা করবে, রাতে অনলাইনে ক্লাস করবে। একই বয়সী একজন শরণার্থী কিশোর হয়ত তার পুরো জীবন কাটাচ্ছে কয়েক বর্গকিলোমিটারের মধ্যে। তার কাছে পৃথিবী বলতে শিবিরের সরু রাস্তা, বাঁশের ঘর, ত্রিপলের ছাউনি এবং চারপাশের পাহাড়।
আমরা যখন ইন্টারনেটের ধীরগতিতে বিরক্ত হই, তখন অনেক শরণার্থী তরুণের কাছে ইন্টারনেট মানে বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে একমাত্র সংযোগ। আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয় বেছে নেওয়ার চিন্তা করি, তখন তাদের অনেকেই ভাবছে- পরের বছরও কী পড়াশোনার সুযোগ থাকবে?
ঢাকার একজন মানুষ ইচ্ছা করলে আজ কক্সবাজার, কাল সিলেট, পরশু চট্টগ্রাম যেতে পারেন। কিন্তু শরণার্থী শিবিরে বসবাসকারী মানুষের জন্য কয়েক কিলোমিটার দূরে যাওয়াও কখনও কখনও অসম্ভব হয়ে পড়ে।
এতকিছুর পরও শরণার্থী শিবিরে থাকা মানুষদের জীবনেও আছে স্বপ্ন, প্রেম, বন্ধুত্ব, হাসি এবং ভবিষ্যতের আশা। শিশুরা সেখানে খেলাধুলা করে, তরুণরা নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করে, পরিবারগুলো আরও ভালো জীবনের স্বপ্ন দেখে। পার্থক্য হলো, তাদের প্রতিটি স্বপ্নের সঙ্গে থাকে অনিশ্চয়তা।
একজন ঢাকাবাসী যখন নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করেন, তখন তিনি ধরে নিতে পারেন যে তার নাগরিক পরিচয়, শিক্ষা ও চলাচলের অধিকার আগামীকালও থাকবে। কিন্তু একজন শরণার্থীর জন্য ভবিষ্যৎ কেবলই অনিশ্চয়তার এক প্রশ্নবোধক চিহ্ন। আপনার জন্য যে জীবন স্বাভাবিক, কারও জন্য সেটিই হতে পারে সবচেয়ে বড় স্বপ্ন!
সময়ের আলো/মহু