ব্রিটিশ-সোমালি কবি ওয়ারসান শায়ার লিখেছিলেন-
“কেউ নিজের ঘর ছেড়ে যায় না,
যদি না সেই ঘর হাঙরের মুখে পরিণত হয়।”
তার এই পঙ্ক্তি পৃথিবীর সব শরণার্থীর গল্পকে এক বাক্যে ধারণ করে। যারা শরণার্থী হয়ে অন্য দেশে আশ্রয় নেয়, তারা কেউ স্বেচ্ছায় দেশ ছেড়ে চলে আসে না, বরং মৃত্যুকূপ থেকে বাঁচার শেষ চেষ্টাই করে কেবল। আধখানা মানুষ হয়ে তারা খুঁজে ফেরে নিজ ভূমি, নাগরিকত্ব এবং নিশ্চিত এক ভবিষ্যৎ।
মানুষ জন্মের পর প্রথম যে পরিচয়টি পায়, তা হলো একটি নাম। কিন্তু সেই নামের পাশাপাশি আরেকটি পরিচয় তার জীবনকে নির্ধারণ করে-নাগরিকত্ব। কোনো দেশের নাগরিক হওয়া মানে শুধু একটি পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকার নয়; এর অর্থ নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কাজের সুযোগ, আইনি সুরক্ষা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটি নিশ্চিত ধারণা। অথচ, পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ এমন বাস্তবতার মধ্যে বাস করছে- যেখানে তাদের মাথার ওপর কোনো রাষ্ট্রের পূর্ণ সুরক্ষা নেই। তারা শরণার্থী, বাস্তুচ্যুত, নাগরিকত্বহীন আধখানা মানুষ। তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সংকট স্বীকৃত পরিচয়ের অভাব।
একজন নাগরিক যখন সকালে ঘুম থেকে ওঠেন, তখন তিনি সচরাচর ভাবেন না যে স্কুলে ভর্তি হওয়া, হাসপাতালে চিকিৎসা পাওয়া বা চাকরির আবেদন করার পেছনে তার নাগরিকত্ব কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু একজন শরণার্থীর জীবন ঠিক উল্টো। তার প্রতিটি দিন শুরু হয় অনিশ্চয়তা দিয়ে। আগামীকাল কোথায় থাকবেন, সন্তানদের ভবিষ্যৎ কী হবে, কোনো সংকট এলে কে তাকে রক্ষা করবে- এসব প্রশ্নের উত্তর তার কাছে প্রায়ই অস্পষ্ট।
বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, জাতিগত নিপীড়ন, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে কোটি কোটি মানুষ নিজেদের দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। তারা অন্য দেশে আশ্রয় পেলেও সেই আশ্রয় অধিকাংশ সময়ই সাময়িক। নতুন দেশে তারা নিরাপদ থাকতে পারে, কিন্তু সেই দেশের নাগরিক হয়ে ওঠার সুযোগ খুব কমই পায়। ফলে তারা এমন এক অবস্থার মধ্যে আটকে যায়, যেখানে নিজ দেশের অধিকার হারিয়েছে, আবার আশ্রয়দাতা দেশের পূর্ণ অধিকারও পায়নি।
নাগরিকত্বহীন বা দীর্ঘদিন ধরে শরণার্থী হিসেবে বসবাসকারী মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো- ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে না পারা। একজন মানুষ যখন জানেন না আগামী ৫ বছর পর তিনি কোথায় থাকবেন, তখন শিক্ষা, পেশা কিংবা পরিবারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক শরণার্থী শিশুর জন্ম হয় শরণার্থী শিবিরে, তাদের শৈশবও সেখানেই কাটে। তারা এমন একটি বাস্তবতায় বড় হয়, যেখানে ‘বাড়ি’ শব্দটি স্মৃতি, গল্প কিংবা কল্পনা মাত্র।
শিক্ষার ক্ষেত্রেও শরণার্থীরা নানা বাধার মুখোমুখি হয়। অনেক দেশে আশ্রয়প্রাপ্ত শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা হলেও উচ্চশিক্ষার সুযোগ সীমিত। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অভাব, অর্থনৈতিক সংকট কিংবা আইনি জটিলতার কারণে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী মাঝপথে থেমে যেতে বাধ্য হয়। ফলে একটি পুরো প্রজন্ম তাদের সম্ভাবনা অনুযায়ী বিকশিত হওয়ার সুযোগ হারায়।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বাস্তবতা দেখা যায়। বহু শরণার্থী আইনগতভাবে কাজ করার অনুমতি পায় না, অথবা সীমিত সুযোগের মধ্যে আবদ্ধ থাকে। ফলে তাদের অনেকেই অনানুষ্ঠানিক খাতে কম মজুরিতে কাজ করে। এতে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা যেমন বাড়ে, তেমনি শোষণ ও বৈষম্যের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। নিজের দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও কেবল পরিচয়ের অভাবে একজন মানুষ পেশাগত জীবন গড়ে তুলতে পারে না- এটি শরণার্থী জীবনের নির্মম এক সত্য।
মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও এর গভীর প্রভাব পড়ে। যুদ্ধ, সহিংসতা বা নিপীড়নের স্মৃতি নিয়ে যারা দেশ ছাড়ে, তাদের অনেকেই দীর্ঘদিন ট্রমার মধ্যে থাকে। তার ওপর যখন বছরের পর বছর অনিশ্চয়তা, সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎহীনতার অনুভূতি যুক্ত হয়, তখন হতাশা, উদ্বেগ এবং বিষণ্নতা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এক ধরনের পরিচয় সংকট তৈরি হয়। তারা জানে না- তারা আসলে কোন দেশের মানুষ, কোথায় তাদের স্থায়ী ঠিকানা।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বাস্তবতা চিন্তা করে দেখি। কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর অভিযানের মুখে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে লাখ লাখ রোহিঙ্গা। শুধু ওই বছর এক মাসেই প্রায় সাড়ে ৭ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা UNHCR ও বাংলাদেশ সরকারের সর্বশেষ (৩১ মে ২০২৬) তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোতে বর্তমানে ১১ লাখ ৬৩ হাজার ৬১৯ জন রোহিঙ্গা (২ লাখ ৪১ হাজার ৫০৯টি পরিবার) বসবাস করছে। ভাসানচরে আছে ৩৩ হাজার ৭৯২ জন (৭ হাজার ৫১৫টি পিরবার)। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে আশ্রিত মোট রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। বায়োমেট্রিকভাবে শনাক্তকৃত ব্যক্তিদের জীবন সহজতর করার জন্য পারিবারিক কার্ড দেওয়া হয়। এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৫২ হাজার ২৯জন (৩৯ হাজার ৮৮১ পরিবার) শরণার্থীকে এ কার্ড দেওয়া হয়েছে। মিয়ানমারে নিপীড়ন ও সহিংসতার মুখে দেশ ছেড়ে আসা এই জনগোষ্ঠীর অনেকেই বছরের পর বছর ধরে শরণার্থী শিবিরে বসবাস করছে। তাদের মধ্যে এমন অসংখ্য শিশু রয়েছে, যারা কখনও নিজেদের জন্মভূমি দেখেনি। তারা বড় হচ্ছে বাংলাদেশে, কিন্তু বাংলাদেশের নাগরিক নয়; আবার মিয়ানমারেও তাদের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি নেই। এই পরিস্থিতি এক গভীর মানবিক সংকট।
শরণার্থী শিবিরে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকলেও একটি স্থায়ী জীবনের নিশ্চয়তা সেখানে নেই। একজন কিশোর যখন কৈশোর পেরিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হয়, তখন সে স্বাভাবিকভাবেই নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে শুরু করে। কিন্তু শরণার্থী শিবিরে বেড়ে ওঠা অনেক তরুণের সামনে সেই ভবিষ্যতের পথ স্পষ্ট নয়। তারা জানে না উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা স্বাধীন জীবন গড়ার সুযোগ কতটুকু পাওয়া যাবে।
অবশ্য কিছু ব্যতিক্রম চিত্রও দেখা যায় কোথাও কোথাও। সুযোগ পেলে শরণার্থীরা শিক্ষা, ব্যবসা, শিল্পকলা, বিজ্ঞান কিংবা ক্রীড়াক্ষেত্রে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করতে পারে। তারা নতুন সমাজে অবদান রাখে, অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য বাড়ায়।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহল দীর্ঘদিন ধরেই শরণার্থী ও নাগরিকত্বহীন মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলছে। কিন্তু বাস্তবে এই সংকটের সমাধান জটিল। কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাষ্ট্রীয় নীতি, সীমান্ত রাজনীতি, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নানা প্রশ্ন।
একটি পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র বা নাগরিকত্বের সনদ- এসব অনেকের কাছে সাধারণ নথি। কিন্তু পৃথিবীর লাখো শরণার্থীর কাছে এগুলো এমন এক স্বপ্ন, যা তাদের জীবনে নিরাপত্তা, অধিকার এবং ভবিষ্যতের দরজা খুলে দিতে পারে। একদিন হয়ত আমরা এমন পৃথিবী দেখব, যেখানে কোনো শরণার্থী থাকবে না, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষেরই নিজের দেশ থাকবে। আধখানা মানুষেরা তখন কেবল গল্পে স্থান পাবে, পূর্ণ মানুষ রূপে বাঁচার সুযোগ পাবে সবাই।
ওয়ারসান শায়ারের কবিতার অংশ দিয়েই শেষ করছি-
“কেউ তার সন্তানকে নৌকায় তোলে না,
যদি না জলভাগ স্থলভাগের চেয়ে বেশি নিরাপদ হয়।”
একদিন পৃথিবীর সমস্ত স্থলভাগ নিরাপদ হবে, কোনো মা-বাবা আর তাদের সন্তানকে নিয়ে নৌকায় ভেসে পায়ের তলার মাটি খুঁজে বেড়াবে না, এটাই প্রত্যাশা।
সময়ের আলো/মহু