দেশের সম্ভাবনাময় কয়েকটি শিল্প খাতকে পরিকল্পিতভাবে বিকশিত করতে পারলে বর্তমান ৫০-৫৫ বিলিয়ন ডলারের রফতানি আয় আগামীতে ১৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব বলে মনে করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
একই সঙ্গে পাঁচ-সাতটি খাতেই বদলে যেতে পারে দেশের রফতানি অর্থনীতি বলে মন্তব্য করেন তিনি। মঙ্গলবার (২৩ জুন) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় বেসরকারি খাতগুলোর প্রতিযোগিতা সক্ষমতা মূল্যায়ন গবেষণা’ শীর্ষক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বাংলাদেশ ইতিমধ্যে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) মর্যাদা থেকে উত্তরণের সব শর্ত পূরণ করেছে। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো উত্তরণ পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা। তিনি বলেন, পাঁচ থেকে সাতটি সম্ভাবনাময় খাতকে কেন্দ্র করে সুনির্দিষ্ট কৌশল ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে দেশের রফতানি অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন আনা সম্ভব। বর্তমানের ৫০-৫৫ বিলিয়ন ডলারের রফতানি আয়কে ১৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, সম্ভাবনাময় কয়েকটি খাতকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, নীতিগত সহায়তা, গবেষণা ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে এগিয়ে নিতে পারলে এ লক্ষ্য অর্জন কঠিন নয়। এ ছাড়া এ লক্ষ্য অর্জনে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে শিল্প খাতকে দ্রুত অভিযোজিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
আব্দুল মুক্তাদির বলেন, এক্সপোর্ট কমপিটিটিভনেস ফর জবস (ইসিফোর-জে) প্রকল্পের মূল ধারণা সময়োপযোগী হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অন্যতম বড় দুর্বলতা। ভবিষ্যতে প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কাজ সম্পন্ন নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজন সক্ষমতা রাখতে হবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বিশেষভাবে চামড়া, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও পাটভিত্তিক শিল্পের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে বলেন, এসব খাতে বিদ্যমান অবকাঠামোকে আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্রে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় এসব কেন্দ্র পরিচালিত হলে দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
পাট খাত সম্পর্কে তিনি বলেন, কাঁচা পাট রফতানির পরিবর্তে মূল্য সংযোজিত পাটপণ্য ও জুট ফেব্রিক উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়া হলে রফতানি আয় কয়েকগুণ বাড়ানো সম্ভব। এ খাতে গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং উদ্ভাবনী কার্যক্রম জোরদারে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে যৌথ গবেষণা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সরকার, বেসরকারি খাত ও একাডেমিয়ার মধ্যে কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে ফলাফল মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘসূত্রতা কাটিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাও জরুরি।
কর্মশালায় সভাপতির বক্তব্যে বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খান জানান, এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং দেশের রফতানি সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার একটি সমন্বিত প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন শিল্প খাতের উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী সংগঠনের মতামতের ভিত্তিতে খাতভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে। রফতানি খাতের পুনরুদ্ধার, পুনর্গঠন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়গুলো জাতীয় বাজেটের অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
বাণিজ্য সচিব আরও বলেন, ব্যবসা সহজীকরণ, ডিজিটালাইজেশন, নীতিগত সহায়তা এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়া সরলীকরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে এবং প্রয়োজনে রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোকে (ইপিবি) বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে সম্পৃক্ত করে প্রকল্পটি পরিচালনার বিষয় বিবেচনা করা হচ্ছে। এ ছাড়া সরকারি ও বেসরকারি খাতের যৌথ অংশীদারত্বে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের রফতানি প্রবৃদ্ধি নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক। এ ছাড়া বক্তব্য রাখেন এক্সপোর্ট কমপিটিটিভনেস ফর জবস (ইসিফোর-জে) প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক সেখ মোহাম্মদ আব্দুর রহমান এবং বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র প্রাইভেট সেক্টর স্পেশালিস্ট হোসনা ফেরদৌস সুমি। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন শিল্প খাতের প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতা, নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অংশ নেন।
সময়ের আলো/আরবিএন