প্রত্যাখ্যাত গলির ফুটবলার থেকে বিশ্বমঞ্চের নায়ক

আরমান মুকুল

খেলা

কলম্বিয়ার বিশ্বকাপ অভিযানে আলো কেড়ে নেওয়ার কথা ছিল হয়তো হামেস রদ্রিগেজ কিংবা লুইস দিয়াজের। তারাই যে দেশটির ফুটবলে সময়ের সেরা

2026-06-25T01:22:03+00:00
2026-06-25T01:22:03+00:00
 
  শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬,
১২ আষাঢ় ১৪৩৩
শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬
খেলা
প্রত্যাখ্যাত গলির ফুটবলার থেকে বিশ্বমঞ্চের নায়ক
আরমান মুকুল
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬, ১:২২ এএম 
ড্যানিয়েল মুনোজ। ছবি : সংগৃহীত
কলম্বিয়ার বিশ্বকাপ অভিযানে আলো কেড়ে নেওয়ার কথা ছিল হয়তো হামেস রদ্রিগেজ কিংবা লুইস দিয়াজের। তারাই যে দেশটির ফুটবলে সময়ের সেরা তারকা। কিন্তু দুই ম্যাচ শেষে দেশটির সবচেয়ে বড় নায়ক হয়ে উঠেছেন একজন ডিফেন্ডার ড্যানিয়েল মুনোজ। ২০২৬ বিশ্বকাপে টানা দুই ম্যাচে দুই গোল করে তিনি যেন নতুন এক রূপকথার জন্ম দিয়েছেন। সবশেষ গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের বিপক্ষে তার একমাত্র গোলেই ১-০ ব্যবধানে জয় পেয়েছে কলম্বিয়া এবং নিশ্চিত করেছে নকআউট পর্বের টিকেট।

কলম্বিয়ায় আজ বিশ্বকাপের নায়ক হিসেবে যার নাম উচ্চারিত হচ্ছে, কয়েক বছর আগেও তার গল্পটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। একের পর এক ব্যর্থতা, আর্থিক অনিশ্চয়তা, প্রত্যাখ্যান আর ভেঙে পড়া স্বপ্নের মধ্য দিয়েই এগিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। ১৫ বারেরও বেশি বিভিন্ন ক্লাব তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল। এমনকি একসময় ফুটবল ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সাধারণ চাকরি করার কথাও ভেবেছিলেন তিনি।

কলম্বিয়ার ছোট্ট শহর আমালফিতে জন্ম নেওয়া মুনোজ মাত্র পাঁচ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে চলে আসেন মেদেলিনের উপশহর বেলোতে। পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। তাই কোনো নামি ফুটবল একাডেমিতে নয়, পাড়ার রাস্তা, গলি আর ধুলোমাখা মাঠেই তার ফুটবলের হাতেখড়ি।

বন্ধুদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা খেলতে খেলতেই গড়ে উঠেছিল তার ফুটবল দর্শন। সেই রাস্তার খেলাই তাকে শিখিয়েছে লড়াই, সাহস আর কখনো হাল না ছাড়ার মানসিকতা। তাই মুনোজের গল্পটা আসলে রাস্তার ফুটবলার থেকে বিশ্বকাপের নায়ক হয়ে উঠার গল্প। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন কলম্বিয়ার ঐতিহ্যবাহী ক্লাব আতলেতিকো নাসিওনালের অন্ধ ভক্ত। ম্যাচের দিন গ্যালারিতে গিয়ে ড্রাম বাজাতেন, গান গাইতেন, গলা ফাটিয়ে প্রিয় দলকে সমর্থন করতেন। ক্লাবটির কট্টর সমর্থক গোষ্ঠী ‘লস দেল সুর’-এরও সদস্য ছিলেন তিনি।

তবে গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে শুধু সমর্থন করেই সন্তুষ্ট ছিলেন না মুনোজ। তার স্বপ্ন ছিল একদিন নিজেই সেই ক্লাবের জার্সি গায়ে মাঠে নামার। সেই স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে দীর্ঘ ও কষ্টকর পথ। কৈশোরে কলম্বিয়া, মেক্সিকো, ইতালি ও স্পেনের বিভিন্ন ক্লাবে ট্রায়াল দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু প্রতিবারই ফিরে আসতে হয়েছে হতাশ হয়ে। কোনো ক্লাব তার মধ্যে ভবিষ্যতের তারকা দেখতে পায়নি। ১৫ বারেরও বেশি তাকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল।

একসময় সেই প্রত্যাখ্যান তার আত্মবিশ্বাসও ভেঙে দেয়। বয়স যখন ২০, তখনও কোনো পেশাদার ক্লাবে জায়গা হয়নি। পরিবারের আর্থিক চাপ, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ আর বারবার ব্যর্থতার কারণে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ফুটবল ছেড়ে দেবেন। জীবিকার তাগিদে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সাধারণ চাকরি করার জন্য ভিসার আবেদনও করেছিলেন। স্বপ্নটা তখন প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু জীবন কখনো কখনো সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলো লিখে ঠিক তখনই, যখন সবকিছু শেষ হয়ে গেছে বলে মনে হয়। ঠিক সেই সময় তার শৈশবের এক কোচের সঙ্গে দেখা হয়। মুনোজের প্রতিভা সম্পর্কে ভালো করেই জানতেন সেই কোচ। তিনিই তাকে কলম্বিয়ার প্রথম বিভাগের ক্লাব আগুইলাস দোরাদাসে ট্রায়ালের সুযোগ করে দেন।

সেই একটি সুযোগই বদলে দেয় তার জীবন। ২০১৬-১৭ মৌসুমে, ২০ বছর বয়সে অবশেষে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক হয় তার। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। আগুইলাস দোরাদাসে সামর্থ্যরে প্রমাণ দেওয়ার পর দেশের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন মুনোজ। এরপর ডাক আসে তার শৈশবের স্বপ্নের ক্লাব আতলেতিকো নাসিওনাল থেকে। এ যেন সিনেমার গল্প।

যে ক্লাবের গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে একসময় তিনি ড্রাম বাজাতেন, কয়েক বছরের মধ্যেই সেই ক্লাবের জার্সি গায়ে মাঠে নামেন। শুধু তাই নয়, একসময় অধিনায়কের আর্মব্যান্ডও উঠে আসে তার হাতে। দেশের ফুটবলে নিজেকে প্রমাণ করার পর ইউরোপের দরজা খুলে যায় তার জন্য। বেলজিয়ামের জেঙ্কে যোগ দিয়ে শিরোপা জয়ের স্বাদ পান। এরপর ইংল্যান্ডের ক্রিস্টাল প্যালেসে পাড়ি জমান এবং নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন প্রিমিয়ার লিগের অন্যতম সেরা রাইট-ব্যাক হিসেবে। তার আক্রমণাত্মক দৌড়, অদম্য পরিশ্রম এবং গোল করার ক্ষমতা তাকে অন্য ডিফেন্ডারদের থেকে আলাদা করেছে।

আর এখন সেই গুণগুলোই কলম্বিয়াকে এনে দিচ্ছে বিশ্বকাপে সাফল্য। ২০২৬ বিশ্বকাপের মঞ্চে ড্যানিয়েল মুনোজ এখন শুধু একজন ফুটবলার নন; তিনি অধ্যবসায়, ধৈর্য এবং না হার মানা মানসিকতার প্রতীক। যে ছেলেটি একসময় ১৫ বারের বেশি প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল, যে তরুণ ফুটবল ছেড়ে অন্য দেশে চাকরি করতে চেয়েছিলেন, সেই তিনিই আজ কোটি মানুষের অনুপ্রেরণা। ড্যানিয়েল মুনোজের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় স্বপ্নের পথে বাধা আসবেই, দরজা বন্ধ হবে বারবার, মানুষ আপনাকে বিশ্বাস নাও করতে পারে। কিন্তু আপনি যদি নিজেকে বিশ্বাস করেন এবং লড়াই চালিয়ে যান, তা হলে একদিন ধুলোমাখা গলির সেই ছেলেটিও বিশ্বকাপের সবচেয়ে উজ্জ্বল নায়ক হয়ে উঠতে পারে।

সময়ের আলো/আআ


  বিষয়:   ড্যানিয়েল  মুনোজ  গল্প  ফুটবল 


Loading...
Loading...
খেলা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: